আপন আলোয় আবুল হোসেন খান : সাঈদ চৌধুরী

ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের ইমাম ও খতীব হাফেজ মাওলানা আবুল হোসেন খান একজন নিরব সাধক। আধ্যাত্মিক চেতনা সমৃদ্ধ আলেমে-দ্বীন। বহুমাত্রিক কর্মের পরিচয় ও পরিসরে তাঁর জীবন ব্যাপৃত। ন্যায়পরায়নতা ও সত্যনিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। ছাত্র জীবন থেকে তিনি সৎ, সাহসী ও দৃঢ়চেতা সংগঠক হিসেবে সর্ব মহলে সুখ্যাতি লাভ করেন। শত শত শিক্ষার্থী তাঁর নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, যারা ইসলামের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত।
বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব হাফেজ মাওলানা আবুল হোসেন খান স্বাধীন বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন একজন দীপ্তিমান ও মননশীল লেখক। একজন মহৎপ্রাণ সাদা মনের মানুষ। তিনি সংলাপ সাহিত্য-সংস্কৃতি ফ্রন্টের প্রেসিডিয়াম মেম্বার। সংস্কৃতি চর্চায় সক্রিয় অংশগ্রহণ তাঁর মুক্ত মন-মনন-মানসের দ্যোতক। তিনি দ্বীন ও শরিয়তের গভীর জ্ঞান রাখেন ও সে অনুযায়ী আমল করেন। আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল (সাঃ) প্রদর্শিত জীবন-পদ্ধতি অনুসরণে নিজের জীবনকে পরিচালিত করেন।
সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন কালে আমি যখন দাখিল নবম শ্রেণীতে, তিনি তখন কামিল পরীক্ষার্থী। মাদ্রাসায় সাহিত্য চর্চার অংশ হিসেবে মাসিক দেয়ালিকা প্রকাশিত হয়। মাষ্টার্স সম মানের প্রতিষ্ঠানে দাখিল মানে সেকেন্ডারি স্কুল। সেখানে আমাকে ‘তাহরিক‘ নামের দেয়ালিকার সম্পাদক মনোনীত করা হয়। এর পেছনে যারা আমার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিলেন, আবুল হোসেন খান তাদের অন্যতম। দাখিল শ্রেণী থেকে প্রথম বারের মত আলিয়া ছাত্র সংসদে সম্পাদকীয় পদে আমাকে মনোনীত করার পিছনেও তাঁর ভূমিকা ছিল। তখন থেকে আমি জাতীয় দৈনিকের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। তিনি অনেক প্রেরণা দিয়েছেন। তাঁর এই ভালোবাসা আমাকে সবসময় আপ্লুত করেছে।
২০০০ সালের জানুয়ারী মাসে আমি লন্ডন এসেছি। প্রথম দিন থেকে ইস্ট লন্ডন মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করি। এলএমসি কমপ্লেক্সের বিজনেস উইংয়ে প্রায় ১৫ বছর আমার অফিস ছিল। এর বহুমুখি কার্যক্রমের সাক্ষী ও সহায়ক শক্তি ছিলাম। হাফেজ মাওলানা আবুল হোসেন খান প্রায় নিয়মিত আমার খবর নিতেন। তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ।
আবুল হোসেন খানের ইমামতি আমাকে দারুণ ভাবে আকৃষ্ট করে। নামাজে তেলায়াতের সময় তার খোদাভীতি প্রকাশ পায়। অনেক সময় তিনি চেপে রাখতে পারেন না অন্তরের গভীর থেকে গুমরে-ওঠা কান্না। একজন বুজর্গ আলেম ও হাফেজে কুরআনকে কাছে পেয়ে আমি মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি।
বৃটেনে শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের ইমাম ও খতীব হিসেবে হাজার হাজার মানুষ তাঁর জ্ঞানগর্ব বয়ান থেকে সর্বদা উপকৃত হচ্ছেন। প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে সালাত আদায় করেন। জুমাবারে ৮/১০ হাজার নারী-পুরুষের সমাগম ঘটে। গড়ে মাসিক নামাজির উপস্থিতি ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
ইউরোপের সর্ববৃহৎ ইসলামিক প্রতিষ্ঠান লন্ডন মুসলিম সেন্টার (এলএমসি) ও ইস্ট লন্ডন মসজিদ (ইএলএম) প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের প্রাণকেন্দ্র। বৃটেন সহ ইউরোপের মুসলমানদের জন্য আনন্দ ও গর্বের প্রতিষ্ঠান। নতুজ প্রজন্মের হাজার হাজার তরুণ এখান থেকে আলোর সন্ধান পেয়ে থাকেন।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের সমৃদ্ধ ইতিহাস জানলে এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের ব্যাপকতা বুঝা সহজ হবে। ১৯১০ সালে মসজিদ প্রতিষ্ঠার পেক্ষাপট তুলে ধরে বিবিসি একটি ডকুমেন্টারি করেছে। সেখানে লন্ডনের ইম্পেরিয়েল ওয়ার মিউজিয়াম থেকে অনেক ফুটেজ এবং বেশ কিছু তথ্য ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তখন বিভিন্ন দেশ থেকে বৃটেনে আগত মুসলমানদের নামাজের কোনো মসজিদ ছিল না। ৯ নভেম্বর ১৯১০ সালে সেন্ট্রাল লন্ডনের রিচ হোটেলে প্রিন্স সুলতান মুহাম্মদ আগা খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় লন্ডন মস্ক ফান্ড গঠন করে মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস শুরু হয়।
