অবিচারের সময় নিরপেক্ষতা আসলে জালিমের পক্ষাবলম্বন

আমার লিখালিখি নিয়ে সেদিন একজন মন্তব্য করল, ‘আপনার লিখা পড়ি। ভালই, কিন্তু কেমন যেন একপেশে। লিখায় নিরপেক্ষতা না থাকলে কি চলে? বোথ সাইড, মানে, উভয়পক্ষের সমালোচনা করতে পারেন না ? সবদিকে একটু ব্যালেন্স না করলে কি হয়?’
আমি ভাবলাম, তাই তো – উভয় দিকের মূল্যায়ন, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা এগুলো তো লিখালিখির মৌলিক গুন। এগুলো না থাকলে কি করে হবে? কিন্তু মনের কোনায় প্রশ্ন জেগে উঠল, ধরুন যদি কোন ফুটবল খেলায় কেউ মারাত্মক ফাউল করে, তাকে তো লাল কার্ড দেখাতে হবে, নাকি? খেলার নিয়মভঙ্গ করে অপরপক্ষকে যে আঘাত করে, তাকে সতর্ক করা, হলুদ কার্ড অথবা লাল কার্ড দেখানই তো রেফারির কাজ। নাকি এতে রেফারির নিরপেক্ষতা নষ্ট হয়ে যায়? আর রেফারি যদি ব্যালেন্স করার জন্য অপর পক্ষকে অযথা লাল কার্ড দেখায়, তখন আপনি কি বলবেন? আপনি কি তখন রেফারিকে নিরপেক্ষ বলবেন নাকি পক্ষপাতদুষ্ট বলবেন?
দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফাউল নিয়ে সমালোচনা করলে যখন কেউ এধরণের মন্তব্য করে তখন আমার শেখ কামালের একটি কাহিনী মনে পড়ে যায়। ঘটনাটি শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন তার “বলেছি বলছি বলব” বইয়ের একশ তিয়াত্তর নাম্বার পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন। ঘটনাটি তার ভাষাতেই বলি, “আবাহনীর সঙ্গে অন্য একটি টিমের খেলা চলছে। আবাহনী জিতবে। এগিয়েও আছে। ইউসুফ ভাই, আমি এবং শেখ কামাল একসঙ্গে বসে বাদাম খাচ্ছি এবং খেলা দেখছি। মধ্যমাঠে আবাহনীর এক প্লেয়ার ফাউল করল। রেফারি ননী বসাক, .. সে আবাহনীর বিপক্ষে ফাউল দিল। কিকও হয়ে গেল। এই ফাউল ধরাটা ঠিক, না বেঠিক বলা যাবে না। কিন্তু খেলার তাতে কোন লাভ-ক্ষতি হল না। কামাল কিন্তু গর্জে উঠল, দেখলেন, বেটা কিভাবে অন্যায় ফাউল দিল? বঙ্গবন্ধু পুত্রের অভিমত ! আমরা চুপ করেই রইলাম। খেলা শেষ হল। আমরা বিদায় নেব নেব করছি। ননী বসাক আমাদের দেখে মাঠ থেকে এদিকে উঠে এলো। ক্রীড়ামন্ত্রী রয়েছেন, তাদের সভাপতি আমি রয়েছি, শেখ কামাল রয়েছে। সে হাসিমুখে সবার সাথে হাত মিলাতে এগিয়ে এলো। কথা নেই, বার্তা নেই শেখ কামাল ননী বসাককে প্রচণ্ড এক ঘুসি মেরে ফেলে দিল। তার মুখ থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। শেখ কামাল রাগতস্বরে তখন চিৎকার করছে, বেটা সবসময় এমনি করে আবাহনীর বিরুদ্ধে বাঁশী বাজায়। ওকে আজ উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব”।
আপনি যদি উপরের ঘটনা লিখতে গিয়ে শেখ কামালের অন্যায়ের কথা তুলে ধরেন, তাহলে কি আপনার বর্ণনা একপেশে হয়ে যাবে? আচ্ছা সে কথা না হয় থাক, ধরুন আপনি ধারাভাষ্যকার হিসেবে জুগালি ক্লাব এবং মুগালি ক্লাবের ফুটবল খেলার ধারা বিবরণী দিচ্ছেন। দুদলের হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই চলছে। দুদলই ভাল খেলছে। খেলায় একটু আধটু ফাউল হচ্ছে। রেফারি বাঁশি বাজিয়ে ফ্রি-কিকের নির্দেশ দিচ্ছে। খেলার এই পর্যায়ে ধারাভাষ্যকার হিসেবে আপনি অবশ্যই উভয় দলের ভাল মন্দ নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করবেন। আবার ধরুন, খেলার দ্বিতীয় পর্যায়ে, জুগালি ক্লাবের জগলু এবং মুগালি ক্লাবের মগলুর মধ্যে বল কাড়াকাড়ি চলছে। হঠাৎ, বল কেড়ে নিতে না পেরে, জগলু মগলুর মুখে দুম করে একটা ঘুসি বসিয়ে দিল । রেফারি বাঁশি বাজিয়ে জগলুকে লাল কার্ড দেখাল। জুগালি ক্লাবের ম্যানেজার তাতে ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে পিস্তল হাতে মাঠে ঢুকে পড়ল। রেফারিকে পেটাতে শুরু করল। গুম করার হুমকি দিল। ধারাভাষ্যকার হিসেবে আপনি তখন কি বর্ণনা দেবেন? জুগালি ক্লাবের সন্ত্রাসের বিবরণ দিলে কি আপনি নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলবেন ? নাকি একজন নিরপেক্ষ ধারাভাষ্যকারের দায়িত্বই হচ্ছে মাঠে যে সন্ত্রাস চলছে তার বর্ণনা করা? এসময় যদি আপনি অন্য দলেরও দোষ খোঁজার চেষ্টা করেন অথবা সন্ত্রাসের ঘটনা চেপে যান সেটা কি নিরপেক্ষতা হবে নাকি শঠতা হবে?
