জন্ম থেকেই শনির রাহুর আবর্তে বাংলাদেশ: ড. সুলতান আহমদ

১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবর রহামান ও অন্য ৩৪ জনকে আসামি করে “আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাা” রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগ এনে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মামলাটি দায়ের করে। আসামীদের মধ্যে তিনজন ছিলেন আমলা এবং বাকি ৩১ জন তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবিহিনীর নিন্মপদস্থ কর্মকর্তা – কর্মচারী। ১৯৬৯ এ ঢাকা সেনানিবাসে মামলার বিচার শুরু হবার পর, ঐ সনের ১৫ই ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানী এক হাবিলদারের গুলিতে পলায়নের সময় আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হক নিহত হন। এরপর উওেজিত জনগণের হিংসাত্নক কার্যকলাপ ও আন্দোলনের মুখে মামলাটি বন্ধ করে আসামীদেরকে মুক্তি দেয়া হয় ২২ ফেব্রুয়ারী, ১৯৬৯ সালে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারী ঢাকার রেইসকোর্স ময়দানে  ছাত্রদের একটি গ্যাং শেখ মুজিবকে’বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়।সেই গ্যাং এর মধ্যে শুধু তোফায়েল আহমদই আছেন আওয়ামী লীগে। অন্যরা আওয়ামী লীগ ছাড়ল কেন?

ঐ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে আইয়ুব খানের পতন ঘটেছিল এবং শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠেছিল। জনমতের আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে, ১৯৭০ এর নির্বাচনে মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে। যদি সার্জেন্ট  জহুরুল হক নিহত না হত, তাহলে ইতিহাসের মোড় ইউ-টার্ন করত। এ ষড়যন্ত্রের আগে কি মুজিব নিজ দলের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গের সম্মতি নিয়ে কাজটি করেছিল?মাত্র ৩ জন আমলা আর সামরিকবাহিনীর ৩১ জন পেটি অফিসার নিয়ে এ ধরনের উদ্ভট-আজগুবি আর বিস্ময়কর ষড়যন্ত্র একজন পরিপক্ক রাজনীতিবিদ হিসাবে নয়, মুজিবের নির্বুদ্ধিতারই পরিচয় বহন করে।

২০১০ সালে  সংসদ ভবনে ষড়যন্ত্রের সহযোগী ও ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী সংসদে স্বীকার করেন যে, তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগগুলি আনা হয়েছিল তা সঠিক ছিল। তিনি বলেছিলেন যে, তারা পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার জন্য শেখ মুজিবের অধীনে একটি সংগ্রাম পরিষদ (একটি কর্মপরিকল্পনা) তৈরি করেছিল।

এখন প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, ‘আগরতলা মামলা’ যে সত্য ছিল, তা জানতে জনগণকে ৪১ বছর অপেক্ষা করতে হল কেন? যদি জনগণ এটা আগে জানতে পারত, তাহলে শেখ মুজিব একজন রাষ্ট্রদ্রোহী হিসাবে জনগণের একরাশ ঘৃণা আর মীরজাফর হিসাবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হত। সেই প্রতারক রাষ্ট্রদ্রোহী মুজিবকে যে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়েছিল, তাদের কি অবস্থা হত? সুতরাং এখনো যারা মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ ডাকে তাদেরকে মীরজাফরের প্রেতাত্মা বলা কি ভুল হবে?

এরপর শুরু হল স্বাধীনতা যুদ্ধের মহাযজ্ঞ। ২৫ মার্চ, ১৯৭১ রাতের আঁধারে পাকিস্তানী হায়েনারা বাঙ্গালীদের উপর  শুরু করল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট হত্যাযজ্ঞ। “তোমাদের যার যা কিছু আছে, তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা কর,” এ রকম উদ্দীপনামূলক আহ্বানের পর, সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী এবং তাঁর পরিবারকে বন্দুকের মুখে রেখে, মুজিব আত্মসমর্পন করল পাকিস্তানের সামরিক জান্তার হাতে। এটা কি প্রতারনা নয়? স্বাধীনতা যুদ্ধের মহাযজ্ঞে মুজিব ছিল অনুপস্থিত। তাঁর অবর্তমানে মরহুম সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীনের বলিষ্ট, দৃঢ়, সাহসী ও যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব , এবং কর্নেল এম, এ, জি, ওসমানীর সামরিক নেতৃত্বে দেশ স্বাধীনতার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করল। স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের সমর্থন ও সার্বিক সহযোগীতার জন্য জনগণ কৃতজ্ঞ। ৭১ এর ডিসেম্বরের প্রথম দিকে ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী মুক্তিসেনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল। ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর প্রায় লক্ষাধিক সেনার আত্মসমর্পনের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় সূচিত হয়।

