একাত্তরের ঘটনাপঞ্জী নিয়ে কিছু না বলা কথা

ড. মো. নূরুল আমিন : [দুই]
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ বিরোধী নেতারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনে যেমন সন্দেহ পোষণ করতেন তেমনি আওয়ামী লীগও তাদের লক্ষ্য অর্জনে এসব রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃবৃন্দকে বিশ্বাস করতো না। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ বহির্ভূত দলসমূহের ওপর ভারত সরকারেরও আস্থা ছিল না। এর বহু প্রমাণ বাস্তবেও পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ বহির্ভূত ও তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দও বহু রাজনৈতিক দল ২৫ মার্চের আর্মি ক্র্যাক ডাউনের পর সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতীয় ভূখ- থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মকা-, সংগঠন এবং তাতে অংশগ্রহণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছিল। ভারত সরকার আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ কর্তৃক অনুমোদিত সংগঠন ও ব্যক্তি ছাড়া কাউকেই ভারতীয় ভূখ-ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের লক্ষ্যে তৎপরতা চালানো এবং প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য অনুমতি প্রদান করত না। মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যায় খ্যাতনামা রাজনীতিবিদ সেখানে গিয়ে নজরবন্দি অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন। অলি আহাদ ও তার দল জাতীয় লীগের নেতৃবৃন্দ সেখানে গিয়ে ঠাঁই পাননি। বর্তমানে ঐক্যফ্রন্ট নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না মুক্তিযুদ্ধ করার লক্ষ্যে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও সেখানে গ্রহণযোগ্য হননি। বরং নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন।
মালেক মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি
আমি আগেই বলেছি, ১৯৭১ সালে শুধু অখন্ড পাকিস্তানে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলসমূহের নেতাকর্মীরা নন খোদ আওয়ামী লীগের একটি অংশের নেতাকর্মীদের মধ্যেও স্বাধীনতার ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছিল, বিশেষ করে ভারতের সহযোগিতায়। ১৯৭১ সালে আগস্ট মাসের দিকে তৎকালীন সামরিক সরকার ড. মালেককে গভর্নর করে পূর্ব পাকিস্তানে একটি বেসামরিক সরকার গঠন করে। এই সরকারের নয় সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগ দলের প্রতিনিধিই ছিলেন ৩ জন। এরা হচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক শামসুল হক, ওবায়দুল্লাহ মজুমদার এমএনএ এবং সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব জসিম উদ্দিন। এ মন্ত্রী সভায় জামায়াত, মুসলিম লীগের দুই গ্রুপ এবং নেজামে ইসলাম পার্টি ও কৃষক শ্রমিক পার্টিরও প্রতিনিধি ছিলেন। এ মন্ত্রিসভায় যোগদান করা ছাড়াও আওয়ামী লীগে বেশকিছুসংখ্যক এমএনএ এবং এমপিএ স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে ছাড়পত্র নেয়ার জন্যও চেষ্টাতদবিরে লিপ্ত ছিলেন বলে তখন শোনা গেছে এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য সচিব জেনারেল রোয়েদাদ খান ইসলামাবাদে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। এই সম্মেলনে আওয়ামী লীগ দলীয় ৮৮ জন এমএনএ কে ছাড়পত্র প্রদান করা হয়। ছাড়পত্রপ্রাপ্ত এই আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জনাব সালাহউদ্দিন ইউসুফ, জনাব একে ফয়জুল হক, জনাব শওকত আলী, জনাব আসাদুজ্জামান খান, জনাব কফিল উদ্দিন চৌধুরী, জনাব ওবায়দুল্লাহ মজুমদার, জনাব আবদুল মালেক উকিল, জনাব মোহাম্মদ খালেদ এবং প্রভাবশালী আরও কেউ কেউ।
রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটি
রাজাকার বাহিনী গঠনের ব্যাপারে বিভিন্ন মহলে বেশ কিছু বিভ্রান্তি রয়েছে বলে আমি মনে করি। কোন কোন মহল থেকে রাজাকার বাহিনী গঠন, তার পরিচালনা এবং এ বাহিনীর অপকর্মের সমস্ত দায়দায়িত্ব জামায়াতে ইসলামী এবং এই দলটির তকালীন আমীর অধ্যাপক গোলাম আযমের ওপর চাপানোর চেষ্টা হয়। আমার জানা মতে এবং এটি আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, এ বাহিনী গঠনের সাথে অধ্যাপক গোলাম আযম কিংবা জামায়াতে ইসলামী অথবা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা ছিল না। আমার স্পষ্ট মনে আছে এ বাহিনীটি তৎকালীন সামরিক সরকারের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল এবং এ তথ্য তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই তথ্য অনুযায়ী তৎকালীন নেত্রকোনা মহকুমার পূর্বধলা থানায় মে মাসের শেষের দিকে ময়মনসিংহ এলাকার সামরিক প্রশাসক লে. কর্ণেল মো: সারোয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি সভায় সর্বপ্রথম রাজাকার নামে একটি স্বেচ্ছা সেবক বাহিনী গঠনের প্রস্তাব উঠেছিল। এই প্রস্তাবটি লে. কর্নেল সারোয়ারই উত্থাপন করেছিলেন। প্রস্তাবিত রাজাকার বাহিনীর গঠন প্রক্রিয়া এবং দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কেও তিনি এই সভায় বিস্তারিত দিক নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। এ সভাতেই সর্বপ্রথম ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানদের উদ্যোগে প্রতি ইউনিয়নে ৩০ জন রাজাকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের জন্য ঐ মাসেই মহকুমা প্রশাসক সার্কেল অফিসারদের নির্দেশ প্রদান করেন এবং রাজাকার গঠন পূর্বক তাদের তালিকা তার নিকট প্রেরণের নির্দেশও দান করেন, যাতে করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়। এরই কিছুদিন পর জুলাই মাসে প্রাদেশিক ভিত্তিতে সরকারের তরফ থেকে রাজাকার গঠনের বিস্তারিত দিক নির্দেশনাসহ জেলা প্রশাসকদের নিকট পত্র প্রেরণ করা হয়। ১৭ জুলাই ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র (পুলিশ ও আনসার) দফতরের সেকশন- ৩ থেকে জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে লিখিত এবং উপসচিব স্বাক্ষরিত এই পরিপত্রে বলা হয় যে সরকার বেশ কিছুকাল ধরেই প্রশাসনিক প্রয়োজনে ১৯৪৮ সালের আনসার আইন বিলুপ্ত করে তার পরিবর্তে ১৯৭১ সালের রাজাকার অধ্যাদেশ নামক একটি অধ্যাদেশ জারীর বিষয় বিবেচনা করে দেখেছেন এবং শিগগিরই এই অধ্যাদেশ জারী করা হবে। এতে আরো বলা হয় যে বিদ্যমান আনসার বাহিনীর মধ্য থেকে বাছাই করা কর্মকর্তা কর্মীদের দিয়ে রাজাকার বাহিনী পরিচালনা করা হবে। এই পরিপত্র অনুযায়ী সারা দেশে ৩৫,০০০ রাজাকার নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যাপারে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এতে রাজাকার নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং তাদের চাকরির শর্তাবলী সম্পর্কে যে সব দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলঃ
১. নিয়োগযোগ্য রাজাকারদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে। প্রশিক্ষণকালে রাজাকাররা মাথাপিছু দৈনিক ১.৫০ টাকা এবং প্রশিক্ষণ শেষে নিয়োগ প্রাপ্তীর পর দৈনিক ৩.০০ টাকা হারে ভাতা পাবে।
প্রত্যেক রাজাকার জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে দৈনিক এক পাউন্ড (প্রায় আধাসের) চাল/ গম পাবে। তাদের নিয়োগ প্রাথমিকভাবে ৬ মাসের জন্য হবে।
২. শান্তি কমিটি ও ইউনিয়ন কাউন্সিলের সাথে পরামর্শ করে রাজাকার নিয়োগ করতে হবে। তাদের নিয়োগের মূল মানদন্ড হবে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য এবং শারীরিক যোগ্যতা ও সামর্থ্য। জেলার বেসামরিক কর্তৃপক্ষ তাদের অসদাচারণের জন্য দায়ী থাকবেন। অবিলম্বে রাজাকার নিয়োগ শুরু করতে হবে এবং অবশ্যই তা জুলাই, ১৯৭১ এর মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। ৩. জেলা, সাব সেক্টর ও থানা পর্যায়ে রাজাকারদের প্রশিক্ষণ সামরিক আইন কর্তৃপক্ষের উপর ন্যস্ত থাকবে। ৫০টি ব্যাচে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এই প্রশিক্ষণ হবে ১০ দিনের এবং প্রত্যেক প্রশিক্ষণ টীমে আর্মি, মুজাহিদ, ভলানটিয়ার, স্টাফ/পূর্ব পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স এর নন কমিশন অফিসাররা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। বাহিনী পর্যায়ের সাথে সঙ্গতি রেখে টীমের সংখ্যা ও প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের স্থান নির্ধারণ করা হবে। ৪. সামরিক কর্তৃপক্ষের সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে পুলিশের এসপির মাধ্যমে রাজাকার নিয়োগ করা হবে। ৫. প্লাটুন পর্যায় পর্যন্ত রাজাকাররা সহজবোধ্য কমান্ড পদ্ধতি অনুসরণ করবে। প্লাটুন কমান্ডারদের বিশেষভাবে নির্বাচন করতে হবে এবং ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য নিয়ে একটি প্লাটুন গঠিত হবে। ৬. রাজাকাররা তাদের নিজ নিজ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে পুলিশসহ অপরাপর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করবে। প্রয়োজনবোধে বিদ্রোহী এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের কাজে তাদের তলব করা যেতে পারে এবং তারা তাদের নির্ধারিত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশেষ করে পুল, কালভার্ট এবং বিদ্যুতের লাইন পাহারা দেবে। তথ্য সংগ্রহের কাজেও তারা নিয়োজিত থাকবে। ৭. কর্তব্যরত অবস্থায় রাজাকারদের সাথে অস্ত্র থাকবে। কর্তব্যশেষে নিম্নোক্ত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে তাদের অস্ত্র জমা দিতে হবে। অগ্রাধিকার- ১ ঃ নিকটবর্তী আর্মি/….পোস্ট অগ্রাধিকার- ২ ঃ নিকটবর্তী থানা অগ্রাধিকার- ৩ ঃ রাজাকারদের যথাযথ পাহারায় ইউনিয়ন পরিষদ অফিস।
