কী বিকল্প ছিল বিএনপির সামনে

রাজনীতিতে ইউটার্ন নিয়ে সংসদে গেছে বিএনপি। বিশেষ একটি পরিস্থিতিতে শেষ মুহূর্তে এসে সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করেছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু কৌশলগত কারণে শপথ নেননি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শপথ নেয়ার ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের চাপ থাকলেও যুক্তি দেখিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন তিনি। শীর্ষ নেতৃত্বের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে দলের নেতাকর্মীসহ শুভাকাঙ্ক্ষী মহলে। পুরো বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিরাজ করছে কৌতূহল। গুঞ্জনের ডালপালা ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। কিন্তু সংসদে না গিয়ে কি করতে পারতো বিএনপি? দলটির সামনে কার্যকর বিকল্পই বা কী ছিল? শপথ না নিলে কি ধরনের সঙ্কটে পড়তে পারতো, এখন কি ধরনের সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে বিএনপির নীতির্নিধারক ফোরামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও দলটির শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচিতদের অনেকেই তাদের মতামত জানিয়েছেন। সংসদে যাওয়া ছাড়া বিএনপির সামনে কী বিকল্প ছিল? এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর কারো কাছে নেই। মুখ খুলতে চান না বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সিনিয়র নেতারা। সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও দলের ভাঙন রক্ষায় এ সিদ্ধান্তটি এসেছে বলে মনে করেন প্রায় সবাই এবং তারা প্রশংসা করেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দূরদর্শিতার। তবে বিএনপির সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তে কিছুটা হলেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে ২০ দলীয় জোটে। ইতিমধ্যে এই ইস্যুতে জোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থ।বিএনপি নেতাসহ শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ বলছেন, সংসদে যাওয়ার কোন বিকল্প ছিল না। সংসদে না গিয়ে দাবি আদায় বা রাজনীতির মাঠে তেমন কিছু করার সক্ষমতা নেই বলেই কি বিএনপিকে এমন ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলো। কেউ বলছেন, একমাত্র বিকল্প ছিল আন্দোলন। বিএনপি রাজপথে থাকলেই ভাল হতো। যদিও রাজপথে থাকলে ক্ষতির আশঙ্কাও কম ছিল না। কোন অবৈধ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত না হয়ে জোর গলায় একে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যানোর মাধ্যমেই কেবলমাত্র এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তনের পথ নিশ্চিত করা সম্ভব। অনেকেই বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির লুকোনোর কিছু নেই। যদি রাজনৈতিক কারণে সমঝোতার প্রশ্ন আসে, সেটা প্রকাশ করলে নেতাকর্মীদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হতো না। বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতাদের অনেকেই সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্তের চেয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, বিএনপি যেভাবে সংসদে গেছে সেটা উচিত হয়নি। এখানে সংসদে যাওয়ার প্রক্রিয়া সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তবে সংসদে যাওয়া উচিত ছিল এবং সেটা কৌশলী অবস্থান তৈরির মাধ্যমে আরো আগে গেলেই ভালো হতো। কারণ নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে না যাওয়া গণতান্ত্রিক চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কেউ বলছেন, একজনের বিদ্রোহ, চারজনের শপথ গ্রহণ এবং মহাসচিবের শপথ না নেয়ার পুরো বিষয়টিই সম্পন্ন হয়েছে একধরনের গোঁজামিলের মধ্যদিয়ে। গত এক দশকে বিএনপির সামনে একেকটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি এসেছে। আর বিএনপি সে পরিস্থিতির শিকারে পরিণত হয়ে হাবুডুবু খেয়ে অসহায়ের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের সংসদে যোগদানের বিষয়টাও তারই ধারাবাহিকতা।ঢাকা মহানগর বিএনপির এক নেতা বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমেই একাদশ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। তারপরও সে জোটের কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু সংসদে অংশগ্রহণ প্রশ্নে জোটগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সিদ্ধান্তটিকে সার্বজনীন করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি। বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতার যায়গা হচ্ছে সিদ্ধান্তগ্রহণে দ্বিধা, অহেতুক বিলম্ব এবং শেষ মুহুর্তে তড়িঘড়ি। এটি শপথগ্রহণের সিদ্ধান্তের মধ্যদিয়ে আরো প্রকটভাবে প্রত্যক্ষ করলো দেশবাসী। প্রবীণ এক নেতা বলেন, সংসদে না গিয়ে বিএনপি কিছু করতে না পারলেও আওয়ামী লীগকে লিগ্যাসির সংকট নিয়েই চলতে হতো। বিএনপি সংসদে না যাওয়া মানে আওয়ামী লীগের অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার দাবি টিকে থাকা। অবৈধ তো অবৈধ। তাই আওয়ামী লীগের অবৈধ বা বিতর্কিতভাবে ক্ষমতায় থাকাটা সবসময় তাদের জন্য শঙ্কার বিষয় থাকতো। আওয়ামী লীগ এখন সেই সংকট থেকে মুক্ত। সংসদে গিয়ে মূলত বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনকে বৈধতা দিল। আবার খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন জেলা বিএনপির এক নেতা। তিনি বলেন, কি কৌশল নিয়ে আমরা নির্বাচনে গেলাম? যদি সংসদে যেতেই হতো কেন সংসদে যাওয়ার জন্য তখন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিরোধী দল হওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়ে কৌশল নির্ধারণ করা হলো না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপির কয়েকজন অ্যাক্টিভিস্টের মতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যথাসময়েই নিতে হয়। গ্রীষ্মের সিদ্ধান্ত বর্ষায় নিলে প্রশ্ন যেমন উঠে, কার্যকারিতাও পড়ে প্রশ্নের মুখে।সংসদে না গেলে বিএনপি কি কি অসুবিধায় পড়তো- এমন প্রশ্নের উত্তরে সম্ভাব্য নানা আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। বিএনপি দায়িত্বশীল কয়েকজন নেতার মতে, সংসদে যাওয়া আর না যাওয়া বিষয় নয়। যে প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত এলো তা অস্পষ্ট। এতে ফ্যাসিস্ট সরকারকে আস্কারা দেয়া হলো। এ সিদ্ধান্ত শুরুতেই নিতে হতো। তারা বলছেন, সংসদে না গেলে বিএনপি নিধনে অত্যাচারের মাত্রা দীর্ঘায়িত হতো। দলে ভাঙন ধরানোর জোরালো অপচেষ্টার মুখে পড়তে হতো। অন্য একজন নেতা বলেন, সংসদে না গেলে বিএনপি গণমানুষের আস্থায় থাকতে পারতো, এখন সেই আস্থায় কিছুটা হলেও চিড় ধরেছে। সংসদে না গেলে বিএনপি দাবি আদায়ে কোনো স্পেস পেতো না, তবে এখনো পাবে বলে বিদ্যমান ব্যবস্থা স্বীকৃত করে না।