এখানে প্রাসঙ্গিক কিছু ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। সরকারি সেনবাহিনীর পাশাপাশি ‘মুজিববাহিনী’ নামে ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী যুদ্ধে অংশগ্রহন করে। এ বাহিনীটি সরকারী কমান্ডের অধীনে ছিল না। এ বাহিনীটি ভারতের গোয়ান্দাবাহিনী ‘র’ সৃষ্টি করে এবং তাদের নির্দেশ মত বাহিনীটি পরিচালিত হত। ভারত কি উদ্দেশ্যে এ বাহিনী সৃষ্টি ও পরিচালিত করত, সে রহস্য আজও অনুউদ্ঘাটিত। পাকিস্তানীবাহিনীর আত্মসমর্পনে মুক্তিবাহিনীর সেনাপতি ওসমানীর অনুপুস্থিতির ষড়যন্ত্র আজও অজানা থেকে রইল। এ জন্যই হয়ত ভারতীয় জেনারেলরা দাবি করার দুঃসাহস দেখায় যে, ভারতই যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে নাকি স্বাধীন করেছিল। সঠিক ইতিহাসের জন্য এ সব রহস্যজনক ষড়যন্ত্র পরিষ্কার হওয়া অত্যাবশ্যক।

দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর মুজিব পাকিস্তানীদের আটকাবস্থা হতে মুক্তি পেয়ে লন্ডন হয়ে ১০ জানুয়ারী, ১৯৭২ দেশে ফিরে আসেন। লন্ডনে যাত্রা বিরতির সময় সংবাদ সন্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, পকিস্তানীবাহিনী এ যুদ্ধে ৩ মিলিয়ন বাঙ্গালীকে হত্যা করেছে। (বিবিসির সাংবাদিক প্রয়াত আতাউস সামাদ এক লেখায় বলেন, লন্ডনে প্রেস কনফারেন্সের আগে নাকি উনাকে শহীদের সংখ্যা বলা হয়েছিল ৩ লাখের মত প্রায়। এই ৩ লাখকে ইংরেজীতে বলতে গিয়ে ৩ মিলিয়ন বলে ফেলেছিলেন। উনি নাকি লাখের ইংরেজী মিলিয়ন মনে করেছিলেন। পরে যখন উনাকে বলা হল, ৩ মিলিয়ন তো ৩০ লাখ, উনি নাকি বলেছিলেন, কইছি তো কইছিই, এইডাই সই! ) (ড. কামাল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেন। কারন তিনিও পাকিস্তাানী জেল হতে মুক্তি পেয়ে মুজিবের সঙ্গী হয়ে দেশে ফিরছিলেন।)  শহীদদের কোন তালিকা প্রনয়নের প্রয়োজন ও উদ্যোগ কখনো দেশে গৃহীত হয়নি। যা লজ্জাকর ও দূর্ভাগ্যজনক। প্রকৃতপক্ষে, শহীদদের সংখ্যা তথ্যভিত্তিক নয়, শুধু অনুমানভিত্তিক সংখ্যাই বাজারে চালু আছে। যা নোংরা রাজনৈতিক বিতর্কে পরিনত হয়েছে।

১৯৭২ এ শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহন করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচনায় ৪ টি মূলনীতি ভিত্তি হিসাবে গৃহীত হয়: গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ।যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছিল, তাদের জন্মলগ্ন হতে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা কখনো তাদের আদর্শ ছিল না। বরং সাম্রাজ্যবাদি শক্তির সহযোগীই  ছিল পরিচয়। এমনকি, মুজিবের ৬ দফার মধ্যেও ‘সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা’র কোন অস্তিত্ব ছিল না। তাহলে, এ দু’টি বিষয় রাষ্ট্রের মূলনীতিতে অন্তর্ভূক্ত হল কিভাবে ?

