কোরআনের মিশন ও তাবলিগ জামায়াতের মিশন: ড. ফিরোজ মাহবুব কামাল

মহান আল্লাহতায়ালার ঘোষণাঃ “তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে সমগ্র মানবজাতির জন্য। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অন্যায় নির্মূল করো এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাস করো..।” –(সুরা আল ইমরান, আয়াত ১১০)।এটি পবিত্র কোরআনের অতি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। উপরুক্ত আয়াতে মানব জাতির মাঝে মুসলিমদের মর্যাদা যেমন চিহ্নিত করা হয়েছে, তেমনি কেন সে মর্যাদা এবং কেনই বা তাদের উদ্ভব -সেটিও বলা হয়েছে। মুসলিমগণ বেশী বেশী নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাত পালন করে -সেটি এ আয়াতে তাদের শ্রেষ্ঠ উম্মত হওয়ার মাপকাঠি রূপে পেশ করা হয়নি। যে বিষয়টি এ আয়াতে গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো সুবিচারের প্রতিষ্টা ও অবিচারের মূলোৎপাটন। বেঁধে দেয়া হয়েছে, কি হবে মুসলিমদের ভূমিকা ও দায়-দায়িত্ব। অর্পিত সে দায়িত্বটি হলো, সমগ্র মানবজাতির মাঝে মানবতার শ্রেষ্ঠ মডেল রূপে বাঁচা। পবিত্র এ আয়াতটিতে ঘোষিত হয়েছে মুসলিম জীবনের ভিশন ও মিশন স্টেটমেন্ট। ভিশনটি হলো, সর্বজাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা লাভ। মিশনটি হলো, ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের নির্মূলের মধ্য দিয়ে সমগ্র মানব জাতির কল্যাণ সাধন। ভিশন তো ব্যক্তির জীবনে এমন এক স্বপ্ন -যা অর্জনে সে তার সমগ্র সামর্থকে নিয়োজিত করে। এবং মিশন হলো, মূলত সে ভিশনে পৌছার কর্মকৌশল।

 আল্লাহ নির্দেশিত সে ভিশন ও মিশন নিয়ে বাঁচতে হলে ঈমানদারের জীবনে কি করণীয় সেটিই ঘোষিত হয়েছে পূর্বে উল্লেখিত সুরা নিসার ১৩৫ নম্বর ও সুরা মায়েদার ৮ নম্বর আয়াতে। এ দুটি আয়াতে মহান আল্লাহর পক্ষে ও ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠায় দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মু’মিনের প্রতি মহান আল্লাহতায়ালার নির্দেশঃ “হে ঈমানদারগণ!তোমরা সুবিচারের প্রতিষ্ঠাকারি রূপে দাঁড়িয়ে যাও এবং আল্লাহর পক্ষে নিজেকে সাক্ষি রূপে পেশ করো –যদিও সে সাক্ষ্যটি তোমাদের নিজের বা তোমাদের পিতমাতা ও নিকটজনদের বিপক্ষে যায়;এবং সে দরিদ্র হোক বা ধনি হোক -আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট। অতএব সুবিচার প্রতিষ্ঠায় নিজ-প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। যদি তোমরা বক্রতা অবলম্বন করো বা পশ্চাৎপদ হও তবে নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের সমস্ত কর্মের পূর্ণ খবর রাখেন।”–(সুরা নিসা,আয়াত ১৩৫)।

