আদর্শহীন রাজনীতিতে  জোট : ড. সুলতান আহমদ

কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কি আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করে বলুনত? এক কথায় আমার উত্তর হবে, কোন দলেরই আদর্শ নেই। আওয়ামী জোট অবশ্য দাবি করে, তাদের আদর্শ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। চেতনা একটা বায়বীয় জিনিষ। যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতে কি কি আছে? উত্তর আসবে -গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন। এ সব কিছুই যেমন আওয়ামী জোট ধ্বংস করেছে, তেমনি বিএনপি জোটও ধ্বংস করেছে।

আসা যাক গণতন্ত্রে। দলে কেন গণতন্ত্র নাই, এ প্রশ্নটি দলীয় কর্মীরা জিজ্ঞাসা করেনা, তেমনি টিভি টকশোতে অংশগ্রহনকারী  দলীয় পদাধিকারীরাও জিজ্ঞাসিত হয় না কেন? দলীয় প্রধান হলেন স্বঘোষিত। সেই প্রধানের চতুর্দিকে চাটুকারগোষ্ঠি একটা কঠোর বলয় সৃষ্টি করে রাখে, যে বলয়ে সাধারন কর্মীদের কোন প্রবেশাধিকার নেই। এই চাটুকারগোষ্ঠিই  বিভিন্ন দলীয় বিভিন্ন পদে দলীয় প্রধানের মনোনয়ন লাভ করে। তাহলে প্রশ্ন আসে, টিভি টকশোতে দলীয় পদাধিকারীরা আলোচনায় যে সব কথা বলে, সেগুলিত দলীয় সদস্যদের মনোভাবের প্রতিফলন বলে বিবেচিত হতে পারে না। কারন তারা ঐ পদে সদস্যদের ভোটে নির্বাচনের মাধ্যমে আসেনি।

এবার আশা যাক সরকার আর দলের সম্পের্কে। যে দল সরকার গঠন করে, সে দলের প্রধানই হন সরকার প্রধান।সুতরাং দলের স্বার্থ ও সরকারের স্বার্থ একাকার হয় যায়। তাই সরকার যখন সংবিধানে প্রদত্ত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন পরিপন্থী কোন কাজে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার দায়ভার দলকে অবশ্যই গ্রহন করতে হয়। এ পর্যন্ত সরকারে যে সব দলই ছিল, তারা ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন পরিপন্থী কাজে লিপ্তহয়েছে। দলীয় নেতৃবৃন্দ সরকার আর দল এক নয় বলে গলাবাজি করলেও, জনগণ তা মেনে নেয় না। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংসে সব দলেরই অবদান আছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দলের আদর্শ বলে দাবি করে, তারা মিথ্যাচার করছে।

এবার আশা যাক জোটের রাজনিতীতে । জোটের রাজনীতি পশ্চিমা গণতান্ত্রিতক দেশসমূহেও প্রচলিত। তবে ঐ সব দেশে জোট গঠিত হয় নির্বাচনের পর। যখন কোন দলই নর্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা  না পায়, তখন সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা  অর্জনের লক্ষ্যে নির্বাচনে কয়েকটি আসনে জয়ী ছোট দলের সঙ্গে জোট গঠন করে দেশ শাসন করে। সেই জোটও আবার ভেঙ্গে সরকারকে বিপদে ফেলে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোতে একটি দল গঠিত হয়, প্রধানতঃ কিছু আদর্শকে ভিত্তি করেই। সরকারে যাবার জন্য তারা দলীয় আদর্শ কখনো বিসর্জন দেয়  না, বা ক্ষমতায় ভাগ বসানোর জন্য জোটে যা না। আমেরিকায় এ রকম একটি দল আছে, তার নাম Green party. বৃটেনেও Labor ও liberal দের বাইরেও একটি দল আছে।

এখন আসা যাক্ আমাদের দেশের জোটের আলোচনায়। এ দেশে জোট হয় নির্বাচনের আগে। কারন দলগুলি আদর্শহীন। দেশে রাজনৈতিক দল গঠনে কোন আইন নেই। তাই ব্যাঙ্গের ছাতার মত দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে দলের সংখ্যা ১৯৩, নিবন্ধিত (নির্বাচনের অনুমতি পাওয়া) দলের সংখ্যা ৫৪, জোটের সংখ্যা আমার জানা মতে ৪ টি: আওয়ামী (১৪ দল), বিএনপি/জাতীয় ঐক্যজোট (২৩), বামপন্থী (৪ দল), ইসলামী ঐক্যজোট (সম্ভবতঃ ৫ দল)। আমার একটি চ্যালেঞ্জ: হাসিনা ও খালেদা কি তাঁদের নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত দলগুলোর নাম বলতে পারবেন? না। হাসিনা ও খালেদার কথা বাদই দিলাম, ওবায়েদুল ও মির্জা ফখরুল কি বলতে পারবেন? পারবেন না। আমার এ  চ্যালেঞ্জটি কোন সাংবাদিক বন্ধু কি পরীক্ষা করবেন?

আচ্ছা, এ সব জোটের সব দলের প্রধানরা কি বিগত নির্বাচনগুলোতে  জোটের মনোনয়ন পেয়েছিল? পায়নি। তাহলে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, ঐ সব দল জোটে গেল কেন? সোজা উত্তর গ্রাম্য ভাষায় – জোট ক্ষমতায় গেলে ফ্যান-কুঁড়া (উচ্ছ্বিষ্ট) পাওয়ার জন্য।আর এভাবেই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি প্রসারে অন্যতম অবদান।

রাজনীতির এ অবস্থায় হতাশ হলে, মনে মনে নজরুল ইসলামের “কান্ডারি” কবিতাটি  আবৃতি করি। মন একটু শান্ত হয়।

তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কি? কথায় বলে, গোবরেও পদ্ম ফুল ফুটে। সেজন্য মনে করি, একদিন হয়ত এই আদর্শহীনদের মধ্য হতেই একজন আদর্শবানের জন্ম হবে, যিনি আদর্শকে সব ক্ষেত্রে সমুন্নত রেখে একটা সুন্দর দেশ গঠনে নেতৃত্ব দিবেন।

E-mail:ahmaddrsultan@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!