খোলা চিঠিতে ডঃ তাজ হাশমি কর্তৃক ডঃ গওহর রিজভীর তীব্র সমালোচনা     

[হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা গওহর রিজভী সম্প্রতি আল জাজিরার ‘হেড টু হেড’ অনুষ্ঠানে সরকারের সাফাই গাইতে গিয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করলে উপস্থাপকের কাছে চরম হেনস্তা হন। পরে তার দীর্ঘ দিনের বন্ধু ডঃ তাজ হাশমি একটি খোলা চিঠিতে তার মিথ্যাচারের জন্য এবং ভোট ডাকাতি করা স্বৈরাচারী এ সরকারের সঙ্গে থাকার জন্য কঠোর সমালোচনা করেন, তাজ হাশমি বলেন, এ চিঠি দশ বছর আগেই লেখা উচিত ছিল। খোলা চিঠিটি ইংরেজীতে লেখা, যা New Age (5 March 2019), Countercurrents (March 2, 2019), South Asia Journal (1 March 2019), Bangladesh Chronicle (1 March 2019) পত্রিকাগুলিতে প্রকাশিত হয়। মাইনুদ্দিন সেজান তার অনুবাদ করে ১১ মার্চ ২০১৯ জবান পত্রিকায় প্রকাশ করেন।

প্রথিতযশা অধ্যাপক তাজ হাশমি ও প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী পরস্পর বন্ধু। সম্প্রতি আল জাজিরা’র ‘হেড টু হেড’ শো’য়ে গওহর রিজভী উপস্থিত ছিলেন। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় তিনি কিছু মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন বলে মনে করেছেন অধ্যাপক তাজ হাশমি। সে বিষয়ে বন্ধুকে খোলাচিঠি লেখেন তিনি। ইংরেজিতে লেখা সে চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছিল জবান’র ইংরেজি ভার্সনে। এখানে বাংলায় অনুবাদ করেছেন, মাইনুদ্দিন সেজান

নীচে দেখুন এই অনুবাদটিঃ

গওহর রিজভী’কে তাজ হাশমির খোলা চিঠি

অনুবাদঃ মাইনুদ্দিন সেজান 

প্রিয় গওহর,

আমার অন্তরের অনুভূতি বলছে আমার এই চিঠি আরো দশ বছর আগে লেখা উচিত ছিল, যখন তুমি প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছ। আমি অনুতপ্ত, একজন পুরনো ভাল বন্ধুর প্রতি কর্তব্য যথাসময়ে পালনে আমি করুণভাবে ব্যর্থ হয়েছি। তোমাকে নসীহত করা আমার উচিত ছিল, যা তখন আমি চিন্তা করেছি। এখনও মনে করি এটা একটা ভাল নসীহত হতে পারে, যে ভুল পথে রওনা করেছে। আমি জানি চিঠিটা লিখতে দেরি হয়ে গেছে, তুমি ইতিমধ্যে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গেছ। শুধু তাই নয়, তুমি জায়গাটা এবং এর সব বিষয় উপভোগও করছ। ফলে, তুমি ওই জায়গা আর ওখানকার মানুষগুলির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে পড়েছ।

আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, তোমার সাথীরা তোমার বন্ধু নয়। কারণ বন্ধুরা হচ্ছে, নিস্বার্থ শুভাকাঙ্ক্ষী, যেটি তারা নয়। সহজ কথায় তারা হচ্ছে সুযোগ সন্ধানী, ভ্রান্ত, ক্ষমতাপিপাসু লোক। নিজেদের স্বর্গে থাকার জন্য তারা যেকোন কিছুই করতে পারে, এবং করছেও। আমি খুবই দুঃখিত, কঠিন করে তোমার মুখের উপর এই কথা বলার জন্য যে, তোমার উপস্থিতি তাদেরকে ক্ষমতার চোরাপথে থাকতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। হয়ত তারা নিজেদেরকে বলছে, “যদি ড. রিজভী করতে পারেন, আমাদের উচিত আরও কর্মশক্তি ও দৃঢ়চিত্ত মনোভাব নিয়ে এ কাজ করা”।

কেন আমি মনে করি আমার এ চিঠি তোমার মিথ্যা এক গৌরবের দিকে পা বাড়ানো্র পরপরই লেখা উচিত ছিল। কারণ ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব ভাল বন্ধুত্বের যে গুণের কথা বলেছেন সেটা আমি বিশ্বাস করি। তিনি বলেছেন, যে তোমার ভুল ধরিয়ে সেই তোমার প্রকৃত বন্ধু, আর যে তোমার সামনে কেবল প্রশংসাই করে যায় সে তোমার ক্ষতি সাধনই করে। দুঃখিত, আমি ভ্রান্তির ভিতরে ছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো প্রচণ্ড অপরাধবোধ থেকে অনুশোচনা করবে। এই বিচারবোধ ও নির্বুদ্ধিতার জন্য আমি লজ্জিত।