 একই রূপ নির্দেশ দেয়া হয়েছে সুরা মায়েদায়।সেখানে বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ!তোমরা আল্লাহর জন্য খাড়া হয়ে যাও,সুবিচারের জন্য সাক্ষি রূপে দাড়িয়ে যাও।”-(সুরা মায়েদা আয়াত ৮)।প্রকৃত মুসলমান তাই শুধু জায়নামাযে খাড়া হয় না। শুধু রোযা বা হজ পালন করে না।বরং সর্বশক্তি দিয়ে খাড়া হয় মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষে। সে খাড়া হয় তাঁর দ্বীনের বিজয়ে। সে বিজয়টি আনতে যেমন নিজের শক্তি ও মেধার বিনিয়োগ করে,তেমনি অস্ত্রনিয়ে যুদ্ধও লড়ে।প্রয়োজনে প্রাণেরও কোরবানী দেয়। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে এ কোরবানি পেশে প্রবল প্রতিযোগিতাও দেখা দিত। প্রতিযোগিতা দেখা দিত জিহাদের ময়দানে সামনের কাতারে থাকা নিয়ে। মহান আল্লাহর কাছে মু’মিনের মর্যাদা বাড়ে তো তার দ্বীনের পক্ষে এরূপ খাড়া হওয়ার কারণেই। সে ব্যক্তিটি তখন স্বীকৃতি পায় তাঁর নিজ সেনাদলের সৈনিক রূপে।দায়িত্বপালনে নিহত হলে এমন ব্যক্তি পায় শহীদের মর্যাদা। আল্লাহতায়ালা এমন শহীদদের দেন মৃত্যুহীন জীবন। দেন বিনা হিসাবে জা্ন্নাত লাভের প্রতিশ্রুতি।

 ফলে যে দেশে ঈমানদারের সংখ্যা বাড়ে সে দেশে শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় মোজাহিদদের সংখ্যাও বিপুল ভাবে বাড়বে –সেটিই কাঙ্খিত। সেটি না হলে বুঝতে হবে প্রকৃত ঈমানদার রূপে বেড়ে উঠায় দেশবাসীর মাঝে বিরাট সমস্যা আছে। সমগ্র মানবকূলে মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব -তা তো সে মিশন পালনের বরকতে। মুসলিম হওয়ার অর্থই মহান আল্লাহর পক্ষ নেয়া। আল্লাহর পক্ষে খাড়া হওয়ার অর্থ,শুধু তাঁর নাম ও দ্বীনকে বিশ্বময় প্রচার করার কাজে নামা নয়। বরং তাঁর হুকুম তথা শরিয়তি বিধানকে বিজয়ী করা। আর শরিয়তের প্রতিষ্ঠার মাঝেই তো ইনসাফ ও ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা।

রাষ্ট্রের বুকে রাজার ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের প্রমাণ তো তার আইন বা হুকুম পালনের মধ্যে। রাজার আইন বা হুকুমনামাহ যদি ডাস্টবিনে গিয়ে পড়ে তবে কি তার ইজ্জত থাকে? তেমনি জমিনের উপর মহান আল্লাহর হুকুমত বা সার্বভৌমত্ব তো তাঁর নির্দেশিত শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। তাই শুধু সাহাবাদের যুগেই নয়,মুসলিম দেশে ইউরোপীয় কাফেরদের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত প্রতিটি মুসলিম দেশে আইন বলতে বুঝাতো শরিয়তি আইন। তাছাড়া শরিয়তের বিধান প্রতিষ্ঠা না পেলে কি ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা সম্ভব? শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ছাড়া সুবিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব -সেটি বিশ্বাস করাই তো হারাম। সেটি সম্ভব হলে শরিয়তি বিধানের প্রয়োজনীয়তাটি কি? সেটি বিশ্বাস করলে পরম অবিশ্বাস ও অবজ্ঞা করা হয় মহান আল্লাহতায়ালার কোরআনী বিধানের প্রতি।সেরূপ অবিশ্বাস ও অবজ্ঞার কারণে অবিশ্বাসী ব্যক্তিটি কাফেরে পরিনত হয়।