প্রকৃতপক্ষে, ১৯৭২ হতে ১৯৭৫ বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে এক বিভীষিকার শাসন। রক্ষীবিাহিনী দিয়ে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছে ৩০ হাজারেরও অধিক মুক্তিযোদ্ধাকে, লুটপাট আর দুর্নীতি ছিল সর্বত্র, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে মারা গেছে প্রায় তিন লক্ষ মানুষ। সর্বশেষে গণতন্ত্রকে হত্যা করে প্রতিষ্ঠা করে হয়েছিল একদলীয়  শাসন ব্যবস্থা “বাকশাল”। দুর্নীতি,আর দুঃশাসনের ফলশ্রুতিতে এক ক্যু এর মাধ্যমে মর্মান্তিক ও বেদনার শিকার হয়ে মারা যান শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য।

মুজিব সমর্থক রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবিরা গলা উঁচু করে বলেন, পাকিস্তানী সেনবাহিনী সব ধ্বংস করে গেছে, সে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের পূনর্গঠনের মত সময় মুজিব পাননি। তাঁদের এ যুক্তি ধোপে টিকেনা। কারন  ফ্রান্স ও আমেরিকার সঙ্গে তিন দশকের যুদ্ধে ১৯৭৫সালে উওর ভিয়েতনামের জয়ী হবার সময় ভিয়েতনাম পুরোই ধ্বংস স্তূপে পরিনত হয়েছিল। সেই ভিয়েনাম ২০২০ সালে উন্নত দেশের কাতারে অন্তর্ভূক্ত হবে। ১৯৭৫ হতে ১৯৭৮ এর মধ্যে খেমেরুজদের হাতে ২০ লক্ষ লোক নিহত হয়েছিল কম্বোডিয়ায়। সেই কম্বোডিয়ার অবস্থানও আমাদের অনেক উপরে। কিভাবে এ দু’টি দেশ স্বল্প সময়ে এত উন্নয়ন করল? শুধু একটি জিনিষ – উপযুক্ত রাষ্ট্রনায়ক। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে বাংলাদেশ অনেক শাসক পেয়েছে, কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক পায়নি। পার্থক্যটা এখানে।

শেখ মুজিব সপরিবারে নিহত হওয়ার পরদিন ১৬ অগাষ্টের ইত্তেফাকের সম্পাদকীয়ের শিরোনাম, ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’! মুজিব মরার পর ৮৬ হাজার গ্রামের একটি গ্রামেও একটি মিছিল হয়নি, অজ গাড়া গাঁয়ে তো আর ফারুক ডালিমরা অস্ত্র তাক করেছিল না। কেন এমন হল আওয়ামী বুদ্ধিজীবিরা অনুসন্ধান করলনা কেন? এক কথায় দুর্নীতিকে প্রশ্রয় ও দুঃশাসন।মুজিব হত্যার পর শাসনভার গ্রহন করেন তাঁর দলের সদস্য ও মন্ত্রীবর্গ। ৭৫ এর ১৫ ই আগষ্ট হতে ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত তাঁরা সরকার পরিচালনা করেন।

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মুজিব হত্যার পরিকল্পনার কথা জানতেন বলে আমি বিশ্বাস করি। তেমনি তিন বাহিনী প্রধানগন, রক্ষীবাহিনী প্রধান, DGFI, DB, CID এবং রক্ষীবাহিনীর বেসরকারি প্রধান তোফায়েল আহমদসহ মুজিব মন্ত্রী সভার অধিকাংশ সদস্যবৃন্দও জানতেন বলে বিশ্বাস করি। সুতরাং এ জঘন্য হত্যাকান্ডের জন্য শুধু জিয়াকে দায়ী করে হাসিনা অবিচার করছেন।