১৯৪০ সালে বাস্তবে রূপ নেয় ইস্ট লন্ডন মসজিদ। কমার্শিয়াল রোডে নিয়মিত নামাজের ব্যবস্থা হয়। সময়ের ব্যবধানে যোগ্য নেতৃত্বের তত্বাবধানে কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের সহায়তায় নিজস্ব স্থানে গড়ে ওঠে ইস্ট লন্ডন মসজিদ। ২০০৪ সালে যুক্ত হয় বৃটেন সহ ইউরোপের মুসলমানদের প্রাণকেন্দ্র লন্ডন মুসলিম সেন্টার (এলএমসি)। মুসলিম উম্মাহর প্রাণপুরুষ পবিত্র কাবা শরিফের ইমাম শায়খ আবদুর রহমান আস সুদাইস এলএমসি উদ্বোধন করেন।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের কার্যক্রম দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময় বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ এই মসজিদ পরিদর্শনে এসে মসজিদের কার্যক্রম দেখে অভিভূত হয়েছেন। ২০০১ ও ২০০৪ সালে বৃটেনের প্রিন্স চার্লস দু‘বার মসজিদ পরিদর্শন করেছেন। বিভিন্ন সময় বিশ্বের বহু দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি সহ রাস্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ এই মসজিদ পরিদর্শন করতে এসেছেন। বৃটেনের সব সরকারের সময়ই মন্ত্রী ও এমপিগণ নিয়মিতই মসজিদ পরিদর্শন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করে থাকেন।
কিছু দিন আগে মসজিদ পরিদর্শনে আসেন বৃটেনের রানীর একমাত্র কন্যা প্রিন্সেন্স এ্যান। তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থান করে মসজিদের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে অভিভূত হন। তারপর ইস্ট লন্ডন মসজিদ এবং লন্ডন মুসলিম সেন্টার পরিদর্শন করেছেন বৃটিশ রাজপুত্র ও পুত্রবধূ। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দ্যা ডিউক এন্ড ডাচেস অফ কেমব্রিজ প্রিন্স উইলিয়াম এন্ড কেট ইস্ট লন্ডন মসজিদ এবং লন্ডন মুসলিম সেন্টার পরিদর্শন করে মুগ্ধ হন।
ইসলাম সম্পর্কে গভীর ভাবে জানার জন্য বিভিন্ন ধর্মের লোকেরাও এলএমসিতে আসেন। এমনকি ধর্ম বিদ্বেষী বা ধর্ম নিয়ে অনুসন্ধানী মানুষও আসেন। অমুসলিম ও নতুন মুসলমানদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করা, যুব সমাজের চাহিদা অনুযায়ী উদ্যোগ গ্রহণ করা, মহিলাদের সেবার মান ও ক্ষেত্র বৃদ্ধি সহ এখানে প্রায় ৩৬টি প্রজেক্ট চালু রয়েছে।
পুরুষ ও মহিলাদের পৃথক নামাজের সুব্যবস্থার পাশাপাশি রয়েছে ইভিনিং মাদ্রাসা, প্রাইমারি স্কুল, সেকেন্ডারি স্কুল, বিজনেস সেন্টার, ফিটনেস সেন্টার, ফিউনারেল সার্ভিস, ফ্রি লিগ্যাল সার্ভিস, ম্যারেজ ব্যুরো সহ বহুবিধ সেবাকর্ম। এই বহুমুখি কর্মযজ্ঞ পরিচালনায় রয়েছেন মেধাবী ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত এক বিশাল কর্মী বাহিনী। হাফেজ মাওলানা আবুল হোসেন খান তাদের অন্যতম প্রাণশক্তি।
প্রতি বছর তারাবিহের নামাজের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে খ্যাতিমান হাফিজগণকে আনা হয়। মদীনা শরীফ থেকে আসেন ইমাম মুহাম্মদ সাউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে শরীয়াহ শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রীধারী প্রখ্যাত আলেম শায়খ সাউদ নাফি আল আনাজী, মিশর থেকে হাফিজ আহমদ রাজাব ও সোমালী বংশোদ্ভুত হাফিজ ক্বারী জামাল মোহাম্মদ প্রমুখ। রামাদ্বানে প্রতিদিন শত শত মানুষ লন্ডন মুসলিম সেন্টারের গ্রাউন্ড ফ্লোরে ইফতার করে থাকেন। শেষ ১০ দিনে শতাধিক মানুষের জন্য থাকে ই’তেকাফের সুব্যবস্থা।