চিঠিটা লেখার উদ্দেশ্য খোলাসা করে বলি। এই চিঠির উদ্দেশ্য এটা নয়, যে জায়গাটাকে তুমি নিজের আবাস ও বেহেশত বানিয়ে রেখেছ, বারের মালিক যেখানে সুস্বাদু মদ পরিবেশন করে, হয়তো বিনা পয়সায়! সেখান থেকে তোমাকে বের করে আনা।  যদিও এটা গোপন কিছু না, একটা দাম পরিশোধ করেই তো বারে ঢুকতে হয়। বোহেমিয়ান স্বচ্ছ গ্লাসে একা একা উপভোগ করতে থাকো মদের রঙ, ঘ্রাণ, আর স্বাদ ।

আমি চিঠিটা লিখছি পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরে। আরও স্পষ্ট করে বললে আমি লিখছি, অক্সফোর্ড ইউনিয়নে এক বিতর্ক সভায় শহিদুল আলমের গ্রেফতার ও নির্যাতনকে বৈধতা দিতে গিয়ে ক্যামরার সামনে নির্লজ্জভাবে তুমি কতগুলো মিথ্যা, আধা সত্য ব্যাপার বলে যাচ্ছ দেখে । যে তোমার নিজেরও একজন ভাল বন্ধু, বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তুমি সেটা স্বীকার করেছ। আমি লিখছি কারণ তোমার এত অধঃপতন আমি সহ্য করতে পারিনি।

প্রিয় কারো মুখের উপর স্পষ্ট করে অপ্রিয় সত্য কথা বলে দেওয়ার মানে হচ্ছে কাছের একজন মানুষের দরজা বন্ধ করে দেওয়া । এটা দু’জনকেই পীড়া দেয়, যে প্রিয়জনকে তিক্ত সত্যগুলো বলে আর কাছের মানুষ থেকে যে কঠিন কথাগুলো শোনে।

গওহর, তোমার এই পুরনো বন্ধু বিগত বছরগুলোতে তোমার অনুগ্রহ ও ভালবাসায় সিক্ত হয়েছে। আমি তাদের মত নয় যারা বন্ধুদের ভুলে যায়, তার চেয়ে খারাপ ব্যাপার উপকারের কথাও অস্বীকার করে। তুমি অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যান্থোনি কলেজে ১৯৯১ সালে আমাকে একটা লেকচার দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছ। তারপর বলেছিলে অক্সফোর্ডের কুইন এলিজাবেথ সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এফেয়ারসে  এক বছর মেয়াদি একটি মর্যাদাসম্পন্ন ফেলোশিপে আবেদন করতে। সেন্টারটির পরিচালক হিসেবে আমার ভিজিটিং ফেলো বাছাই প্রক্রিয়ায় তুমি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছ। এই ফেলোশিপ না পেলে  আমার দ্বিতীয় বড় বইটাসহ আরও কিছু জার্নাল আর্টিকেল, বুক চ্যাপ্টার লেখা আমার পক্ষে সম্ভব হত না। তুমি এসব করেছিলে বন্ধুত্বের উপহার হিসেবে। এখানেই তোমার অনুগ্রহের শেষ নয়। আমাকে তোমার ‘কনটেম্পোরারি সাউথ এশিয়া’ জার্নালের সম্পাদনা পরিষদের সদস্য করেছ। যেখানে আমি ১৬ বছর ব্যয় করেছি। তোমার গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স আমাকে যুক্তরাষ্ট্রে ভাল চাকরি পেতে সাহায্য করেছে। যেখানে রেফারিগণ তাদের প্রার্থীদের সমর্থনে সাধারণত তিনটি প্যারগ্রাফ লেখে সেখানে তুমি আমার উচ্চ প্রশংসায় তিন পৃষ্ঠার রেফারেন্স লিখেছ। যার যোগ্য নিজেকে আমি মনে করি না।

এখানেই শেষ নয়। তুমি আমার ‘গ্লোবাল জিহাদ অ্যান্ড আমেরিকা’ বইয়ের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছ যা অনেক পাঠককে আমার বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তোমার যোগ্যতা ও অক্সফোর্ড এবং ভার্জিনিয়ায় তোমার একাডেমিক অবদানের কথা আমি অনবরত লিখে যেতে পারব। যেভাবে তুমি ওয়ার্ল্ড-ক্লাস হিস্টোরিয়ান থেকে নিজেকে ওয়ার্ল্ড-ক্লাস অধ্যাপক, পণ্ডিত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ,পাবলিক পলিসি, গবেষণা ও উন্নয়নের পণ্ডিতে পরিণত করেছো, তা খুবই বিরল উদাহরণ। আমি এ চিঠিতে তোমার সব প্রশংসা লিখতে বসিনি। আমি স্পেডকে স্পেডই বলি।

