অথঃলীগ পরিবার সমাচার

ড. মো. নূরুল আমিন :
কে একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চমৎকার একটি পঙক্তি লিখেছেন, পঙক্তিটি হচ্ছে, “ক্যাসিনো সম্রাট চাপা পড়লো পাপিয়ার নীচে, পাপিয়া চাপা পড়লো করোনার নীচে, করোনা চাপা পড়লো সাবরিনার নীচে, শাহেদ সাবরিনা চাপা পড়লো প্রদীপের নীচে, প্রদীপ চাপা পড়লো খিচুরীর নীচে, খিচুরী চাপা পড়লো ড্রাইভারের নীচে, ড্রাইভার চাপা পড়লো নূরুর নীচে, নূরুর বিরুদ্ধে তথাকথিত ধর্ষণ মামলা চাপা পড়লো এমসি কলেজের নীচে। অপেক্ষা করুন এটাও হয়তো চাপা পড়বে অন্য কিছুর নীচে। মাঝখানে পেঁয়াজ কার নীচে চাপা পড়েছে তা ভুলে গেছি। তবে সব জায়গায় কিছু সুশীল সমাজ চাপা পড়ছে তা নিশ্চিত।” এই বর্ণনা অনুযায়ী বাংলাদেশে গত বারো বছরের সব কেলেঙ্কারিই একের পর এক চাপা পড়ছে। আর নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে অভিনব আরেক কেলেঙ্কারি। এই কেলেঙ্কারির পেছনের হোতা হয় আওয়ামী লীগ না হয় ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, কিংবা লীগ পরিবারের নতুন অথবা পুরাতন কোনো সদস্য। গ্রামে-গঞ্জে এর ফলে নতুন প্রবচন তৈরি হয়েছে। আগে কেউ অপরাধ করলে মানুষ তাকে পশুর সাথে তুলনা করতো যেমন লোকটা কি মানুষ না পশু? এখন আর তা করে না, বলে লোকটা কি মানুষ না আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ। অর্থাৎ এরা দুর্ভাগ্যবশত লীগ পরিবারকে পশুর কাতারে নিয়ে গেছে। বিশ্বাস না হলে গ্রামাঞ্চলের পাড়া-মহল্লায় খবর নিয়ে দেখতে পারেন। খুন, রাহাজানি, ডাকাতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, দখলবাজি, অস্ত্রবাজি, গুম প্রভৃতি অপরাধের অনুঘটক হিসেবে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, সৈনিক লীগ প্রভৃতি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলো কীভাবে অপরাধপ্রবণতার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে তা সহজে বুঝতে পারবেন। তারা তাদের ‘মৌলিক’ অপকর্ম ছাড়াও দেশব্যাপী এখন ভাড়ায়ও খাটছে। অসাধ্য সাধন করতে চান? নতুন-পুরাতন শত্রুর সাথে পেরে উঠছেন না। বাড়ি দখল, ব্যবসা ও সম্পদ দখল করতে চান? তাদের সাথে চুক্তিতে আসুন। মনোবাসনা পূর্ণ হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান? হোস্টেলে থাকবেন এর প্রত্যেকটি কাজের জন্য তাদের রেইট আছে। চাহিদামতো টাকা দিন ভর্তি পরীক্ষা লাগবে না। অথবা যোগ্যতার শর্তও পূরণ করতে হবে না। বহুদিন আগে বিটিভ স্পেনসার অন হায়ার নামে একটি ছবি দেখিয়েছিল। স্পেনসার ভালো কাজে ভাড়া খাটতো, ছাত্রলীগ, যুবলীগ খাটে আকাম-কুকামে। ছাত্রলীগকে কেউ কেউ ফ্রাঙ্কেন্টাইন আবার কেউ কেউ ঘরের শত্রু বিভীষণের সাথে তুলনা করেন। ফ্রাঙ্কেন্টাইন ছিলেন ইংরেজ লেখিকা শেলীর প্রখ্যাত এক উপন্যাসের প্রধান চরিত্র, নায়ক একজন বিজ্ঞানী। তিনি মানুষের মতো একটি জীব সৃষ্টি করে তার নাম দিয়েছিলেন ফ্রাঙ্কেন্টাইন, নবসৃষ্ট এই ফ্রাঙ্কেন্টাইন তার স্রষ্টা বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কেন্টাইন থেকেও শক্তিশালী হয়ে মহামনিবের আকার ধারণ করে এবং তার স্রষ্টাকে ধ্বংস করে দেয়। কারুর কারুর ধারণা ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের সৃষ্টি এবং সংগঠনটি তার সন্ত্রাস অপকর্ম এবং ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে এতই পারঙ্গম হয়ে উঠেছে যে তার বিষাক্ত ছোবলে এখন স্বয়ং আওয়ামী লীগেরই অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে উঠেছে। আবার যেহেতু এর কাজকর্ম মূল সংগঠনের জন্য বদনাম কুড়াচ্ছে, তাদের জনপ্রিয়তাকে ধূলিস্মাৎ করছে এবং এর ফলে প্রতিপক্ষের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে সেহেতু তারা ঘরের শত্রু বিভীষণ না হয়ে যায় কোথায়? তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের বিভীষণ বলতে চাই না। হিন্দু পুরানের বিশ্রবা ঋষির বরপ্রাপ্ত তারই ঔরশজাত রসাতলের সুমালীর কন্যা কৈকসীর কনিষ্ঠপুত্র বিভীষণ ধর্মাত্মা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তার অন্য ভাইয়েরা রাক্ষস ছিলেন।
