দুই মামলায় খালেদার জামিন:স্থগিত চেয়ে সরকার পক্ষের আবেদন

কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কুমিল্লার  হত্যা ও নাশকতার দু’টি মামলায় ৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে নড়াইলের মানহানির মামলায় জামিনের আবেদন উপস্থাপিত হয়নি (নট প্রেসড রিজেকটেড) মর্মে খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। এই তিন মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের করা জামিনের আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল এ আদেশ দেন বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জে বি এম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ।
নড়াইলের মানহানির মামলাটিতে সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে আবেদন করা হয়েছে। সেখানে কি আদেশ হয়েছে, তা জানতে চেয়ে যথাযথ উত্তর না পেয়ে আবেদনটি উপস্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।
গতকাল আদেশের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যদি কাস্টডি ওয়ারেন্ট (সিডব্লিউ) না থাকে তাহলে যে দুটি মামলায় তাকে জামিন দেয়া হয়েছে, এর ভিত্তিতেই তিনি কারামুক্তি পাবেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়ার অন্য আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সরকার যদি অসৎ উদ্দেশ্যে অন্য কোনো মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার না দেখায় তাহলে তার কারামুক্তিতে কোনো বাধা নেই। আর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, নিম্ন আদালতে জামিনের বিষয়টি বিচারাধীন থাকাবস্থায় যদি হাইকোর্টে চলে আসা হয় এবং জামিন দিয়ে দেয়া হয় তাহলে দেশের সমগ্র বিচার ব্যবস্থার উপরে এটি প্রতিফলিত হবে।

অন্যরাও নিম্ন আদালতে নামমাত্র দরখাস্ত করে হাইকোর্টে চলে আসবে।
এদিকে কুমিল্লার দুটি মামলায় খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত চেয়ে গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালতে আবেদন করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। আজ এ বিষয়ে শুনানি হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। এর আগে সকালে হাইকোর্টের দেয়া আদেশের পরপরই অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছিলেন তারা হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা ও নাশকতার অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা দুটি মামলা এবং নড়াইলে মানহানির অভিযোগে করা একটি মামলায় জামিন পেতে গত ২০শে মে আইনজীবীদের মাধ্যমে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে আবেদন করেন খালেদা জিয়া। ২২শে মে শুনানি শুরু হয়। রোববার এ সংক্রান্ত শুনানি শেষ হয়। খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
গতকাল হাইকোর্টের আদেশের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন নড়াইলের মানহানির মামলার বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আবেদন করেছিলাম, ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট আদেশ দেননি। পরে আমরা হাইকোর্টে আবেদন করেছি। তিনি বলেন, আদালত বলেছেন, ‘আপনারা জজ কোর্ট হয়ে আসুন। জজ কোর্ট কোনো আদেশ না দিলে আমরা দেখবো।’ খন্দকার মাহবুব বলেন, এখন আমরা নড়াইলে যাবো। সেখানে আবেদন করবো। এটি জামিনযোগ্য অপরাধ। এ মামলায় জামিনের জন্য দরখাস্তও করতে হয় না।  ফৌজদারি আইন অনুযায়ী এ মামলায় জজ কোর্টও জামিন দিতে পারেন, হাইকোর্টও জামিন দিতে পারেন। নড়াইলের মামলার আবেদনে কোনো ভুল ছিল কিনা- এমন প্রশ্নে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমাদের কোনো ভুল নেই। এ মামলায় আমাদের জজ কোর্ট হয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, কোনো কোনো মামলায় তার (খালেদা জিয়া) বিরুদ্ধে কাস্টডি ওয়ারেন্ট আছে তার ওপরই তার কারামুক্তি নির্ভর করছে। কাস্টডি ওয়ারেন্ট যদি না থাকে তাহলে যে দুটি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন সেই দুটি মামলার ভিত্তিতেই তিনি  কারামুক্তি পাবেন। খালেদার আরেক আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, এ  মামলায় (নড়াইলে মানহানি) ২৫ তারিখ (২৫শে মে) আদেশ হওয়ার কথা ছিল। কালকে (রোববার) যে আদেশ দিয়েছে সেখানে ৩০শে আগস্ট তারিখ রাখা হয়েছে। এখানে আমাদের কোনো ভুল নেই। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় এবং কুমিল্লার দুই মামলায় খালেদা জিয়া জামিন পাওয়ায় তার কারামুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা নেই বলে দাবি করেন খালেদার আরেক আইনজীবী এ এম মাহবুবউদ্দিন খোকন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কুমিল্লার দুই মামলা ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। এখন তিনি তিনটি মামলাতেই জামিন পাওয়ায় তার কারামুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা নেই। তিনি আরো বলেন, নড়াইলের একটি, ঢাকার দুটি ও কুমিল্লার অন্য একটি মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। এখন সরকার যদি অসৎ উদ্দেশ্যে অন্য মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার না দেখায়, তবে তার কারামুক্তিতে কোনো আইনগত বাধা নেই।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, যে দুটি মামলায় জামিন প্রদান করা হয়েছে, সেই মামলায় আমাদের বক্তব্য ছিল যে, কোনো আসামি জামিনের বিষয়ে নিম্ন আদালতগুলোতে তার জামিনের প্রচেষ্টা করে তারপর তাকে হাইকোর্টে আসতে হবে। যেহেতু দুটি মামলাতে নিম্ন আদালতে তার প্রার্থনা বিচারাধীন আছে, সেহেতু বিচারাধীন থাকা অবস্থায় হাইকোর্ট থেকে  জামিন দেয়া ঠিক হবে না। তিনি আরো বলেন, এইভাবে নিম্ন আদালতে জামিনের আবেদন বিচারাধীন থাকাবস্থায় যদি হাইকোর্টে চলে আসা হয় এবং জামিন দিয়ে দেয়া হয় তাহলে দেশের সমগ্র বিচার ব্যবস্থার ওপরে এটি প্রতিফলন হবে। অন্যান্য সবাই একই পন্থা অনুসরণ করবে। সবাই সেশনস কোর্টে নামমাত্র দরখাস্ত করে যখন তখন হাইকোর্টে চলে আসবে। তিনি বলেন, আমরা আজকেই (সোমবার) হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিলে যাবো।
এদিকে  খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানানো ও তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে জাতির মানহানি ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে জন্মদিন পালনের অভিযোগে দায়ের করা দুই মামলায় জামিনের জন্য গত ২২শে মে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আজ এই আবেদনের ওপর শুনানি হবে বলে জানান খালেদা জিয়ার আইনজীবী একেএম এহসানুর রহমান। এ দুই মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে গত ১৭ই মে রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বিচারিক আদালত। আগামী ৫ই জুলাইয়ের মধ্যে এ আদেশ কার্যকর করে আদালতকে অবহিত করতে বলা হয় বিচারিক আদালতের আদেশে।
গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছর এবং অন্য আসামিদের ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। রায়ের পর খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে পুরান ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। গত ১২ই মার্চ হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দেন। গত ১৭ই মে আপিল বিভাগ এক রায়ে খালেদা জিয়ার জামিন বহাল রাখেন। পাশাপাশি সাজার রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার করা আপিল শুনানি আগামী ৩১শে জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন সর্বোচ্চ আদালত।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!