জাসিন্ডা আরডার্ন, আপনাকে স্যালুট

তাইসির মাহমুদ 

ব্রিটেন থেকে নিউজিল্যান্ডের দূরত্ব ১১ হাজার ৪২৬ মাইল। সময়ের ব্যবধান ১৩ ঘণ্টা। ১৪ মার্চ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে লন্ডনে যখন সাড়ে ১২টা, নিউজিল্যান্ডে তখন ১৫ মার্চ শুক্রবার দুপুর দেড়টা। ক্রাইস্টচার্চ শহরের আল-নূর ও লিনউড মসজিদে জুমার নামাজ চলছে।

ওই রাতে একটু দেরি করেই বিছানায় যাই। দেশ-বিদেশের সর্বশেষ খবর দেখে মোবাইল ফোনটি সাইল্যান্সে রেখে ঘুমিয়ে পড়তে যাব, ওই মুহূর্তে আচমকা একটি সংবাদ দেখলাম।

নিউজিল্যান্ডে একটি মসজিদে হামলা হয়েছে। অল্পের জন্য বেঁচে গেছে বাংলাদেশি ক্রিকেট দল। তখনও হতাহতের খবর আসেনি।

তাই ভাবলাম, আল্লাহ বাঁচিয়েছেন তেমন কিছু হয়নি। মোবাইলটি বালিশের নিচে রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে ঘুম থেকে জেগে মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলাম এ তো হামলা নয়, নারকীয় হত্যাযজ্ঞ।

জুমার নামাজের সময় গুলি চালিয়ে ৫০ মুসল্লিকে হত্যা করা হয়েছে। ফেসবুকে একের পর এক ভিডিও বার্তা ভেসে আসছে। সন্ত্রাসী ব্রেনটন ট্যারেন্টের স্টেনগান থেকে গুলি ছোড়ার ভয়াবহ দৃশ্য দেখে বুকটি কেঁপে ওঠল। দ্বিতীয়বার দেখার সাহস পেলাম না।

বিশ্বে প্রতিদিনই বহু হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আমরা পরিচিত। কিন্তু মসজিদের ভেতরে ঢুকে সিজদারত মুসল্লিদের পাখির মতো গুলি করে হত্যার ঘটনা সম্ভবত এই প্রথম। ইসলামের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনও ঘটেছে বলে শুনিনি। মক্কায় ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক যুগে রাসুল (সা.) নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলেও এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে ইতিহাসে পড়িনি। আজ চৌদ্দশ’ বছর পর ইসলামের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় রচিত হল।

ভাবছি, মুসলমান হত্যা তো এখন পানিভাত। মুসলমানের রক্তের কোনো মূল্য নেই। কিছুক্ষণ পরই দেশটির কোনো মন্ত্রী টেলিভিশনে কথা বললেন। কী আর বলবেন! সচরাচর অন্যান্য অমুসলিম দেশের প্রধানরা যেমন বলেন তেমনই বলবেন। বলবেন, হত্যাকারী মানসিক বিকারগ্রস্ত। পাগল। ঘটনার সময় মদ্যপ ছিল। তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে।

কিন্তু না, আমার ধারণা ভ্রান্ত করে দিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন অপকটে বললেন, এটি সন্ত্রাসী হামলা। তিনি ঘৃণাভরে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানালেন। আপাতত ভালো লাগল। যাক অন্তত সত্যকে সত্য বলেছেন। পশ্চিমা বিশ্বের মোড়লদের মতো হত্যাকারীকে বাঁচানোর জন্য কোনো ফন্দি-ফিকির করেননি। প্যাঁচগোছ দিয়ে কথা বলেননি। সরাসরি বলেছেন, সে সন্ত্রাসী। এরপর বললেন, নিউজিল্যান্ডের জন্য একটি অন্ধকার দিন। মনে হল তাহলে তিনি একজন ভালো প্রধানমন্ত্রী। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন।

কিছুক্ষণ পর আরও একটি সংবাদ দেখলাম। দেখলাম, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোন করেছেন জাসিন্ডা আরডার্নকে। জানতে চেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র্র কীভাবে তাকে সাহায্য করতে পারে। জবাবে জাসিন্ডা বলেছেন, মুসলিম কমিউনিটির জন্য আপনার ভালোবাসা ও সহানুভূতি চাই।

সাংঘাতিক কথা। মনের অজান্তেই বলে উঠলাম- শাবাশ প্রধানমন্ত্রী। আপনাকে স্যালুট। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আপনি খুবই উন্নত একটি নসিহত দিলেন। জাসিন্ডা আরডার্নের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়তে থাকে। এরপর দেখলাম তিনি ঘটনাস্থল আল-নূর মসজিদে ছুটে গেছেন।

