নির্বাচন কমিশনের স্মার্টকার্ডে অনিয়ম: বিশ্বব্যাংকের কালো তালিকায় নারায়ণের টাইগার আইটি

শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্মার্টকার্ড মুদ্রণসংক্রান্ত প্রকল্পে দুর্নীতির হদিস পেয়েছে বিশ্বব্যাংক। তারা দুর্নীতির অভিযোগ বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটিকে সাড়ে নয় বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানকে সাড়ে ছয় বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেছে।

এই একই বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ২০১৫ সালেও তদন্ত করেছিল। তবে তখন তারা দুর্নীতির কোনো আলামত খুঁজে পায়নি।

বিশ্বব্যাংকের অভিযোগে বলা হয়েছে, টাইগার আইটি ও এর চেয়ারম্যান বিশ্বব্যাংকের অনুদান ও ঋণনির্ভর কেনাকাটার নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন দরপত্রে অশুভ আঁতাত করে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠান যাতে দরপত্রে অংশ নিতে না পারে, সে জন্য প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিশ্বব্যাংক যখন অনিয়মের বিষয়ে তদন্ত করে যাচ্ছিল, তখন তারা অবৈধ পন্থায় তদন্তকাজকে প্রভাবিত করারও চেষ্টা করেছিল। এর আগে বিশ্বব্যাংক গত বছরের নভেম্বরে টাইগার আইটির একসময়ের আন্তর্জাতিক সহযোগী ফরাসি প্রতিষ্ঠান ওবারথুরকেও কালো তালিকাভুক্ত করে।

গত ২৪ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক বিষয়টি প্রকাশ করে। নিষিদ্ধ করাসংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের বোর্ড বিভিন্ন পক্ষের শুনানি গ্রহণ করে এ সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে এ নিয়ে শুনানি হয়।

ইসি ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর ভোটারদের স্মার্টকার্ড দেওয়ার জন্য আইডিয়া (আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম ফর ইনহ্যান্সিং অ্যাক্সেস টু সার্ভিসেস) প্রকল্প গ্রহণ করে। এর জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, স্মার্টকার্ড তৈরির জন্য আবেদনকারী একাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে ইসি আন্তর্জাতিকভাবে দুর্নামগ্রস্ত ওবারথুরকে কাজ দেয়। এ জন্য ইসি সচিবালয় দরপত্রের শর্ত এমনভাবে তৈরি করে, যাতে ওবারথুর ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান আবেদন করতে না পারে। ওবারথুরের স্থানীয় সহযোগী টাইগার আইটির পরামর্শে ইসি এই কাজ করে। পরে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। ওবারথুর স্মার্টকার্ড তৈরির কাজ পেলেও বাস্তবে তাদের হয়ে স্থানীয়ভাবে কাজ করেছে টাইগার আইটি।

দরপত্রের বিষয়ে সংক্ষুব্ধ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক বিষয়টি তদন্তের জন্য ২০১৫ সালের জুনে ঢাকাতে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল পাঠায়। কিন্তু তখন তারা তদন্ত করে কোনো দুর্নীতি খুঁজে পায়নি।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের দুই তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তদন্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে তাঁরা কোনো তথ্য জানাতে অস্বীকৃতি জানান।

ইসির সঙ্গে চুক্তির আগে থেকে ওবারথুর আর্থিক দেনায় জর্জরিত ছিল। স্মার্টকার্ড তৈরির কাজ হাতে নেওয়ার পরপরই প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক দায় থেকে রেহাই পেতে মরফো নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এক হয়ে যায়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের নাম আইডিইএমআইএ।

ওবারথুরের সঙ্গে ইসির চুক্তি হয় ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি। ইসির শর্ত অনুযায়ী তারা নয় কোটি ভোটারের জন্য স্মার্টকার্ড তৈরি করবে, কার্ড পারসোনালাইজেশন করবে (ভোটারের তথ্য সংরক্ষণ) এবং তা উপজেলা ও থানা পর্যায়ে বিতরণ করবে। ইসির সঙ্গে ওবারথুরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০১৬ সালের জুনে। কিন্তু একাধিকবার সময় বাড়ানোর পরও তারা যথাসময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি। যে কারণে ২০১৮ সালে ইসি ওবারথুরের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে।

জানা যায়, মালিকানা বদল হওয়ায় ওবারথুর সময়মতো খালি কার্ড সরবরাহ করতে পারেনি। নতুন নাম নেওয়া প্রতিষ্ঠান কার্ডের দাম বাড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে টাইগার আইটির সঙ্গে তাদের বিরোধ দেখা দেয়। দুই প্রতিষ্ঠানের বিরোধসংক্রান্ত মামলা বর্তমানে ঢাকার আদালতে বিচারাধীন।

টাইগার আইটিকে নিষিদ্ধ করাসংক্রান্ত বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংক বলেছে, স্মার্টকার্ডের দরপত্রে টাইগার আইটি প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের যোগসাজশেই দরপত্রের শর্তাবলি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে না পারে। ইসির দরপত্রের শর্তাবলি কেমন হবে, তা দরপত্র প্রকাশের আগেই একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করেছিল টাইগার আইটি।

এ বিষয়ে জানতে টাইগার আইটির পরিচালক তপনেন্দ্র নারায়ণের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।সূত্র :  প্রথমআলো

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!