বিএনপির একজন প্রবাসী নেতা বলেছেন, বিএনপি না গেলেও সংসদকে জায়েজ বানানোর জন্য এখন যারা শপথ নিয়েছেন তাদেরকে জোরপূর্বক নেয়া হতো। কেউ কেউ বলছেন, এমপিরা সংসদে না গেলে নতুন করে বড় কোনো অসুবিধায় পড়তো না বিএনপি। বরং বহিষ্কৃৃত এমপিদের সদস্যপদ বাতিল করার জন্য রিট করে রাখলে সেটা ভবিষ্যতে সকল দলের জন্য রেফারেন্স হয়ে থাকতো। সংসদ বিষয়ে অভিজ্ঞ এক নেতা বলেন, বিএনপি সংসদে না থাকলে দলীয় কোন এমপির বিরুদ্ধে সদস্যপদ খারিজের আবেদন করলেও সেটা কার্যকর করতে পারতো না। সংসদীয় বিধির অস্পষ্টতার পুরো সুযোগ নিতো সরকার। বিএনপির বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতা বলেছেন, দলগতভাবে বিএনপির সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক হয়নি। এটা সত্য যে, দলীয়গতভাবে সিদ্ধান্ত না নিলেও বিএনপির বেশিরভাগ এমপি ঠিকই শপথ নিতো। এই বিষয়টি মাথায় রেখে দলীয় চেইন অফ কমান্ড ভেঙ্গে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে দলের ইমেজ রক্ষা করতে শীর্ষ নেতৃত্ব শেষ মুহূর্তে এসে শপথ নেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে এটা পরিষ্কার। জেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, সংসদে না গেলে দলীয়ভাবে দলের কোনো ক্ষতি হতো না। বরং বিএনপি সংসদে না গেলে এই ভোটারবিহীন নির্বাচনে গঠিত অবৈধ সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রচার প্রচারণা আরো ব্যাপকতা লাভ করতো।