৮ই নভেম্বর, ১৯৭৫ জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহনের পর দেশ শাসনে স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভূক্ত করে অন্যায় করেছিলেন। ক্ষমতা নিরঙ্কশ করার জন্য ‘ক্যু’ এর অভিযোগ এনে অনেক মুক্তিযোদ্ধা সামরিক অফিসারদের সামরিক আদালতে ফাঁসি দিয়েছিলেন। এ সবের পরও, একদলীয় সাংবিধানিক বাধ্যবাদকতা থেকে মুক্ত করে বহুদলীয় গনতন্ত্র জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহন করেছিলেন। যারা পরবর্তীতে দলের নাম নিয়ে এ অবদানকে অস্বিকার করেছেন, তাঁরা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করার দলে। সংবিধানের আরও কিছু মূল বিষয় তিনি সংশোধন করেছিলেন।

১৯৮২ সাল জেনারেল এরশাদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেন। এরশাদ মোটামোটিভাবে  জিয়ার নীতি অনুসরন করেই দেশ শাসন করেন। সংবিধান সংশোধন করে সংবিধানের শুরুতে “বিসমিল্লাহির রাহ্ মানির রাহিম” সংযোজন করেন। ১৯৯০ সালে গণবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।

পরে ১৯৯১ এ নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহন করে এবং ১৯৭৫ হতে ১৯৯০ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসিত গণতন্ত্রের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে। যে আশা নিয়ে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক বিদ্বেষ, ক্ষমতার লোভ, দুর্নীতি, সন্ত্রাসের কারনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদল হলেও, কেউ গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোন উদ্যোগ গ্রহন করেনি। এর প্রধান কারন, দলীয় পর্যায়ে গনতন্ত্র চর্চায় পুরো অনীহা। ক্ষমতা চাই, গণতন্ত্র নাই।

আওয়ামী লীগের সহিংস আন্দোলনের ফলে ১৯৯৬ সালে অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধানটি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধানে সংযোজিত হয়। ১৯৯৬ হতে ২০০৮ পর্যন্ত তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। তন্মধ্যে দুইটিতে আওয়ামী জোট ও একটিতে বিএনপি জোট জয়লাভ করে।

১৯৯১ এর পর বিরোধী জোটের নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান, সংসদ সদস্যদের অব্যাহত সংসদ বর্জন, আন্দোলনের নামে তাদের সহিংসতা ও নিরীহ জনগণের প্রানহানী, যানবাহন ভাংচুর, বাসে দাহ্য পদার্থ দিয়ে মাানুষ পুড়িয়ে হত্যা, সিরিজ বোমা হামলা, রাজনৈতিক সভায় গ্রেনেড হামলা, লগি-বৈঠা দিয়ে রাজধানীর রাজপথে প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে মানুষ হত্যাসহ অমানবিক কার্যক্রম এখনো অব্যাহত। তাই ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার সরকার হটানোর সন্মিলিত আন্দোলন ২৮ বছরের শাসনামলে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