এলএমসি‘র বহুমুখি কর্ম তৎপরতা নিয়ে রীতিমত গবেষনা হচ্ছে। আবার গবেষকদের ব্যাপক ভিত্তিক সাধনার কেন্দ্র ভূমিতে পরিণত হয়েছে এটি। শতাধিক বছরের পুরনো আড়াই লক্ষ ডকুমেন্টস সংরক্ষণের মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে লন্ডন মুসলিম সেন্টারের ইস্ট লন্ডন মস্ক আর্কাইভ স্ট্রংরুম। এই আর্কাইভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন লন্ডন মেয়র সাদিক খান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র সাদিক খান বলেন, এই আর্কাইভ স্থাপনের মাধ্যমে আজ থেকে শত বছর আগে আমাদের পূর্ববর্তী বংশধর ইস্ট লন্ডন মসজিদ প্রতিষ্ঠায় যে অবদান রেখে গেছেন তা যুগযুগ ধরে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ইতিহাস হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইস্ট এন্ডের মুসলমানদের অতীত অবদান ইসলামধর্মে বিশ্বাসী লন্ডনারদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে ইস্ট লন্ডন মসজিদের তৎকালীন চেয়ারম্যান মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, এই আর্কাইভ স্ট্রংরুম প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমরা ১৯১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ইস্ট লন্ডন মসজিদের ১০৭ বছরের আড়াই লক্ষাধিক ডকুমেন্টস সংরক্ষণ করতে পেরেছি। এসব ডকুমেন্টস আধুনিক বৃটিশ সমাজের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে প্রাথমিক সোর্স হিসেবে ভুমিকা রাখবে।
হাবিবুর রহমান আরো বলেন, বৃটেনে মুসলমানদের অভিবাসন প্রক্রিয়া, বিশেষ করে ইস্ট এন্ডের মুসলমানদের ইতিহাস জানতে পারবেন। এই স্ট্রংরুম আগামী দিনে ইস্ট লন্ডন মসজিদের নতুন নতুন ডকুমেন্টস সংরক্ষণ করবে। তিনি আর্কাইভ প্রতিষ্ঠায় প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর হুমায়ুন আনসারী, প্রফসর জন উলফ, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল, টাওয়ার হ্যালেটস লোকাল হিস্ট্রি লাইব্রেরী এন্ড আর্কাইভস এর হ্যারিটেজ ম্যানেজার টামসিন বুকির আন্তরিক সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান।
১৯১০ সালের ইস্ট লন্ডন মসজিদ ফান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য স্যার সৈয়দ আমির আলী, ইতিহাসবিদ প্রফেসর টি ডাব্লিউ আরনোলড, স্যার আর্নেস্ট হিউস্টন, স্যার জন উডহেড, আর্ল উইন্টারটন, প্রখ্যাত কুরআন অনুবাদক আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলী ও মুহাম্মদ মারমাডুক পিকতলের অবদান অনুষ্ঠানে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
উল্লেখ্য, আর্কাইভ স্ট্রংরুম এমন একটি নিরাপদ সংরক্ষণ ব্যবস্থা, যা পানি ও আগুন থেকে সবধরনের ডকুমেন্টস রক্ষা করতে পারে। জনসাধারণের জন্য অ্যাপোয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে ডকুমেন্টস দেখার সুযোগ রয়েছে। স্কুল, কলেজ ও ইনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষামূলক কাজে আর্কাইভ পরিদর্শনকে মসজিদের পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
এই সব কিছুর পরও একটি ইসলামী প্রতিষ্ঠানের প্রাণ তার ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগন। শায়েখ আব্দুল কাইয়ুম ও শায়েখ আবুল হোসেন খান সেক্ষেত্রে অনেক বড় নিয়ামক শক্তি। শুধু ইএলএম ও এলএমসি নয়, বৃটেনের বিভিন্ন স্থানে ইসলামী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁরা অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন।
আবুল হোসেন খান বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সামাজিক কর্মকান্ড, চলমান ইস্যু ও ইসলামিক জীবনাচার বিষয়ে আলোকপাত করেন। দারুণ সাবলীল ভঙ্গিতে কথা বলেন তিনি। তার কথামালা খুব সহজে বোধগম্য। মোটেও জ্বালাময়ী নয়, কিন্তু অন্তর্ভেদী। ইসলামী অনুষ্ঠানে তার আলোচনা শুনে কেই ছুটে যায়না। শান্তিপূর্ণ বয়ান অন্তর ভেদ করে হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। মানুষকে আল্লাহ প্রদত্ব ও রাসুল (সা.) প্রদর্শিত পথে চলতে আকৃষ্ট করে। স্রষ্টার আরাধনা ও সৃষ্টির হক সম্পর্কে সচেতনতা তৈরী হয়। সকল প্রকার অনিষ্ট চিন্তা দূর হয়ে যায়।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!