সংসদে যাওয়ায় বিএনপি কি কি সুবিধা পাবে এবং অসুবিধাই বা কি হতে পারে- এমন জিজ্ঞাসার জবাবে কিছু প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। তারা বলছেন, এ সিদ্ধান্তের লাভ-লোকসানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, কিভাবে সিদ্ধান্তটি নেয়া হলো। তবে সংসদে প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো হৈ চৈ করার বাইরে কোন ভূমিকা রাখতে পারে না। এটা সত্য যে, সংসদে গিয়ে সীমিত আকারে হলেও কথা বলার একটা জায়গা তৈরি হলো। আপাতত ঠেকানো গেলো দলের ভাঙন। ঢাকা মহানগর বিএনপির কয়েকজন নেতা বলেন, বিএনপির এই শপথ নেয়া এমপিরা যদি বাধ্য হয়ে সংসদে যোগ দিয়ে থাকেন তাহলে তাদের মাধ্যমে ভবিষ্যতে দলের জন্য আর কিছু আশা করা ঠিক হবে না। প্রবীণ এক নেতা বলেন, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে- রাজনীতির মাঠে অনেক পিছিয়ে পড়ে গেছে বিএনপি। ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং দলীয় কাঠমো সবকিছুতেই এলোমেলা অবস্থায় এখন। তাই বিএনপির পক্ষে বাংলাদেশে বড় কিছু করা অসম্ভব।

আশার দিক আছে একটাই, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনো আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে বিএনপিই আছে। তাই নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে সময় পরিবর্তন হলে তাতে বিকল্প এবং জনপ্রিয় দল হিসেবে বিএনপি যেকোনো মুহুর্তে ঘুরে দাঁড়াতো পারবে। কিছু নেতা মনে করেন, রাজনীতিতে প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কোন সমঝোতার অংশ হিসেবেই সংসদে গেছে বিএনপি। বিনিময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জামিনে বা প্যারোলে মুক্তি দেয়া হতে পারে। খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর দিন গ্রেপ্তার হওয়া তার বিশেষ সহকারী জামিনে মুক্তি পাওয়ায় সে বিশ্বাসটি দৃঢ় হয়েছে অনেকের। বিএনপির কয়েকজন শুভাকাঙ্ক্ষী বলেন, নবম সংসদে খোদ খালেদা জিয়াই ৩০জন এমপির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তখন বিএনপি সংসদে গিয়ে কিছুই করতে পারেনি। বরং তৎকালীন চীফ হুইপকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে ছিল যে পুলিশ কর্মকর্তা তাদের পুরস্কৃত করেছিল সরকার। যা বিএনপি নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে দেয়ার একটি উপলক্ষ্য হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক বিএনপির একটি শুভাকাঙ্ক্ষি গ্রুপের যৌথ বিবেচনায়- সংসদে গিয়ে কোনো কিছুই অর্জিত হবে না। বরং এই অবৈধ নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া হলো। অসৎ প্রক্রিয়ায় কোনো সৎ পরিণতি অর্জন সম্ভব নয়। গণপ্রতিনিধিত্বহীন একটি সংসদে ঢুকে সেখানে সে সিস্টেমের ভেতরে থেকে মানুষের মৌলিক ভোটাধিকার নিশ্চিত করা যায় না। এতে বরং একটি অবৈধ ও স্বৈরাচারি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে শক্তিশালীই করা হয়। মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির এক নেতা বলেন, একদলীয় ভাবধারায় বিশ্বাসী সরকার বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয় ও সংসদের ভিতর ও বাইরে কোথাও কথা বলার সুযোগ নেই। বরং সংসদে গিয়ে গায়ের জোরে সংখ্যাগরিষ্ঠদের উচ্চ শব্দে হাতেগোনা ঐক্যফ্রন্টের সংখ্যালঘুদের দাবি হারিয়ে যাবে। সংসদে গিয়ে কেবল জয়ীরাই ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন। সুতরাং সংসদে যোগদান করাটা দাবি আদায়ের ব্যাপারে রাজনীতির মাঠে তেমন কোনো গুরুত্ব বহন করবে না।
রাজনীতিতে ইউটার্ন নিয়ে সংসদে যাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দূরদর্শীতা নিয়ে প্রশ্ন নেই নেতাকর্মীদের। এ সিদ্ধান্ত তৃণমূলে তার ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত ও আস্থায় চিড় ধরবে বলেও তারা মনে করেন না। কয়েকটি জেলা বিএনপির একাধিক নেতা মনে করেন, সংসদে যোগদানের সিদ্ধান্ত তারেক রহমানের বিপুল জনপ্রিয়তা ও দল চালানোর প্রজ্ঞায় কোনো প্রভাব ফেলবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক শুভাকাঙ্ক্ষি গ্রুপটির যৌথ বিবেচনায় এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তারেক রহমান রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। বরং এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের বিষয়টিই ছিল অদূরদর্শীতা। তবে নির্বাচন পূর্ববর্তী, নির্বাচন কেন্দ্রিক এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়গুলোতে বিএনপির অবস্থান ও নীতিনির্ধারণে তারা অদূরদর্শীতার স্পষ্ট ছাপ দেখছেন। তখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় সিদ্ধান্ত হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই নীতিনির্ধারক ফোরামের ভূমিকা ছিল ব্যর্থতা ভরপুর। তারা বিদেশে অবস্থানরত তারেক রহমানকে কার্যকর সিদ্ধান্তগ্রহণে সঠিক মতামত দিতে পারেননি। দলের একজন প্রবাসী নেতা বলেন, সংসদে যাওয়ার পুরো দায়টি নিয়েছেন তারেক রহমান। কিন্তু বাস্তবে তিনি এজন্য দায়ী নন। দলের নির্বাচিতরা যখন চাপের মুখে শপথ নিতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন তখন তিনি দেখলেন সরকার তাদের সংসদে নেবেই। আর প্রধানমন্ত্রী তখন সারা বিশ্বকে দেখাবেন বিএনপি সংসদে আছে। সেটা ঠেকাতে গিয়ে এই ঝুঁকি নিয়েছেন তারেক রহমান। সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা বুঝতে পেরেছেন দলের প্রতীকে নির্বাচিতরা সরকারি চাপের অজুহাতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে বাধ্য করেছেন। দলীয় মহলে এটা এক ধরণের বিদ্রোহ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

