আওয়ামী লীগের ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি বনাম অতীত রেকর্ড:বিবিসি

আরেকবার ক্ষমতা পেলে বাংলাদেশেকে আরো সমৃদ্ধি এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের ৮০ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ইশতেহারে।

‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামের ঐ প্রতিশ্রুতির দলিলে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ক্ষমতায় গেলে আগামী পাঁচ বছরে জিডিপি অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ১০ শতাংশ। ২০২১ সালে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ।

সেই সাথে, তিনি অঙ্গীকার করেছেন, ভবিষ্যতে তার সরকারের উন্নয়নের লক্ষ্য হবে “অন্তর্ভুক্তিমূলক”, অর্থাৎ যার সুফল সবাই পাবে, আয়ের বৈষম্য কমবে, মানুষের কাজের ব্যবস্থা হবে।

কিন্তু যে দল গত ১০ বছর ধরে ক্ষমতায়, তাদের দেওয়া অঙ্গীকারে কতটা ভরসা করবে মানুষ?

অর্থনীতিবিদ ড.নাজনীন আহমেদ বলেন, যেসব অর্থনৈতিক অঙ্গীকার আওয়ামী লীগ করেছে, তা একবারে হঠাৎ থলে থেকে বের করা হয়নি। সরকারের চলতি এবং ধারাবাহিক যেসব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলোই তুলে ধরা হয়েছে।

“সন্দেহ নেই যে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে উন্নয়ন হয়েছে, চোখে পড়ার মতো হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, কিন্তু সেই উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক কিনা – তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।”

“২০১৬ সালে যে ৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা শুরু হয় তাতে আয় বৈষম্য কমানোর কথা রয়েছে, কিন্তু গত তিন বছরে যে সব পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তাতে তো মনে হয়না যে সেই লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে।”

ড. আহমেদ বলেন, “মানুষ যে আরো দরিদ্র হয়েছে তা নয়, কিন্তু একজনের আয় হয়তো শতভাগ হারে বাড়ছে, আরেকজনের দশভাগ। দেশের একপ্রান্তে উন্নয়নের যে চিত্র আমি দেখি, উত্তরবঙ্গে বা চর এলাকায় তা দেখিনা। “

সরকারের চলতি এই রেকর্ড হঠাৎ করে আগামী পাঁচ বছরে বদলে যাবে, তা নিয়ে তেমন ভরসা সেই ড. আহমেদের।

প্রতিশ্রুতি বনাম অতীত রেকর্ড

মঙ্গলবার ইশতেহার ঘোষণার সময় শেখ হাসিনা বলেন, “মানুষ মাত্রই ভুল হয়। কাজ করতে গিয়ে আমার বা আমার সহকর্মীদের ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকতে পারে। আমি নিজের এবং দলের পক্ষ থেকে আমাদের ভুল-ভ্রান্তিগুলো ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখার জন্য দেশবাসীর প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি।”

ইশতেহারের কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সির ঢাকা অফিসের নির্বাহী পরিচালক ড ইফতেখারুজ্জামান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের প্রশংসা করেন।

“এ ধরনের ভুল স্বীকার আমাদের সংস্কৃতিতে বিরল। দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও এই বক্তব্যে তার ভেতর আত্মবিশ্বাসের একটি ঘাটতি চোখে পড়ে। এটি একটি ইতিবাচক বিষয়। এর একটি প্রতীকী গুরুত্ব আছে।”

কিন্তু, ড. জামান বলছেন, গত দশ বছরে দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সংগঠনের স্বাধীনতা যেভাবে খর্ব হয়েছে, তাতে মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ওপর ওপর কতটা ভরসা করতে পারবে – তা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।

“তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের কথা বলেছেন, কিন্তু যেভাবে গত দশ বছরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে সেটা তো অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের পরিপন্থী।”

“আওয়ামী লীগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলছে। গত দুবার নির্বাচনের আগেও বলেছিল, কিন্তু গত বছরগুলোতে যেভাবে বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, পুলিশ সহ জবাবদিহিতামুলক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে, তাতে তো দুর্নীতি দমনের কোনো সদিচ্ছা প্রকাশিত হয়নি।

“উন্নয়ন হয়েছে, টানা দশ বছর ধরে যে উন্নয়ন বাংলাদেশে হয়েছে, সেটা আগে কখনো হয়নি। কিন্তু অধিকারের জায়গাটিকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে।”

ফলে, ড. জামান মনে করেন যে বহু মানুষের মধ্যেই এসব প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ দেখা দেবে। সেইসাথে রয়েছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে মানুষের মনে বিরক্তি।

তবে ড. জামান এবং ড. নাজনীন আহমেদ দুজনেই মনে করেন দলগুলো যেমন, বাংলাদেশে ভোটাররাও এসব ইশতেহার এবং প্রতিশ্রতিকে গুরুত্ব দেয়না। দলগুলোর কাছে এসব ইশতেহার নেহাতই কাগুজে দলিল।

তারা বলছেন, মানুষ ভোট দেয় দলীয় আনুগত্য এবং বর্তমান সরকারের শাসনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!