একটি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অবশ্যয় আমরা উভয়ের ভালমন্দ নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করবো। যেমনটি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সবাই একসময় করে এসেছি। কিন্তু এখন? বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন কি স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে? বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উপরের উদাহরণের প্রথম, না দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে তা নির্ণয়ের ভার পাঠকদের উপরেই থাক। তবে একটি বিষয় আমাদের বোঝা দরকার তা হচ্ছে, কিছু মানুষ অপরাধীদেরকে আড়াল করার লক্ষ্যেই উভয়পক্ষকে দোষ দেবার চেষ্টা করে। বিষয়টি ভালভাবে বুঝতে নিচের কয়েকটি ঘটনা হয়ত সাহায্য করবে।
মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা সম্পর্কে দুহাজার তের সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অংসান সুচি দাবি করেছিলেন, “fear on both sides” অর্থাৎ শুধু রোহিঙ্গারাই নয় বৌদ্ধ চরমপন্থিরাও ভিত । উনি বোঝাতে চাইছিলেন সহিংসতা শুধু বৌদ্ধ চরমপন্থিরাই করছেনা, রোহিঙ্গারাও করছে। বার্মিজ উগ্রবাদীরা এই উক্তিটি শুনে খুব খুশি হয়েছিল। তবে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয়নি যে সুচি মূলত উভয়পক্ষের সমালোচনা করে এই গণহত্যাকে বৈধতা দেবার এবং গণহত্যাকারীদের রক্ষার চেষ্টা করছেন।
ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলের ঘটনা নিশ্চয় অনেকের মনে আছে। দুহাজার সতের সালের আগস্ট মাসে সেখানে বর্ণবাদ-বিরোধী এক বিক্ষোভে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের সহিংসতায় তিনজন নিহত হয়। এ ঘটনায় মূলত শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা দায়ী থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়পক্ষকেই দোষী করে বক্তব্য দেন। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে নব্য-নাৎসি এবং শ্বেত আধিপত্যবাদীরা খুব খুশি হলেও সাধারণ মানুষ বিষয়টাকে ভিন্নভাবে দেখেছিল। তাদের মতে ট্রাম্প মূলত চরমপন্থিদের অপরাধ আড়াল করে তাদেরকে আগলে রাখার জন্যই উভয়পক্ষকে দোষ দিচ্ছিল। অপরাধীদের বিচারের আওতায় না এনে উভয়দলকে দোষ দেওয়ার জন্য ট্রাম্প তখন তীব্রভাবে সমালোচিত হয়েছিল।
এখানে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করছি। দুহাজার আঠারো সালের মে মাসে জেরুসালেমে মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধনের প্রতীবাদ মিছিলে গুলি চালিয়ে ইসরায়েল অসংখ্য মানুষ হত্যা করে। এ ঘটনায় জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে এক বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধি মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকী হ্যালি উভয়পক্ষকে দায়ী করে বলে ইরান ও হামাসই মূলত এই ঘটনা উস্কে দিয়েছিল।
উভয়পক্ষকে সমালোচনা করতে বলা আপাতদৃষ্টিতে সঠিক ও বেশ নিরীহ বলে মনে হলেও উপরের ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে যে এটা আসলে অপরাধীদেরকে আড়াল করার জন্য একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। যখনই কেউ শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থিদের সন্ত্রাস, বার্মিজ উগ্রবাদীদের গণহত্যা অথবা ইসরাইলের জাতিগত নৃশংসতার সমালোচনা করে, ট্রাম্প, সুচি এবং নিকী হ্যালিরা উভয়পক্ষকে টেনে এনে অপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করে। ঠিক তেমনি ভাবে, একই উদ্দেশ্যে, যারা আজ বাংলাদেশে গুমখুন, ভোট-ডাকাতি, গণহত্যা, ব্যাংক ডাকাতির সমালোচনা করছে, তাদেরকে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে উভয়পক্ষের দোষ খুঁজতে বলা হচ্ছে।
এধরণের পরিস্থিতিতে উভয়পক্ষের দোষ খোঁজা নিরপেক্ষতা নয় বরং শঠতা। এটা কি আমার বানানো কথা? মোটেও না। পাঠকরা অনেকেই জানেন ইংরেজিতে একটা কথা আছে, Neutrality is hypocrisy on spilled blood – অর্থাৎ যখন রক্ত ঝরছে তখন নিরপেক্ষতা আসলে ভণ্ডামি । এছাড়া এ সম্পর্কে ডেসমন্ড টুটুর একটা বিখ্যাত উক্তি আছে, “If you are neutral in situations of injustice, you have chosen the side of the oppressor” – মানে হচ্ছে, আপনি যদি অন্যায়, অবিচারের সময় নিরপেক্ষ থাকেন তবে আপনি মূলত নিপীড়কের পক্ষ বেছে নিয়েছেন।
এ বিষয়ে ইতালির কবি দান্তের একটি উক্তি দিয়ে আজকের লিখাটা শেষ করছি, “The hottest places in hell are reserved for those who, in times of great moral crisis, maintain their neutrality.” – অর্থাৎ “নরকের সবচেয়ে অন্ধকার স্থানগুলি তাদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে যারা নৈতিক সঙ্কটের সময়ে নিরপেক্ষতার ভাব ধরে”।
বাংলাদেশের আজকের পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষতার অর্থ আসলে কি তা বিচারের ভার পাঠকদের উপরেই ছেড়ে দিলাম।
([লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক,আমার দেশে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!