গণতন্ত্রকামীদের চোখ এখন আলজেরিয়ার দিকে

প্রফেসর আলী রীয়াজ

সারা পৃথিবীতে যখন গণতন্ত্রে ভাটার টান চলছে, স্বৈরতান্ত্রিক শাসকেরা তাঁদের ক্ষমতাকে সংহত করছেন হয় শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে, সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে কার্যত ধ্বংস করে দিয়ে, কিংবা সিভিল সোসাইটিকে পর্যুদস্ত করে; সেই সময়ে কোথাও গণতন্ত্রায়ণের সামান্য সম্ভাবনা দেখলেই গণতন্ত্রকামীদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়, গণতন্ত্রমুখী প্রথম পদক্ষেপকে মনে হয় আলোকবর্তিকা। আলজেরিয়ার প্রায় ছয় সপ্তাহের গণ-আন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট আবদেলাজিজ বুতেফ্লিকার পশ্চাদপসরণ, ঘোষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বাতিল, তাঁর

প্রার্থী না হওয়ার ঘোষণা এবং শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ—সেই কারণেই আমাদের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, আমাদের আশাবাদী করে।

২০ বছর ধরে দেশ শাসন করেছেন বুতেফ্লিকা, তাঁর স্বৈরাচারী ব্যবস্থার শিকার হয়েছে দেশের সব স্তরের মানুষ। নিপীড়ন, নির্যাতনের পাশাপাশি গণতন্ত্রের বাতাবরণ তৈরি করা হয়েছে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে, বিরোধীদের সীমিত আকারে কার্যক্রম চালাতে দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে ২০১১ সালের গণজাগরণ, যাকে আরব বসন্ত বলেই বর্ণনা করা হয়ে থাকে, তার সমূহ ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে এই আশাবাদের সঙ্গে সবার মনেই উঁকি দেয় শঙ্কা। এই শঙ্কার কারণ, ‘ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়’।

বুতেফ্লিকার পতনের পর দেশটি কোন পথে অগ্রসর হবে, কার কী ভূমিকা হবে, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য আমাদের মনে রাখতে হবে যে বুতেফ্লিকার দুই দশকের শাসনই কেবল আলজেরিয়ায় স্বৈরশাসনের ইতিহাস নয়। এই পর্বের সূচনা হয়েছিল ১৯৯১ সালে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে। ১৯৯১ সালে স্থানীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থী এফআইএসের বিজয়ের কারণে ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠেয় সংসদীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয় ঠেকাতে সেনাবাহিনী পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থনে নির্বাচন বাতিল করে দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল। তারপরে এক দশক ধরে সেখানে চলেছে গৃহযুদ্ধ—ইসলামপন্থীদের একাংশের সঙ্গে সেনাবাহিনীর লড়াই। তাতে যে কেবল প্রায় দুই লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে তা–ই নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং তাদের পছন্দের লোকদের সম্পূর্ণ আধিপত্য তৈরি হয়েছে। আলজেরিয়ায় রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে ‘ডিপ স্টেটের’ এই আধিপত্য এখনো বহাল আছে।

২০১৩ সাল থেকেই অসুস্থতার কারণে চোখের আড়ালে থাকা বুতেফ্লিকাকে শিখণ্ডী রেখে এই ডিপ স্টেট এবং এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ী, এলিট শ্রেণি ও সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদেরা ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রেখেছেন। এসব অভিজ্ঞতা এবং ডিপ স্টেটের ক্ষমতার কারণেই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা কেবল যে বুতেফ্লিকার পদত্যাগের দাবিই করেছেন তা নয়, তাঁরা বিরাজমান ব্যবস্থা বদলের দাবি তুলেছেন। এই আন্দোলনের পেছনে রাজনৈতিক দলগুলোর উপস্থিতি, সমর্থন ও সংগঠন থাকলেও এর সূচনা এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন তরুণেরা। দেশের ৭০ শতাংশই তরুণ এবং দেশটি তেল ও গ্যাসের রপ্তানিকারক হলেও আলজেরিয়ার অনূর্ধ্ব ৩০ বছর বয়সীদের প্রতি চারজনে একজন বেকার। রাজনীতি ও অর্থনীতি, দুই-ই ক্ষমতাসীনদের কাছেধারের মানুষ বা ক্রোনিদের নিয়ন্ত্রিত; সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই এই আন্দোলন। গণতন্ত্র এবং ভাত-কাপড়-চাকরির সংগ্রামকে বিক্ষোভকারীরা একসূত্রে বাঁধতে পেরেছেন। আন্দোলনের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এই আন্দোলনে কোনো একক নেতৃত্ব তৈরি হয়নি, এমনকি একগুচ্ছ নেতা আছেন, তা–ও মনে হচ্ছে না। এ ধরনের নেতৃত্ববিহীন আন্দোলনের যেমন ইতিবাচক দিক আছে, তেমনি আছে নেতিবাচক দিক। প্রচলিত দলগুলোর বাইরে এসে তাঁরা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য তৈরি করতে পেরেছেন, তাঁরা সমাজের বিভিন্ন অংশের সমর্থন পেয়েছেন। কিন্তু তা তাঁদের কত দূর সংগঠিত রাখতে পারবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