প্রশ্ন হচ্ছে ছাত্রলীগ কি আসলেই আওয়ামী লীগের শত্রু, ঘরের শত্রু? অনেকের মতে এ ব্যাপারে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ কী আওয়ামী লীগের শত্রু নয়? ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান এসেম্বলিতে স্পিকার শাহেদ আলীকে যারা হত্যা করেছিলেন তারা যেমন আওয়ামী লীগার ছিলেন, তেমনি শাহেদ আলীও আওয়ামী লীগার ছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডকে অসিলা করেই তৎকালীন পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে যারা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিলেন তাদের কেউই মুসলিম লীগ, জামায়াত, পিডিপি, নেজামে ইসলাম পার্টি অথবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ছিলেন না, বরং আওয়ামী লীগের নেতা এবং মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। নতুন মন্ত্রিসভা তারাই গঠন করেছিলেন এবং যে সংসদ এই হত্যাকাণ্ডকে ইনডেমনিটি দিয়েছিল সে সংসদের এবং মন্ত্রিসভার সদস্যরাও আওয়ামী লীগারই ছিলেন। যে কারণে অতীতে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল, একই অবস্থা এখনো বিরাজ করছে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ তথা লীগ পরিবারের সকল অঙ্গ সংস্থা সন্ত্রাস করছে, অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র, যুব ও শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীদের উপর হামলা করছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সম্পত্তি জবরদখল, ধর্ষণ, ব্যভিচার, জুয়া, কেসিনো, মাদকাসক্তি এমন কোন অপকর্ম নেই যা তারা করছে না। নির্বাচনে ভোট না দেয়ার অজুহাত তুলে গৃহবধূ তাদের গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এগুলো পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের সারাংশ মাত্র, কারুর মনগড়া কথা নয়। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এতে আওয়ামী লীগ হাই কমান্ড বা সরকারের নীতি-নির্ধারক অথবা তথাকথিত সুশীল সমাজের মধ্যে আপত্তি বা উদ্বেগের কোন লক্ষণ দেশের মানুষ দেখেনি। সিলেটের এমসি কলেজের হোস্টেলে এত বড় ঘটনা ঘটে গেল, প্রকাশ্য রাস্তা থেকে এক দম্পত্তির প্রাইভেট কার ছিনতাই করে স্বামীকে ড্রাইভারের আসন থেকে সরিয়ে দিয়ে একদল ছাত্রলীগ নেতাকর্মী নিজেরা ড্রাইভ করে গাড়িটি হোস্টেল ক্যাম্পাসে নিয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়কে কক্ষে আটক করে। স্বামীর সামনে স্ত্রীকে গ্যাং রেপ করেছে। এত বড় অনাচার এই দেশের মানুষ কি কখনও কল্পনা করেছে? ঘটনাটি ফাঁস হওয়া এবং পুলিশী রিমান্ডে অপরাধীদের অপরাধ স্বীকারের পরও কি সরকার অথবা সুশীলদের অথবা নারী নেতা-নেত্রীদের কোন নিন্দাসূচক বক্তব্য গণমাধ্যমে এসেছে? ছাত্রলীগ হেড কোয়ার্টার থেকে একজন নেতা তো ঘটনা অস্বীকার করে বললেন, ‘মেয়েদের দিকে আড় চোখে তাকায় এমন নেতা-কর্মী ছাত্রলীগে নেই। এ কথা বলার এক দিনের মাথায় বান্ধবীর বাসার কাজের মেয়েকে ধর্ষণের অপরাধে রাজধানীর সন্নিকটে একটি জেলার ছাত্রলীগের সহসভাপতি গ্রেফতারের খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সাথে সাথে একই দিন সিলেট, নরসিংদী, দিনাজপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও নাটোরে আরও কয়েকটি পৈশাচিক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে যেগুলোতে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরা জড়িত। একদিকে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে অন্যদিকে ইন্টারনেট ও আকাশ সংস্কৃতিতে পর্ণোগ্রাফির প্রচার ও প্রসার এবং নাটক সিনেমায় উলঙ্গপনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নীতি নির্ধারকরা নিশ্চুপ। আওয়ামী লীগ বিশাল একটি দল। তার নেতা-কর্মী এবং অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের নৈতিক কোন শিক্ষা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা তারা করতে পারেননি এটা ভাবতেই অবাক লাগে। পাঠকদের হয়তো মনে আছে যে, কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রী