বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ:বই রিভিউ:  আতফিয়া সাদিয়া

 

#বই_রিভিউ:  আতফিয়া সাদিয়া ।
নামঃ বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ
লেখকের নামঃ এহসানুল হক জসীম
প্রকাশনীঃ গার্ডিয়ান
ধরণঃ সমালোচনামূলক
পৃষ্ঠা ৪২৯
মূল্যঃ ৫০০/-
সংস্করণঃ ১ম ( মে ২০১৯)

‘বাংলাদেশ’- বাংলাদেশ হবারও বহুপূর্বে এই অঞ্চলে যেসব জনগোষ্ঠীর কথা জানা যায়, তারা কেউই ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। কিন্তু ইসলাম আগমনের পর যখন এই ভুখন্ডে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে, তারপর থেকেই এর অধিবাসীরা ইসলামকে এতটা আপন করে নেয় যে, ক্রমান্বয়ে এটি একটি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিনত হয়। পাশাপাশি দু’টি অমুসলিম রাষ্ট্র থাকার পরও ধর্মের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষ একেবারেই স্বতন্ত্র। ইসলাম তাদের কাছে পরম সম্মান আর ভালবাসার বিষয়। কিন্তু এমন একটা ইসলাম প্রিয় জনগোষ্ঠীকে আজ পর্যন্ত কোন ইসলামি দল সম্পূর্ণভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেনি। এখানকার জনগণ ইসলাম আর রাজনীতিকে আলাদাভাবে দেখতেই বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করে। যেন ইসলাম এক জিনিস আর রাজনীতি আলাদা জিনিস। ইসলাম থাকে মসজিদ আর মাদরাসায় আর রাজনীতি থাকে নির্বাচনে।

কিন্তু ইসলাম আর রাজনীতি যে আলাদা বিষয় নয়, বরং রাজনীতি ইসলামেরই একটা অংশ সেই বিষয়ে এই বইয়ের আলোচনাগুলো খুবই প্রাসঙ্গিক।
এখন একটা প্রশ্ন হলো রাজনীতি যদি ইসলামেরই একটা অংশ হয়, তবে কেন এমন ইসলাম প্রিয় একটা গোষ্ঠীকে আজও কোন ইসলামী দল নেতৃত্ব দিতে পারেনি?
কারণ তারা নিজেদেরকে সেইভাবে জনগণের কাছে গ্রহনযোগ্য করে গড়ে তুলতে পারেনি। তাদের গঠনতন্ত্র, কর্মপদ্ধতি এবং কৌশল মানুষের মন জয় করতে পারেনি।
অথচ এই সেই ইসলাম – যার সৌন্দর্য এই ভুখন্ডের প্রাচীন অধিবাসীদের ধর্মান্তরিত করে মুসলিম বানিয়েছে। ইসলাম তো কখনো পরিবর্তিত হবার বিষয় নয়। আজও সেই ইসলাম, সেই কুরআন, সেই হাদিস সর্বোপরি সেই জীবন বিধানই আছে, তবে কেন সেই একই উপাদান নিয়ে আজকের ইসলামী দলগুলো বাংলাদেশের ইসলাম প্রিয় মানুষগুলোর নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হচ্ছে?
কিসে তাদের ঘাটতি?
কোথায় তাদের কমতি?
সেই মহানবী স. এর জীবদ্দশা থেকে শুরু করে আজকের বাংলাদেশ পর্যন্ত, এই ভুখন্ডে ইসলামি রাজনীতির আদ্যোপান্ত আলোচনা করে, সেই সময় আর এই সময়ের অবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন লেখক।
তিনি বর্তমান ইসলামি দলগুলোর পিছিয়ে পড়ার স্বরুপ অনুসন্ধান করতঃ তা থেকে উত্তরণের উপায় তুলে ধরেছেন।

বইটিকে যদিও ” বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ” নামে নামকরণ করা হয়েছে, তথাপি এর ভেতরের আলোচনাগুলো (সেই আলোচনাগুলো প্রাসঙ্গিক অবশ্যই) দেখে মনে হয়, এর নাম “বাংলাদেশের রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ” হলেই যথার্থ হতো। যেহেতু বাংলাদেশে এমন কোন রাজনৈতিক দল নেই যারা ইসলাম ধর্মীয় ভাবাবেগ কে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার প্রচেষ্টা করেনি।

রাজনীতি নিয়ে একটা বই- ভাবলেই মনে হয় বোধহয় কত দুর্বোধ্য শব্দ আর আলোচনার সমাহার। কিন্তু বইটা পড়ে আমার মোটেও তা মনে হয়নি। কেননা প্রতিটি পারিভাষিক শব্দের সহজবোধ্য বিবরণ আলোচনার শুরুতেই আছে। যা বইটিকে সার্বজনীন করেছে।

কিছু তথ্য আমাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। যেমন, নাগরিক ধারণার বিস্তার ঘটে মদিনা রাষ্ট্র থেকে, ইসলামে রাজতন্ত্রের স্বরুপ, সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের ইসলামী দলের ভবিষ্যৎ, ইত্যাদি।
মুজিবকোটের উৎপত্তির ব্যাপারটাও ভালো লেগেছে।

বইটার কিছু কিছু জায়গায় লেখকের সমালোচনার ভাষাকে আমার কাছে কঠোর বলে মনে হয়েছে। তবে যেহেতু নামের মাঝেই ‘ব্যবচ্ছেদ’ শব্দটা আছে, সুতরাং এ থেকে মধুর ‘মালিশ’ আশা করাটা বোধহয় কাম্য নয়। উপরন্তু, এটা কোন সমালোচনামূলক গ্রন্থ নয়। যেহেতু এটা একটা গবেষনাপত্রের রূপান্তর, সেহেতু সমালোচনা গুলোকে তথ্য হিসেবে নিয়ে বিনয়ের সাথে নিজেদের ভুল সংশোধনের উদ্দেশ্যে পাঠ করলে তবেই এটি হতে পারে ‘মহৌষধ’।

রাজনীতি ইসলামেরই অংশ। মানুষ ব্যক্তিগত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে যেয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করতে পারলেও পারবে। সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাজনীতির কোন বিকল্প নেই। রাজনীতি মানব জীবনে কোন অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপার নয়। বরং জীবনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এক উপাদান। রাজনীতিকে আমরা দেখি একটা কুৎসিত অবয়বে। কিন্তু রাজনীতির সুফল মানুষ ততদিন পাবেনা যতদিন না সেখানে পরিচ্ছন্নতা আসে। আর পরিচ্ছন্নতা প্রতিষ্ঠায় ধর্মের কোন বিকল্প নেই। বইটা কোন রাজনৈতিক দলের জন্য নয়। বরং প্রতিটা মানুষের জন্য। কেননা যতদিন আমরা সচেতন না হবো, যতদিন নিজের মর্যাদা না বুঝবো ততদিন পর্যন্ত শোষিত হতেই থাকব। আমাদেরকে সেই সচেতন করে তুলতে এই বইটা হতে পারে এক চাবিকাঠি। হয়ত এটা দিয়েই উন্মোচন হতে পারে হৃত সৌভগ্যের দ্বার….

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!