সবাইকে কাঁদিয়ে অগ্নিদগ্ধ নুসরাতের চির বিদায়

পাঁচদিন একটানা মৃত্যুর সাথে লড়াই করে অবশেষে চলে গেলেন নুসরাত জাহান রাফি । বুধবার রাত সাড়ে ৯টার সময় তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপতালের চিকিৎসক অধ্যাপক রায়হানা আওয়াল।

অগ্নিদগ্ধ  নুসরাত ঢামেক হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। তার শরীরের ৭৫ শতাংশ আগুনে পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মেয়েটির ফুসফুসকে স‌ক্রিয় করতে মঙ্গলবার অস্ত্রোপচার করা হ‌য়।

গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন মেয়েটির মা। ছাত্রীর স্বজনদের অভিযোগ, মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন ছাত্রীটির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। গত শনিবার গুরুতর আহত অবস্থায় নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

লাইফ সাপোর্টের যাওয়ার আগে গত রোববার অগ্নিদগ্ধ নুসরাত চিকিৎসকদের কাছে জবানবন্দি দেন। তিনি বলেন, নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা প‌রি‌হিত চারজন তার গা‌য়ে আগুন ধ‌রি‌য়ে দেন। ওই চারজ‌নের একজনের নাম ছিল শম্পা।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) খন্দকার গোলাম ফারুক মঙ্গলবার সোনাগাজীতে গণমাধ্যমকে বলেন, শম্পা নামের যে হামলাকারীর কথা অগ্নিদগ্ধ মাদ্রাসাছাত্রী বলেছেন, সেই শম্পাকে পুলিশ মঙ্গলবার সকালে সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সোনাগাজী থানার পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার করা নারীর নাম উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

মঙ্গলবার মাদ্রাসাছাত্রীটির পরিবার বলেছে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের প্রতি তারা আস্থা রাখতে পারছে না। হাত-পা বেঁধে কেরোসিন ঢেলে মেয়েটিকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে পুলিশ ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করছে। এমনকি মামলার এজাহার নিয়েও পুলিশ কূটচাল চেলেছে।

পরিবারের এমন অভিযোগের পর মঙ্গলবার সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি উপজেলার নুসাতকে হত্যাচেষ্টার মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর করা হয়েছে।

এদিকে বুধবার অভিযুক্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সরাফউদ্দিন। ওই মাদ্রাসার প্রভাষক আফসার উদ্দিন ও ছাত্র আরিফের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন একই আদালত।

নুসরাত হত্যা চেষ্টা মামলায় বেরিয়ে আসছে অনেক রাঘব-বোয়ালের নাম

ফেনীর সোনাগাজীতে পরীক্ষা কেন্দ্রে আলীম পরীক্ষার্থী ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টার ঘটনায় সোমবার দুপুরে দায়ের করা এজাহারে সংশোধনী এনে কারাবন্দী অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলাহ, পৌর আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য মোকসুদ আলমসহ ৮ জন আসামীর নাম উল্লেখ করে এজাহার দাখিল করেছেন।

সংশোধিত মামলার অন্যান্য আসামীরা হচ্ছেন, মাদ্রাসার ইংরেজি প্রভাষক আবছার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের আহম্মদ, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফছার উদ্দিন এবং হাতে মোজা ও চোখে চশমা পরিহিত বোরকা ৪ জনসহ অজ্ঞাত আরো অনেকে। এজাহার নামীয় আসামীসহ ১০ জনকে পৃথক অভিযান চালিয়ে আটক করেছে পুলিশ।

আটককৃতরা হচ্ছে ওই মাদ্রাসার নাইট গার্ড ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মো. মোস্তফা, দফতরি মো. নূরুল আমিন, মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র সাইদুল হক, অধ্যক্ষের মুক্তির দাবীতে মানববন্ধনে নেতৃত্বদানকারী মাদ্রাসার প্রাক্তন সাউথইস্ট ব্যাংকের কুমিল্লা শাখার কর্মকর্তা কেফায়েত উল্যাহ জনি, প্রাক্তন ছাত্র ও মানববন্ধনে অংশগ্রহনকারী যুবক জসিম উদ্দিন, আলা উদ্দিন, নূর হোসেন হোনা মিয়া এবং ওই মাদ্রাসার আলীম পরীক্ষার্থী ছাত্রী ও অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাহর শ্যালিকার মেয়ে উম্মে সুলতানা।

আগে ঘটনার দিন আটক করা হয় মাদ্রাসার ইংরেজি প্রভাষক আবছার উদ্দিন ও আলীম পরীক্ষার্থী আরিফুল ইসলামকে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বাকী তিনজন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে। ছাত্রীর বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান মামলাটি দায়ের করেছেন।

এর আগে সোমবার দুপুরে দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করেন, তার বোনকে বোরকা পরিহিত ৪ জন অজ্ঞাতসহ অন্যান্য অন্যান্য আসামীরা গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে। সংশোধিত এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ভিকটিম নূসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার একজন নিয়মিত ছাত্রী ও ২০১৯ সালের আলীম পরীক্ষার্থী।

গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাহ তার দফতরি নূরুল আমিনের মাধ্যমে তাকে অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে পরীক্ষার আধা ঘন্টা পূর্বে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দেবে বলে তার বোনের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানীর চেষ্টা করে। এঘটনায় তার মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে অধ্যক্ষকে আসামী করে সোনাগাজী থানায় মামলায় দায়ের করেন।

পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠালে এজাহার নামীয় আসামীরা অধ্যক্ষের নির্দেশে মামলা তুলো নিতে তার মা ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিতে থাকে। এক সপ্তাহের মধ্যে যদি মামলা তোলা না হয় তাহলে পরিণাম ভাল হবেনা বলে হুমকি দেয়। গত ৬ এপ্রিল তার বোন আলীম পরীক্ষা দেয়ার জন্য ৮নং কক্ষে প্রবেশ করলে তার এক সহপাঠী দিয়ে তার বান্ধবী নিষাদকে মারধর করছে বলে মাদ্রাসা ভবনের ছাদে নিয়ে সেখানে চোখে চশমা, হাতে মোজা এবং বোরকা পরিহিত ৪জন দুর্বৃত্ত তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করে। একপর্যায়ে তাকে মারধর করে ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে হত্যার উদ্দেশ্যে আগুন ধরিয়ে দেয়।

রাফি বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে। রাফি সোনাগাজী পৌর এলাকার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মাও. একেএম মুসা মানিকের কন্যা। রাফির বাবাও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার একটি মাদ্রাসার শিক্ষক।

  • নয়া দিগন্ত অনলাইন

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!