ফ্রান্স প্রবাসীদের নিরাপত্তা :সমাধান কোনপথে ?

এম.আজাদ,প্যারিস ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮:ফ্রান্সের বিভিন্ন জায়গায় দুষ্কৃতকারীদের হাতে বাংলাদেশী অভিবাসীদের হেনস্থা হওয়ার ঘটনা বেড়েই যাচ্ছে, রাত্রে কাজ থেকে ফেরার পথে সর্বস্ব চিন্তাই ,বাসায় ঢুকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি রেখে মালামাল- টাকাপয়সা লুটপাঠ, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে ঢাকাতি এরকম অনেক নির্যাতনের খবর আসতেছে, আর খবর পেয়ে আমরা যেটা করি সেটা হলো ফেসবুকে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি, ভুক্তভুগীর সাথে একটি সাবলীল হাসিমাখা সেলফি ফেসবুকে আপলোড দিচ্ছি, সবাইকে দলমত নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানানোর আহবান জানাচ্ছি, কমিউনিটির নেতৃবৃন্দরা কেন এর বিহিত কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না তার জন্য গোষ্ঠী উদ্ধার করতেছি, আসলে কি এইসব প্রক্রিয়ায় চলমান সমস্যা থেকে উত্তরণের কোন সমাধান বেরিয়ে আসবে ? না মনে হয় না, কারণ উপদ্রব দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। এখন আমাদেরকে অল্টারনেটিভ কিছু ভাবা দরকার – ২০০৬ থেকে ফ্রান্সে আছি, আসার পর থেকেই অভিবাসী অধুষ্যিত এলাকায় (Seine-Saint-Denis) বসবাস ও টুকটাক ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িত আছি। আমার ব্যবসায় সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে ,পরিত্রানের রাস্তা খুঁজেছি, অসংখ্য ভুক্তভুগীর সর্বস্ব হারানোর কাহিনী শুনেছি, নানামুখী পদক্ষেপ নিতে অনেককে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি আর এসব করতে গিয়ে যেটুকু অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছে তার আলোকে এসব সমস্যা থেকে নিজেদেরকে অন্তত কিছুটা হলেও নিরাপদ রাখতে সাহায্যে আসবে এরখম কিছু পরামর্শ আপনাদের সাথে শেয়ার করার প্রয়জোনীয়তা মনে করছি-

১.আমাদের বসতবাড়িগুলোর জন্য অবশ্যই Assurance Habitation বীমা করে রাখবো (যদিও এটা ফরাসী আইনে বাধ্যতামূলক), এবং হাউজিং বীমা করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে আপনার বসতবাড়ি চুরি কিংবা ডাকাতি হলে তদন্ত সাপেক্ষে তার ক্ষতিপূরণ যেন বীমা কর্তৃপক্ষ বহন করে। ২.ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও বাসায় এলার্ম সমেত সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রাখা, এতে করে হয়তো প্রতি মাসে আপনার ৫০- ৬০ ইউরো অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে হবে কিন্তু এ কারণে আপনি চুরি ডাকাতি থেকে অনেকটা নিরাপদে থাকতে পারবেন।ব্যবসায় অথবা বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এলার্ম ও ক্যামেরার সিস্টেমটি অন করে গেলে এই প্রযুক্তির কল্যানে অন্তত কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। স্বর্ণ- ডায়মন্ড কিংবা এরখম দামি জিনিসপত্র রাখার জন্য প্রায় প্রতিটি ব্যাংকের মধ্যে ভোল্ট আছে যেখানে আপনাদের মূল্যবান জিনিসপত্র অতি স্বল্প মূল্যে জমা রাখতে পারবেন।

৩. বাসায় কিংবা রাস্তায়, ব্যবসায় যেখানেই এরখম আক্রমণের ঘটনা চোখে পড়বে সাথে সাথে আপনার ফোনে ক্রেডিট না থাকলেও ১৭ নং ফোন করেন, ফরাসি অথবা ইংরেজি যে ভাষায় পারেন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন,অপারেটর আপনার ভাষা পুরোপুরি না বুঝতে পারলেও আপনার অবস্থান বের করে নিতে পারবে আর আপনি হয়তো জানেন না সাদা পোশাকের পুলিশ ঘটনার আশেপাশেই কোথাও আছে যেখান থেকে অতি দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে চলে আসবে।