তার পরনে কালো পোশাক। মাথায় কালো ওড়না। একজন অতি সাধারণ নারীর বেশে মুসলমান নারী-পুরুষের মাঝে তিনি হাঁটছেন। চোখে-মুখে সত্যিকার কষ্টের ছাপ। শোকমাখা মলিন চেহারা। ঘটনাস্থলে গিয়েই তিনি কালো অভিবাসী এক মহিলাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।

অনেকক্ষণ তাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকলেন। মহিলাটি তখন কাঁদছেন। জাসিন্ডা তখন তাকে কানে কানে কিছু একটা বলছেন। সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। তার কোলের শিশুটির গালে হাত দিয়ে আদর করছেন। এরপর তিনি সেখানে আরও অনেক মহিলাকে জড়িয়ে ধরলেন।

জড়িয়ে ধরলেন সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরিহিত এক বৃদ্ধ পুরুষকেও। তাকেও সাš¡—না জানালেন। মা যেমন সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেন তেমনই যেন জাসিন্ডা শোকবিহ্বল নারী-পুরুষকে বুকের সঙ্গে জড়ালেন ও কাঁদলেন। তার শোকমাখা মলিন চেহারা আর কান্না দেখে আমারও অশ্রু গড়াল। কারণ ইতঃপূর্বে কোনো অমুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানকে এভাবে আপন করে কোনো শোকাহত মুসলিমকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখিনি।

ইউরোপে অনেক প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি। সন্ত্রাসী হত্যাকাণ্ডের পর শোকাহত মানুষের পাশে দাঁড়ান। কিন্তু জাসিন্ডার মতো আপন করে নয়। তাদের আপন করে জড়িয়ে ধরার মাঝে কৃত্রিমতা দৃশ্যমান থাকে। কোনো কোনো সময় জড়িয়ে ধরেনও বটে। কিন্তু সেই আবেগ ও আন্তরিকতার ছোঁয়া থাকে না। এভাবে আন্তরিকতা নিয়ে মমতা ও ভালোবাসার সঙ্গে মানুষের কষ্টকে নিজের মতো অনুভব করে পাশে দাঁড়ানো মহিলাদের মধ্যে জাসিন্ডা আরডার্নকেই প্রথম দেখলাম।

এর পরের ঘটনাবলি তো সবার চোখেই দৃশ্যমান। সোশ্যাল মিডিয়ার সুবাদে মিনিটে মিনিটে কী ঘটছে তার আপডেট আমরা জানতে পারছি। তিনি ঘোষণা দিলেন রাষ্ট্রীয় খরচে নিহত সবার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। নিহতদের পরিবারের কেউ নিউজিল্যান্ডে এখনও স্থায়ী না হয়ে থাকলে তাদের নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব দেবেন। এভাবে প্রতিদিনই নিত্যনতুন ঘোষণা দেখে আসছিলাম।

এরই মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও দেখলাম। দেখলাম, নিউজিল্যান্ডের সংসদ অধিবেশন শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ সংসদ সদস্যরা পার্লামেন্টে প্রবেশ করছেন। সঙ্গে সঙ্গে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও মাথায় টুপি পরিহিত সফেদ দাড়িওয়ালা একজন বয়োবৃদ্ধ আলেমও সংসদে ঢুকলেন। স্পিকার ঘোষণা দিলেন তিনি পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করবেন। মাওলানা পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন। তেলাওয়াত শেষ হলে আরও একজন আলেম আয়াতগুলো ইংরেজিতে অনুবাদ করলেন। যে আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে, বিপদ-আপদ দিয়েই আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের পরীক্ষা করে থাকেন। আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হন তারা মৃত নন। বরং তারা জীবিত। কিন্তু তোমরা তা অনুধাবন করতে পার না।

পিনপতন নীরবতার মধ্য দিয়ে তেলাওয়াত ও অনুবাদ শুনলেন সংসদ সদস্যরা। প্রায় আধা ঘণ্টা সময়ের জন্য গোটা সংসদে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। এবার প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন উঠে দাঁড়ালেন। আসসালামু আলাইকুম বলে বক্তৃতা শুরু করলেন। তিনি তার দীর্ঘ বক্তৃতায় হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে তার দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনেক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বললেন। অস্ত্র আইনে পরিবর্তনের কথা বললেন। বক্তব্য শেষ করলেন ওয়া আলাইকুম সালাম বলে। এরপর সেখানে জামাতে নামাজ পড়া হল। তিনি মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাদের তিনি জামাতে নামাজ পড়ার সুযোগ করে দিলেন।

এখানেই শেষ নয়। এবার প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা ঘোষণা দিলেন, পরবর্তী শুক্রবার আল-নূর মসজিদে আনুষ্ঠানিকভাবে জুমার নামাজ পড়া হবে। ওইদিন মাথায় ওড়না পরে মুসলমানদের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করবেন দেশের সর্বস্তরের নারীরা। নাহ এখানেই শেষ নয়, ওইদিনের জুমার আজান নিউজিল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও রেডিওতে সম্প্রচার করা হবে এবং নিহতদের সম্মানে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হবে।