সেনাবাহিনীর প্রধান আহমেদ সালাহ একাধিকবার বুতেফ্লিকাকে সরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন যে সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নেই। কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রধানের উদ্দেশ্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, এমন মনে করার কারণ তৈরি হয়নি। আলজেরিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এমন আশঙ্কাই করছেন যে সালাহ নিজেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে আগ্রহী। ইতিমধ্যেই এই পুরোনো রেজিমের লোকজন ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার’ নামে বিরাজমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার কাজে নেমেছেন। দেশের প্রচলিত সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করেছেন উচ্চকক্ষের প্রধান আবদেল কাদের বেনসালাহর কাছে। নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগপর্যন্ত ক্ষমতা তাঁর কাছেই থাকবে। কিন্তু বেনসালাহ বুতেফ্লিকার ঘনিষ্ঠ, এই কিছুদিন আগেই বুতেফ্লিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার পক্ষেই ছিলেন তিনি।

বিরোধী দলগুলো এবং বিক্ষোভকারীরা আগেই বলেছেন যে তাঁরা চান না যে এখন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ ক্ষমতায় থাকুক। কিছু বিরোধী দল, ইউনিয়ন এবং দেশের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল করা হোক। তাতে নেওয়া হবে যাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা, সততা এবং দক্ষতা রয়েছে। তাঁরা দাবি করেছেন, এই কাউন্সিলের কেউ নির্বাচন করতে পারবেন না, কাউকে সমর্থন করতে পারবেন না এবং তাঁদের মেয়াদ হবে ছয় মাস। তাঁরা স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবিও করেছেন। তাঁদের এই দাবিগুলো ‘রোডম্যাপ’ হিসেবে প্রকাশিত হলে অনেকে একমত হয়েছেন, কেউ কেউ এর সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা এ বিষয়ে কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখাননি।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিক্ষোভকারীদের এখন কী করা উচিত। ২০১১ সালের আরব বসন্তের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে তাঁদের সামনে দুটি পথ খোলা আছে, তাড়াহুড়ো করে একটি নির্বাচন করে ক্ষমতার হাত বদলের চেষ্টা, অথবা ধীরগতিতে সংগঠিতভাবে অগ্রসর হওয়া।

প্রথমটি আমরা দেখতে পেয়েছি মিসরে। তার পরিণতি সবার জানা। দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে যেহেতু বিরোধী দলগুলো দুর্বল এবং অসংগঠিত থাকে, সেহেতু ক্ষমতাসীনদের একাংশ এবং সেনাবাহিনী আবারও ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সক্ষম হয়। এর আরেকটি কারণ হচ্ছে, যাঁরা রাজপথের আন্দোলনে ছিলেন, তাঁরা বিক্ষোভে যতটা সফল হন; সময় এবং কৌশলের অভাবে তাঁরা নির্বাচনের রাজনীতিতে ততটা সফল হন না।

দ্বিতীয় বিকল্পের উদাহরণ হচ্ছে তিউনিসিয়া। তিউনিসিয়ার সাফল্যের সূত্র হচ্ছে দুটি। প্রথমত, আন্দোলনে সব মানুষের এবং তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন ইউনিয়ন, সিভিল সোসাইটি এবং রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি বড় জোট তৈরি, রাজপথে আন্দোলনকে অব্যাহত রাখা এবং সংস্কারের দাবিকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের কমিটি তৈরি করে দাবিদাওয়ার পক্ষে চাপ অব্যাহত রাখা। সেই সব কমিটিই নির্বাচনের সময়ে সংস্কারের পক্ষে প্রচারের কাজ করেছে। ২০১১ সালের নির্বাচনের পরে সেই কোয়ালিশন ভেঙে দেওয়া হলেও সংস্কারের আন্দোলনকে অব্যাহত রাখা হয়েছিল। ২০১৩ সালে যখন গণপরিষদ সংবিধান প্রণয়নে পিছিয়ে পড়েছিল, তখন বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং বিক্ষোভকারীরা আবারও একটি সাময়িক জোট তৈরি করে চাপ দিয়েছিল। ফলে ২০১৪ সালে নতুন সংবিধান তৈরির মধ্য দিয়ে এই সংস্কার আন্দোলন সাফল্য লাভ করে। তিন বছরের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণেই আরব বসন্তের ইতিবাচক উদাহরণ হতে পেরেছে তিউনিসিয়া।

গণতন্ত্রায়ণের প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের তাড়াহুড়া, সহজ পথের সন্ধান বিরাজমান কাঠামোর সুবিধাভোগীদেরই লাভবান করে অথবা তৈরি করে এমন এক প্রাণঘাতী সংঘাতের, যার সঙ্গে যুক্ত হয় বিদেশি শক্তি, মাশুল গুনতে হয় সাধারণ নাগরিকদের। গত ছয় সপ্তাহের আন্দোলনে আলজেরিয়ার আন্দোলনকারীরা প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা লিবিয়া এবং সিরিয়ার ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। তাঁরা মিসরের এবং তিউনিসিয়ার ঘটনাপ্রবাহ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন কি না, আগামী কয়েক দিনেই তা বোঝা যাবে। সারা বিশ্বের গণতন্ত্রকামীরা আলজেরিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!