ঘটা করে নেতৃত্বের গুণাবলী যাচাইয়ের অংশ হিসেবে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক-ফটোগ্রাফারদের ডেকে পাবনাতে রক্ত ও পেশাব পরীক্ষার একটি মহড়াই করে ফেললেন। বিশুদ্ধ রক্ত ও বিশুদ্ধ প্রস্রাবকেই তিনি ছাত্রলীগের নেতৃত্ব নির্বাচনের মাপকাঠি বলে গণ্য করেেলন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই আনুষ্ঠানিক প্যাথলজিকেল টেস্ট পাস করে যারা পাবনা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সেদিন অধিষ্ঠিত হয়েছিল তাদের সকলের বিরুদ্ধেই পরবর্তীকালে সন্ত্রাস, মাদকাসক্তি, চাঁদাবাজি এবং নৈতিক ভ্রষ্টাচারের অভিযোগ উঠেছিল। আমার যদি লজ্জা না থাকতো তাহলে আমি অবশ্যই বলতাম যে, যে সংগঠনের কর্মীদের রক্ত আর পেশাব পরীক্ষায় পাস করে নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জন করতে হয় সে সংগঠন তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত অধঃপতনের কোন্ স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে তা অবশ্যই ভেবে দেখা দরকার। এরা কি সত্যিকার অর্থে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার ও প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা রাখে?
বলা নিষ্প্রয়োজন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরের দিন থেকেই ছাত্রলীগ তার দুষ্কর্মের জন্য খবরের শিরোনাম হয়ে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি প্রভৃতির প্রেক্ষাপটে অবিলম্বে এই সংগঠনটির বিপথগামিতা রোধ করার জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করে দৈনিক প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকা বিশেষ রিপোর্ট, সম্পাদকীয় ও ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। এরই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের আগে অনেকেই জানতেন না যে, তিনি ছাত্রলীগেরও নেত্রী।
বছর দুয়েক পর তিনি পদে ফিরেও এসেছেন। তার এই পদত্যাগ ও পদে ফিরে আসার ঘটনা সংগঠনটির উপর কোন প্রভাব ফেলেনি বলে মনে হয়। উল্লেখ্য যে, যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন তখন জাহাঙ্গীনগরের একজন ছাত্রলীগ নেতার ধর্ষণের সেঞ্চুরি পালন ছাড়া ব্যাপক আকারে তাদের বিরুদ্ধে যখন তখন যেখানে সেখানে ধর্ষণ ব্যভিচারে লিপ্ত হবার পাইকারী অভিযোগ ছিল না। এখন এই অভিযোগ প্রায় পাইকারীই বলা যায়। বারো বছরে ছাত্রলীগের অবস্থা ও অবস্থান অনেক দৃঢ় হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে তারা কত মজবুত একটি জেলার ছাত্রলীগ সভাপতি কর্তৃক ২শ’ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের বিষয়টি ধরা পড়ার পর তা অনুমান সাপেক্ষ বলে অনেকে মনে করেন। সাধারণ মানুষ মনে করে যে, আজ যদি সারা দেশের ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের অবস্থা তদন্ত করে দেখা হয় তাহলে থলের অনেক বিড়ালই বের হয়ে আসবে।
ছাত্রলীগ ছাড়াও যুবলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, আওয়ামী লীগ, সৈনিক লীগ অর্থাৎ লীগ পরিবারের কোনও প্রতিষ্ঠানই এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা পাবে বলে মনে হয় না। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের কোন পথ এখনও পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে বলে মনে হয় না। একটি কথা তারা প্রায়ই বলেন, সেটা হচ্ছে লীগে অনুপ্রবেশকারী অন্য দল বিশেষ করে বিএনপি, ছাত্রদল, জামায়াত, শিবিরই তা করছে। এর চেয়ে বড় আত্ম প্রবঞ্চনা আর কিছুই হতে পারে না। অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চাইলে আওয়ামী লীগকে সত্যকে স্বীকৃতি দিয়ে তওবা করতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধের অনুশীলন ছাড়া নৈতিক ও আর্থিক চরিত্র বদলানো যায় না। এই মূল্যবোধকেই তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে এবং ততদিন তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখা শ্রেয় বলে আমি মনে করি।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!