পিতা স্বীকৃত হয় জন্মের সময়। মুজিবের সময়ই সংবিধান রচিত হয়। সে সময় মুজিবকে জাতির পিতার স্বীকৃতি দেয়া হলনা কেন? ১১ আগস্ট, ২০০৮এর আগে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির কোন পিতা ছিল না। এর মানে, ৩৭ বছর বাংলাদেশ ছিল পিতা ছাড়া । Hahahaha …….. হাস্যকর!! ৩৭ বছর পর জাতির পিতার কোন প্রয়োজন আছে কি? মুজিব দেশকে ৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে শাসন করেন। ১৯৯৬- ২০০১ সাল পর্যন্ত ৫বছরের জন্য তাঁর কন্যা হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে মুজিব ‘জাতির পিতা’ উপাধির যোগ্য নয়। কারণ, (১) তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, যখন পাকিস্তানি সেনা জান্তা বাঙালিদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ শুরু করেছিল। বরং তিনি ১৯৭১সালের ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাজান্তার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর পুরো পরিবার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধান ও পূর্ন নিরাপত্তায় নিরাপদেই ছিল। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেননি। (২) তিনি তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী সিরাজ সিকদারকে হত্যা করে সংসদে দম্ভ ভরে বলছিলেন, “আজ কোথায় সিরাজ সিকদার ?” (৩) তিনি “রক্ষী বাহিনী” নামক একটি প্যারা-সামরিক বাহিনী তৈরি করে ৩০ হাজারের মত সাহসী মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেন এবং indemnity ঘোষণার মাধ্যমে তাদের অপরাধমূলক কার্যকলাপের বিচার বন্ধ করেন। (৪) ১৯৭৩ এ দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন ফলাফলে মুজিবের আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৩০০ এর মধ্যে ২৯৩ আসন। আসলে পেয়ছিল ২৯১ আসন। প্রয়োজন না থাকার পরও, বরিশালে জাসদের মেজর (অব) জলিল এবং দাউদকান্দি আসনে জাসদের ইঞ্জিনিয়র রশিদ সাহেবের ভোটের বাক্স ডাকাতি করে হেলিকপ্টারে ঢাকায় এনে নির্বাচনের ২/৩ দিন পর আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয়ী ঘোষনা করা হয়। দাউদকান্দি আসনে বিজয়ী ঘোষিত হয় খন্দকার মোস্তাক আহমদ। যিনি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুজিবকে তার পরিবারের সদস্য হত্যা করেছিলেন। (৫)গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করেন।  কিভাবে দেশদ্রোহী, প্রতারক, ভোট ডাকাত, গণতন্ত্র হত্যাকারী একজন মানুষ ‘জাতির পিতা’ হতে পারে? যারা মুজিবের মত একজন অপরাধীকে ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী,”সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ” বলে গলা ফাটায়, তাদেরকে ‘অপ্রকৃস্থ উন্মাদ’ বললে ভুল হবে কি? তারা স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, একে ফজলুল হককে দেখেনা; দেখে মুজিবকে।

২০১১ সালে শেখ হাসিনার সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবাধায়ক সরকার বিধান বাতিল করে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই সংসদ নির্বচনের বিধান পুনঃবর্তন করে। এর ফলে, ২০১৪ সালে প্রধান বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জন করায়, ১৫৪ (সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ) টি আসনে বিনাভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়। সংবিধানের দৃষ্টিতে নির্বাচনটি বৈধ হলেও, বাস্তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারকে বলা যায় ভোটহীন সরকার।

প্রধান বিচারপতি এস, কে, সিনহাকে পদত্যাগে বাধ্য করতে হাসিনা তাঁর অনুগত রাষ্ট্রপতি ও আপীল বিভাগের বিচারপতিগনকে দিয়ে দুর্নীতির যে ফাঁদটি তৈরি করেছেন, তাতে তাঁর চরিত্রের জঘন্য হিংস্রতার প্রকাশ ঘটেছে। ঐ দুর্নীতির কোন তদন্ত বা রায়ের রিভিউ এর জন্যত কোন পদক্ষেপই আর নেয়া হয়নি।

প্রতিহিংসা ও পরস্পরকে নির্মূলের ধারাও দেশের  রাজনীতির একটি  কলুষিত দিক। তার কিছু লক্ষন উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৯০ সালে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন দেশ – বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা পেলেও, বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রত্যখ্যান করে। পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেও সর্বজনস্বীকৃত যে তিনটি নির্বাচন হয়েছে, তাও বিরোধী দল প্রত্যাখ্যান করেছে।

জিয়াউর রহমান ও তাঁর দলের দিকে প্রতিহিংসা তীর হাসিনার। তা কারনগুলো হল: জিয়াই মুজিব হত্যকারী, ইনডেমনিটি দিয়ে মুজিব হত্যাকারীদের বিচারের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দূতাবাসে চাকুরী প্রদান। ইনডেমনিটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল ও চাকুরী দিয়েছিল খোন্দকার মোস্তাক আহমদ। পরবর্তীতে জিয়ার শাসনামলে সংসদে ইনডেমনিটি আইন আকারে পাশ হয়। যা না করলেও পারতেন জিয়া। তেমনি,  চাকুরীর মেয়াদ বাড়ানোও সমর্থনযোগ্য নয়। তবে এ সবের জন্য একমাত্র জিয়ার প্রতি প্রতিহিংসা হাসিনার পোষন করা কোন ক্রমেই সমর্থনযোগ্য নয়। তদুপরি জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা (কর্নেল এম,এ, জি ওসমানীসহ আরও অনেককেই) স্বিকার না করা হাসিনার ক্ষমার অযোগ্য ঔদ্ধত্ত ছাড়া আর কিছুই নয়।