কিন্তু সে শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে তাবলিগ জামায়াতের লোকদের সে আগ্রহটি কোথায়? তাদের কথা ও কাজের মধ্যে যে আগ্রহটি নজরে পড়ে সেটি হলো মানুষকে নামাযে ডাকায়। তারা কিছু দোয়া-দরুদও শেখায়। কিন্তু আগ্রহ দেখায় না রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনে। তারা নেই রাজনীতিতে। কথা হলো রাজনীতিতে অংশ না নিয়ে কি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত পালন সম্ভব? নবীজী (সাঃ) নিজে ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হাতে না নিয়ে শরিয়ত প্রতিষ্ঠা বা পূর্ণ ইসলাম পালন কীরূপে সম্ভব? সেটি কি শুধু দোয়া দরুদে সম্ভব? সম্ভব কি ইজতেমায় লাখ লাখ লোকের সংখ্যা বাড়িয়ে? সে কাজে অপরিহার্য হলো মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তথা রাষ্ট্রের উপর দখলদারি প্রতিষ্ঠা করা এবং সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সুবিচারের প্রতিষ্ঠায় ও অন্যাযের নির্মূলে কাজে লাগানো। সেটির গুরুত্ব নবীজী (সাঃ) বুঝতেন বলেই হিজরতের পর কোন রূপ বিলম্ব না করে সাথে সাথে রাষ্ট্র গড়েছেন এবং রাষ্ট্র-প্রধান হয়েছিলেন। নবীজী(সাঃ)র সে সূন্নতটিকে শক্ত ভাবে ধরে রেখেছিলেন খোলাফায়ে রাশেদা। ফলে যাদের জীবনে রাজনীতি নেই এবং রাষ্ট্রের বুকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আগ্রহও নাই তারা আলেম, আল্লামা বা বুজুর্গ রূপে যতই পরিচিতি পান, তারা যে নবীজী (সাঃ)র সূন্নত থেকে বহু দূরে তা নিয়ে কি সন্দেহ থাকে?

অথচ বাংলাদেশে বহু আলেম,বহু নামাযী ও রোযাদার বেড়ে উঠেছে সে জাহিলিয়াত বা অজ্ঞতা নিয়ে।তাদের জীবনে আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে সাক্ষিদানে যেমন আগ্রহ নেই,তেমনি আগ্রহ নেই ইসলামের পক্ষের শক্তির হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দেয়ায় এবং শরিয়তের প্রতিষ্ঠায়। দেশের আদালতে শরিয়তি বিধান পরিত্যক্ত হলেও তাদের জীবনে তা নিয়ে মাতম উঠে না। বাংলার একটি জেলায় যত মসজিদ-মাদ্রাসা আছে নবীজীর আমলে বা সাহাবায়ে কেরামের আমলে সমগ্র মুসলিম রাষ্ট্রে তা ছিল না। প্রতিবছর টঙ্গিতে যতবড় ইজতেমা হয়,নবীজী(সাঃ) তার দশভাগের একভাগ ইজতেমাও নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি। সাহাবায়ে কেরামও পারেননি। কিন্তু তাদের হাতে সেদিন ইসলামের বিজয় এসেছিল।

সাম্প্রতিক কালে তাবলিগের ইজতেমায় লোক সমাগমে বিপুল সংখ্যায় বাড়লেও সে সাথে কি বেড়েছে ইসলামের বিজয়? বরং বেড়েছে তো পরাজয় ও কলংক। প্রাথমিক যুগের প্রতিটি মুসলিম সেদিন খাড়া হয়েছিলেন ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠার মিশন নিয়ে। সে কাজে তারা জান-মালের বিপুল কোরবানী পেশ করেছিলেন। সত্যই সেদিন মুসলিমগণ মানবতার ও দায়িত্বশীল মানবের শ্রেষ্ঠ মডেল রূপে বিশ্ব মাঝে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো, তাবলিগ জামায়াতের লোকদের মাঝে সেরূপ মডেল হওয়ার
তাড়নাটি কই? তাড়না কই ইসলামের বিজয় ও শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিয়ে? সে তাড়নাটি না থাকলে কাউকে কি সত্যিকার ঈমানদার বলা যায়? টঙ্গির ইজতেমায় বিপুল লোক-সমাগম নিয়ে গভীর আনন্দ ও তৃপ্তিবোধ নজরে পড়লেও এ ব্যর্থতা নিয়ে দুঃখবোধ কই?

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!