বিএনপি মহাসচিবের শপথ না নেয়ার বিষয়টিকে নানাভাবে দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, মহাসচিব শপথ নিলে ব্যক্তি মহাসচিবের ইমেজ সংকট হতো, বিএনপির অন্য সিনিয়র নেতারা উনাকে মহাসচিব হিসাবে মেনে নিতে চাইতেন না। কয়েকজন জেলা পর্যায়ের নেতা বলেন, মহাসচিব সংসদে যোগ দিলে তৃণমূল নেতাকর্মীরা হতাশায় নিমজ্জিত হতেন। তিনি যোগ না দেয়ায় তার ব্যক্তিগত ভাবমুর্তি নেতাকর্মীদের কাছে অনেকাংশে বেড়ে গেছে। বিএনপির কয়েকজন নেতা মনে করেন, দলীয় সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রিতার কারণেই মহাসচিব শপথ নেননি। রোববার একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ‘শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল’ মন্তব্য করে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। রাজনীতিতে ভুল স্বীকার করা অপরাধ নয়। বরং ভুল স্বীকার না করলে দীর্ঘমেয়াদী খেসারত দিতে হয়। বিএনপির কয়েকজন নেতা মনে করেন, বিএনপির অন্য এমপিদের সাথে মহাসচিব শপথ নিয়ে সংসদে স্পেসটা আরো বাড়তো। মহাসচিব শপথ না নিয়ে নিজেকে দলের চেয়েও ব্যক্তি ইমেজে বড় করে তুলেছেন, এবং দলের বাইরে নিজেকে আপসহীন হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। আবার কারও কারও মতে, মহাসচিব শপথ না নিয়ে তার ইমেজ ও দলের ইমেজ কিছুটা হলেও রক্ষা করেছেন। বিএনপির একজন প্রবীণ নেতা বলেন, বিএনপিকে নিয়ে সরকারের ষড়যন্ত্রমূলক ভিন্ন কোন উদ্দেশ্য থাকলে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেয়ায় আপাতত সেটা অকার্যকর হয়ে গেছে।

(সূত্র: মানবজমিন)

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!