চিরবিদায় মাওলানা আব্দুল হাই ভাই : মাটির ঘর  যেন হয় সত্যিকার ‘গার্ডেন অব পিস’

তাইসির মাহমুদ

ইস্ট লন্ডন মসজিদে আজ জুমআর জামাত শেষে ৮জন মানুষের জানাজা পড়লাম। লাশের সংখ্যা বেশি হওয়ায় দুই জামাতে পড়তে হলো। কারণ ইমাম সাহেবের মেহরাবের সম্মুখে যে রুমটি আছে তাতে একসাথে ৮টি কফিনের স্থান সংকুলান হয়না । প্রথম জামাতে ৫ জন পুরুষের জানাজা হলো, দ্বিতীয় জামাতে ৩ জন মহিলার।

Image may contain: 1 person, grass, tree, outdoor, nature and text

পুরুষদের মধ্যে একজন ছিলেন মাওলানা আব্দুল হাই খান। তিনি একাধারে একজন সুপরিচিত আলেম, ভালো শিক্ষক ও সংগঠক। স্পষ্টবাদী ও দৃঢ়চেতা হিসেবে সমাদৃত ছিলেন সর্বমহলে । বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের আতুয়া’য় গ্রামের বাড়ি। তাঁর বাবা মাওলানা খলিলুর রহমানও ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন । এলাকায় তিনি মোহাজির-এ-হিন্দস্থানী হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।

আমার বাড়িও শাহবাজপুর । তাই এলাকার সম্পর্কে তিনি বড় ভাই। বড় ভাই, ছোট ভাই হিসেবে একটি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক ছিলো। বাংলাদেশী মুসলিমস ইউকে নামে আলেম-সমাজের একটি বড় সংগঠনের গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। শাহবাজপুর ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিতেন । সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় অনুষ্ঠানের নিউজ পাঠাতেন। তাই সবসময়ই যোগাযোগ ছিলো।

যতদূর মনে পড়ে, তিনি সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায়ই লেখাপড়া করেন। ওখান থেকেই মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রী কামিল পাশ করেছেন। এরপর কর্মজীবনে বিভিন্ন স্কলে শিক্ষকতা করেছেন । আমাদের শাহবাজপুরের ঐহিত্যবাহী বিদ্যাপিঠ শাহবাজপুর দ্বি-পাক্ষিক হাইস্কলেও সম্ভবত কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। এরপর বিয়ানীবাজার দক্ষিন মুড়িয়া মাধ্যমিক স্কলেও দীর্ঘদিন শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন ।

ওই সময়ই তাঁর ব্রেন ক্যান্সার ধরা পড়ে। তখন ভারতের মাদ্রাজে গিয়ে চিকিৎসা করান এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন। একসময় চলে আসেন লন্ডন । এখানে আসার পর বিভিন্ন মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন সেন্টারে ইভনিং মাদ্রাসায় শিক্ষকতাও করেন। এক সময় নিজেই একটি ইভনিং মক্তব চালু করেন । নাম দেন কুরতুবা ইন্সটিটিউট। খুব কম সময়ের মধ্যেই এটি একটি সফল প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। পূর্ব লন্ডনে একাধিক শাখা চালু করেন কুরতুবা ইন্সটিটিউট- এর।

এরই মধ্যে একদিন জানা গেলো, আগের সেই ব্রেন ক্যান্সার আবার ফিরে এসেছে। ঘর থেকে হাসপাতাল, হাসপাতাল থেকে ঘর- আবার দৌঁড়াদৌড়ি শুরু হলো। একদিন তাঁকে ঘরে দেখতে গেলাম। সাথে ছিলেন নিউহ্যাম কাউন্সিলের ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার নাজির আহমদ ও লন্ডন বাংলঅ প্রেস ক্লাব সেক্রেটারি মুহাম্মদ জুবায়ের। তিনি জানালেন, ক্যান্সারের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তবে সেরে ওঠার সম্ভাবনা খুব কম। ডাক্তাররা খুব একটা আশাবাদী নয়। ওইদিন কিছুক্ষণ তাঁর সাথে কাটিয়ে চলে আসি । এর পর দু’তিন দিন ইস্ট লন্ডন মসজিদে দেখা হয়, কথা হয় । ভালোই মনে হয় দেখে। যদিও তার মুখ কিছুটা ফোলা ছিলো।
কিন্তু এর কিছুদিন পর খবর পেলাম তিনি শয্যাশায়ী। আমার ছোটভাই মোহাম্মদ রহিম তাঁকে দেখতে গেল একদিন । ফিরে এসে তাঁর ওপর একটি মর্মস্পী লেখা লিখলো। আমি সেটি যত্নসহকারে সাপ্তাহিক দেশ-এ ছাপলাম। ভাবলাম একদিন দেখতে যাবো। কিন্তু যাবো যাবো করে দ্বিতীবার আর যাওয়া হলো না। এরই মধ্যে তিনি চলে গেলেন।

পয়লা মার্চ শুক্রবার ভোরে ঘুম থেকে জেগে মোবাইল খুলতেই তাঁর মৃতু্য সংবাদ দেখতে পেলাম। নিজেকে বড় অপরাধী মনে হলো। কেন দেখতে যেতে পারলামনা আফসোস
হলো ।

যাক, আজ শেষ বিদায় জানালাম। মসজিদে জানাজা শেষে এলএমসি গ্রাউন্ড ফ্লোরে কিছুক্ষন তাঁর লাশ রাখা হয়েছিলো। এখানেই শেষ দেখা, শেষ বিদায়। এর পর নিয়ে যাওয়া হলো পূর্ব লন্ডনের সুপরিচিত মুসলিম গোরস্থান ‘গার্ডেনস অব পিস’-এর উদ্দেশে। ‘গার্ডেন্স অব পিস’ অর্থ-শান্তির বাগানগুচ্ছ ।

কায়মনো চিত্তে দোয়া করি, সকলের কাছে দোয়া চাই- আল্লাহ তায়ালা যেনো সত্যিকার অর্থেই তাঁর কবরকে শান্তির বাগান বানিয়ে দেন । আর আমাদের মৃতু্যকেও যেনো তিনি সহজ ও শান্তিময় করে দেন । মৃতু্য ভয়ে যেনো না কেঁদে, মৃতু্যর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারি। মৃতু্য হচ্ছে জীবনের একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি এবং অনন্ত অধ্যায়ের সূচনা। মৃতু্যকে যেনো আমরা হাসিমুখে আলিঙ্গন করতে পারি। আমিন।

তাইসির মাহমুদ
সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
শুক্রবার, ১ মার্চ ২০১৯

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!