আগের শুক্রবারে যে মসজিদে নামাজ পড়ার কারণে নারকীয় তাণ্ডব দেখলাম, পরের শুক্রবারে সেই মসজিদ এলাকায় দেখলাম হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে নামাজ পড়ার অপূর্ব দৃশ্য। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর জড়ো হয়েছেন হত্যাস্থলে। মুসলিম মহিলাদের পাশাপাশি অমুসলিম মহিলাদের মাথায় কালো ওড়না। মহিলা পুলিশেরা মাথায় কালো ওড়না প্যাঁচিয়ে অস্ত্র হাতে নিরাপত্তা কাজে নিয়োজিত। টেলিভিশনের সংবাদ পাঠিকাদের মাথায়ও কালো স্কার্ফ। আর প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন শোকের পোশাক পরেছেন। তার সারা শরীর কালো পোশাকে ঢাকা। মাথায়ও কালো ওড়না। হাজার হাজার মানুষের কাতারে বসে আছেন। ইমামের খুতবা শুনছেন। এরপর পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী দাঁড়িয়ে দুই মিনিট নীরবতা পালন করলেন। বক্তৃতায় রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিস বললেন।

শুক্রবারের বিভিন্ন সংবাদপত্র বিশেষ প্রকাশনা বের করল। তাদের প্রথম পেজে আরবি ভাষায় লিখল ‘সালাম’। পাশে ইংরেজিতে লিখল ‘পিস’। অর্থাৎ শান্তি। নিচে লিখল সন্ত্রাসী হামলায় নিহত পঞ্চাশ মুসলমানের নাম। এরই মাঝে অস্ত্র আইন পরিবর্তন করা হল প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশমতো। মিলিটারি ব্যবহৃত অটোমেটিক স্টেনগান এখন আর কেউ বহন করতে পারবে না। সরকার একশ’ মিলিয়নের বেশি অর্থ দিয়ে নিষিদ্ধ সব অস্ত্র কিনে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডার এমন ভূমিকা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মনে দাগ কেটেছে। মুসলমানদের আবেগাপ্লুত করেছে। অনেককেই কাঁদতে দেখা গেছে। ভাবতে ভালো লাগে- এমন ভালো মানুষ এখনও পৃথিবীতে আছেন। নিউজিল্যান্ড যে শান্তির দেশ, সেটাই তিনি প্রমাণ দিলেন।

বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ এই নারী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখে আমি আপ্লুত হয়েছি। গত জুনে তার ঘরে একমাত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেছে। সন্তানের জন্মের পর মাত্র ছয় সপ্তাহ সময় তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি কাজেই ব্যস্ত। মাত্র ৯ মাসের শিশুপুত্রকে সংবাদপাঠক স্বামীর কাছে রেখে দিন-রাত ছুটে চলেছেন মুসলমানদের দ্বারে দ্বারে। আপন করে কাছে টেনে নিচ্ছেন শোকাহত মানুষকে।

অন্যান্য দেশে আমরা এমন ঘটনায় সরাসরি প্রধানন্ত্রীকে টিভিতে কথা বলতে দেখি না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রালয়ের মন্ত্রী কথা বলে থাকেন। কিন্তু এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা শুরু থেকেই মিডিয়ার সামনে হাজির ছিলেন। অন্য কোনো মন্ত্রীকে তিনি কথা বলার সুযোগই দেননি। যা বলার তিনিই বলেছেন, বলে যাচ্ছেন। তাকে দেখে মনে হয়েছে তেমন কোনো প্রটোকল মেইনটেইন না করেই টেলিভিশনে কথা বলছেন। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে চলেছেন।

জাসিন্ডা চোখে আঙুল দিয়ে বিশ্বের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের দেখিয়ে দিলেন কীভাবে রাজনীতি করতে হয়। কীভাবে বিপদে রাষ্ট্রের নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে হয়। কীভাবে সত্যকে সত্য বলতে হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কীভাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়। প্রতিটি ধর্মের মানুষকে কীভাবে সম্মান জানাতে হয়। জাসিন্ডার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। জাসিন্ডা আপনি শতায়– হোন। নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবি জানিয়ে তাকে খাটো করতে চাই না। তিনি যা করেছেন তার জন্য নোবেলের চেয়ে বড় কিছু থাকলে সেটিই তার প্রাপ্য। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় জাসিন্ডা আরডার্ন বিশ্বনেতাদের কাছে রোল মডেল হয়ে থাকবেন।

তাইসির মাহমুদ : সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ, লন্ডন

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!