অথচ যে এরশাদও মুজিবের খুনিদের শুধু চাকুরীতে বহাল রাখা নয়, তার পৃষ্ঠপোষকতায় ফারুক-ডালিমকে দিয়ে রাজনৈতিক দল ফ্রিডম পার্টি গঠন করেছিল এবং তারা সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিল এবং হাসিনাও ঐ সংসদের সদস্য ছিলেন।সংবিধান সংশোধন করে সংবিধানের শুরুতে “বিসমিল্লাহির রাহ্ মানির রাহিম” সংযোজন করে এরশাদ।  অথচ একই ধরনের অপরাধ করার পরও সেই এরশাদকে হাসিনা অপরাধ হিসাবে গন্য না করে, তার সঙ্গে সংসার (রাজনৈতিক) পেতেছে। তদুপরি যে মতিয়া, মেনন আর ইনু মুজিব হত্যার ভিত্তি তৈরীতে সহায়ক শক্তি ছিল, তারাও এখন হাসিনার ক্ষমতার strange bed fellow.

হাসিনার প্রতিহিংসার প্রত্যুত্তরে, বেগম জিয়া ১৯৯০ এ ক্ষমতা গ্রহনের পর জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে দাবি, ১৫ আগষ্ট বেগম জিয়ার  জন্মদিন উৎযাপন এবং ২১ আগষ্ট হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলাও কোনক্রমেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অংশগ্রহন করেছিলেন, তাঁদের মূল্যায়ন করতে হবে দুই পর্যায়ে : (১) মুক্তিযুদ্ধে হিসাবে যাঁরা অংশগ্রহন করেছিলেন, অবশ্যই তার স্বীকৃতি দিতে হবে, (২) দেশ স্বাধীন হবার পর (১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১), তাঁদের  অপরাধমূলক কাজের জন্য তিরস্কার ও আইনানুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা অপরাধ স্খলনে বিবেচিত হবে না।

আরেকটি দুষ্ট ক্ষত হল, অযোগ্য ও স্বঘোষিত দলীয় প্রধানদের উপাধি প্রদান: বঙ্গবন্ধু, জননেত্রী, গণতন্ত্রের মানসকন্যা, মৎস্যকন্যা, দেশরত্ন, দেশনেত্রী, mother of democracy, আপোষহীন নেত্রী, পল্লীবন্ধু, বঙ্গমাতা, ইত্যাদি ইত্যাদি।  উপাধি গ্রহীতারাও এমন গদগদভাব দেখান, যেন ধন্য হলেন। পৃথিবীতে এ রকম তৈলবাজ একটি দেশ দেখাতে পারবেন কি? চাটুকার-বাটপার মার্কা মনোনীত দলীয় কর্মীরাই এ কাজে পারদর্শী। এ উপাধিগুলো হল ময়ূরপুচ্ছের মত। কাউয়াদের গায়ে এ পুচ্ছ লাগিয়ে আমাদেরকে ময়ূরের নাচ দেখাচ্ছে । আর জনগণও কাউয়া মার্কা ময়ূর নাচ দেখে পুলকিত হবার পরিবর্তে,  তাদের জীবন ওষ্ঠাগত।

আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য হল, নির্বাচনের পরবর্তী সরকার গঠনের পর গণতান্ত্রিক শাসনের পরিবর্তে কতৃত্ববাদি, স্বৈরতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই সরকার পরিচালিত হয়ে আসছে। শনির রাহু মুক্ত হতে আর কত অপেক্ষা করতে হবে?

সবশেষে রাজনৈতিক মাঠের খেলোয়াড়দের স্মরন করাতে চাই: টিক‌টিকির লেজ গজা‌লেও যেমন কু‌মির হয় না, তেলা‌পোকা উড়‌তে পার‌লেও কেউ পা‌খি ব‌লে না।

E-mail: ahmaddrsultan@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!