আশা করি তুমি চিঠিটা ভালোভাবে নেবে। আমার সমালোচনা হচ্ছে তোমার এমন কিছুর সহযোগিতার ব্যাপারে। যার উদ্দেশ্য ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করা না। বরং তোমার ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা। যে ব্যাপারে তুমি একমত হতে পারো আবার দ্বিমতও পোষণ করতে পারো। এই সরকারের জন্য তোমার ডিফেন্স আমার মত অনেকে যাকে রিজিম ডাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, তা আমাকে ব্যথিত ও অবাক করেছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় তুমি এমন কিছু বলছ যা মূলত সত্য নয়। আশা করি, যদি আমি ওগুলোকে ডাহা মিথ্যা বললে তুমি কিছু মনে করবে না।

তুমি যেভাবে বর্তমান সরকারকে ডিফেন্স করছ তা আমাকে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে । বাংলাদেশে একদলীয় শাসনের কথা অস্বীকার করেছ। কিভাবে তুমি একদলীয় তামাশাকে বহুদলীয় গণতন্ত্র বল, যেখানে সরকারি দল ও বিরোধী দলের একই পথের পথিক। মনে হচ্ছে থেরেসা মে এবং জিরোম করবিন পাশাপাশি বসছে!

অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সাম্প্রতিক বিতর্ক, আলজাজিরা’র ‘হেড টু হেড’ প্রোগ্রামের  সঞ্চালক তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন ও তুখোড় মেধাবি মেহেদি হাসানের এটা মেনে নিতে অপারগ ছিলেন। আমি নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারিনি যখন তোমার সুদর্শন চেহারাটা আমার মনিটরে আর তুমি শান্ত স্বরে বলছ, ৪০ হাজার কেন্দ্রের মধ্য মাত্র ২০টি কেন্দ্রে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। অথচ আমার কাছের কোন বন্ধু বা আত্মীয় তাদের ভোট দিতে পারেনি। মধ্যদুপুর পর্যন্ত তারা ভোট কেন্দ্রগুলো বন্ধ পেয়েছে। বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় টিভি চ্যানেলে দেখায়  ৮টায় ভোট শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যালট ভর্তি বাক্স। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে, ভিতরে ভোটার না থাকলেও অসম্ভবকে সম্ভব কিছু বহিরাগতকে দেখা গেছে ক্রমাগত বক্সে ব্যালট পেপার ভরতে। (আমার ধারণা সীল মারা ব্যালটপেপার)। দিনশেষে শাসকগোষ্ঠী ৯০% শতাংশ ভোট পায়।  চট্টগ্রামের এক বিরোধী দলীয় প্রার্থী জনাব রুমি তার আসনে একটি ভোটও পায়নি। খুলনার একটি আসনে তো ভোটারের চেয়ে বেশি ভোট পড়েছে।

এটা লক্ষ্যণীয় যে,  ৩০ শে ডিসেম্বরের ‘নির্বাচনে’ ( নাকি তার আগের রাতে!) যেভাবে ক্ষমতাশীল দল আবার ক্ষমতায় আসে তা ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও বিব্রত করে ফেলে। এসব প্রহসন উত্তর কোরিয়া, মিশরের মত দেশগুলিতে হরহামেশাই হয়ে থাকে। তোমার আরেক বন্ধু অবসর প্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম মিলান বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের পর এটাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট নির্বাচন। আশা করি, তুমি তার কথা বিবেচনায় নেবে।

আমার জন্য শেষ হতাশা ছিল তোমার উদাস ও নির্লিপ বক্তব্যে- ‘ভাল বন্ধু’ শহিদুল আলমকে আলজাজিরা’য় সাক্ষাৎকার দেয়ার কারণে গ্রেফতার করা হয়নি, গ্রেফতার করা হয়েছে গুজব ছড়িয়ে সহিংসতাকে উসকে দেয়ার কারণে, এখানে কথা বলার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। তুমি এমন কিছু কথা উদ্ভাবন করেছ যা অক্সফোর্ড ইউনিয়নে দর্শক এবং লাখ খানেক মানুষ যারা পরে সম্প্রচার বা কম্পিউটারের মনিটরে দেখেছে তাদের বিভ্রান্ত করেছে। তুমি বলেছ, শহিদুল আলম গত বছরের ৬ আগস্ট তারিখে আলজাজিরা’য় বলেছেন,  যে আওয়ামী লীগ অফিসে কিছু লাশ রাখা হয়েছে এবং কিছু মেয়েকে অফিসে ধর্ষণ করা হচ্ছে। অথচ এটা শহিদুল আলম তার সাক্ষাৎকারে বলেননি।

উষ্ণ শুভ কামনা এবং ভালোবাসা রইল। কোন ব্যক্তিগত আক্রমন নয়, আমার বন্ধু!

ইতি,

তাজ হাশমি

 

এডজাঙ্কট প্রফেসর, ক্রিমিনাল জাস্টিস

 

অস্টিন পি স্টেট ইউনিভার্সিটি, টেনেসিস।

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!