৪. ব্যাচেলর বাসায় মূল্যবান প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিসপত্র রাখা যাবে না, যেমন : নগদ টাকা, দামি অর্নামেন্টস, ইলেট্রনিক্স ডিভাইস, মুঠোফোন ইত্যাদি। চিহ্নিত ছিনতাই এর স্থানগুলোতে বিশেষ করে রাত্রে বেশী মূল্যের ফোন বের করে কথা বলা থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে করে অপরাধী সহজে আপনাকে তার টার্গেট হিসেবে নিতে পারবে না।

৬. নিজেদের অতীব জরুরি গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র বা ডকুমের্ন্টস, পাসপোর্ট, কেইসের ফাইল, ব্যাংক-বীমার কাগজ ইত্যাদি, পরিচিত কোন সুরক্ষিত বাসায় রাখুন আর এগুলোকে স্ক্যান করে নিজের ই-মেইলে সেইভ করে রাখুন তাহলে কোন কারণে হারিয়ে গেলেও আবার মেইল থেকে বের করে নিতে পারবেন।

৭. দুস্কৃতিকারীদের চিহ্নিত স্থানগুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন, এবং সম্ভব হলে গভীর রাতে কাজ থেকে ফেরার পথে একের অধিক একসাথে চলাফেরা করুন।

৮. ফরাসি ভাষা শিক্ষার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করতে হবে যাতে করে অন্তত এরকম সমস্যার মোকাবেলা করতে প্রশাসনকে অবহিত করা যায় এবং বিষয়টি যথাসম্ভব ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়। তাছাড়া লক্ষ্য করে দেখবেন এই ভাষাগত দুর্বলতার কারণেই তুলনামূলকভাবে অন্য জাতির চেয়ে আমাদেরকে সন্ত্রাসীরা প্রথম টার্গেটে নিয়ে এসেছে।

. মেরি থেকে হোক বা বাড়ি ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে ৯৩ এলাকার বাইরে কোথাও চেষ্টা করা উচিত। যেখানে অপেক্ষাকৃত কম দুষ্কৃতকারীদের প্রভাব রয়েছে।

১০. প্রতিটি ছোট বড় অপরাধের জন্য অবশই থানায় মামলা করতে হবে, ফলাফল কি হবে সেটা না ভেবে আপনার হাউজিং বীমার জন্য এবং অন্যান্য মূল্যবান ইন্সুরেন্সকৃত পণ্যের ক্ষতিপূরণের জন্য এই মামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া প্রশাসনের কাছে জোট বেশি পরিমান অভিযোগ আসবে তার প্রয়জনীয় সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ নিতে তত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে। মনে রাখতে হবে অবস্থা যতই আমাদের প্রতিকূলে হোক আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার উপর থেকে আস্থা সরানো যাবে না। এখানে তথাকথিত নেতৃবৃন্দরা যারা নিজেরাই প্রতিনিয়ত এরখম আগ্রাসনের শিকার তাদের সাথে নিয়ে কেবল রবিবারে ছুটির দিনে বিকেলে মিছিল মিটিং না করে বুদ্ধিমত্তার সাথে নিজেদের জান-মাল রক্ষার স্বার্থে নিজেদেরকেই সচেতন হতে হবে আর তাহলেই হয়তো আমাদের উপর ঘটিত এসব নরপশুদের আক্রমন থেকে নিজেদেরকে নিরাপদে রাখতে সক্ষম হব ইনশাল্লাহ। আশা করি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগামী দিনের সমাজ হবে একটি সন্ত্রাসমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ । সবাই সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন।Azad Miah's Profile Photo, Image may contain: Azad Miah, closeup

এম.আজাদ,

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!