৮. অস্ত্রশস্ত্রের নিরাপদ হেফাজতের সর্বাঙ্গীন দায়িত্ব জেলার পুলিশ সুপারের উপর ন্যস্ত থাকবে।
৯. রাজাকারদের চেনার সুবিধার্থে রাজাকাররা নীল রং এর আর্ম ব্যান্ড পরিধান করবে যার উপর বাংলায় লাল রং এ রাজাকার শব্দ লেখা থাকবে। জুলাই মাসের প্রায় একই সময়ে ঢাকায় খ অঞ্চলের সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দফতর থেকে তিনটি আদেশ জারী করা হয়। এর প্রথমটিতে লাইসেন্স বিহীন আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, বারুদ বা বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা নিষিদ্ধ করা হয় এবং লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র থানা কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সংশ্লিষ্ট এলাকার সামরিক কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতিক্রমে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা আত্মরক্ষার জন্য ভ্রমণকালে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বহন করার অনুমতি দেয়া হয়।
দ্বিতীয় আদেশে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত, সরকারী স্থাপনার উপর হামলাকারী, আদালত গ্রাহ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট পলাতক ব্যক্তিদের গ্রেফতারের ক্ষমতা রাজাকার ও জনসাধারণকে প্রদান করা হয়।
তৃতীয় আদেশে বলা হয় যে, ২ নং আদেশের অধীনে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের পুলিশ অফিসার বা থানার অফিসার ইনচার্জের নিকট আনা হলে থানা কর্তৃপক্ষ অপরাধীর বিরুদ্ধে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
রাজাকার গঠনের উপরোক্ত প্রক্রিয়ার পাশাপশি শান্তি কমিটি গঠনের একটি উদ্যোগও সরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়। ২৫ মার্চ আর্মি ক্র্যাকডাউনের পর সারা দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্বিচারে জনপদে হামলা চালায়। এর ফলে নিরীহ মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটতে থাকে। জনপ্রতিনিধিদের বেশিরভাগই দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ায় এই দুর্দিনে তাদের পাশে থাকা, তাদের সান্ত¦না দেওয়া এবং আর্মি নির্যাতন থেকে তাদের বাঁচানোর জন্য আওয়ামী লীগ দলীয় কোন লোক ছিল না। এ অবস্থায় পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রধান এবং ৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের বিজয়ী সদস্য জনাব নূরুল আমিন, মুসলিম লীগের খাজা খয়ের উদ্দিন, এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম পার্টি, কৃষক শ্রমিক পার্টি, জমিয়তে উলামা ইসলামসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল ও তাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জনসাধারণকে দুরাবস্থা থেকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন, তারা সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে গণহারে নির্যাতনের প্রতিবাদ জানান। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সামরিক বাহিনীর অপারেশন বন্ধ করা, সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যাবার ব্যাপারে সহযোগিতা প্রদান এবং সন্ত্রাস নৈরাজ্য রোধে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণ প্রভৃতি লক্ষ্যকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি শান্তি কমিটি গঠিত হয় এবং এই কমিটির আহহ্বায়কের দায়িত্ব প্রদান করা হয় মুসলিম লীগ নেতা খাজা খয়ের উদ্দিনের উপর। একই দলের অন্যতম নেতা এডভোকেট এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম এই কমিটির কোষাধ্যক্ষ, এডভোকেট নূরুল হক মজুমদার অফিস সম্পাদক এবং পিপলস পার্টির মাওলানা নূরুজ্জামান প্রচার সম্পাদক নির্বাচিত হন। এছাড়াও কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির ২১ সদস্য বিশিষ্ট একট কার্যকরী কমিটিও গঠন করা হয়। এই কমিটিতে অধ্যাপক গোলাম আযম এবং জনাব আব্দুল খালেক ছিলেন জামায়াতের প্রতিনিধি। অন্যান্য যারা ছিলেন তাদের মধ্যে পিডিপির মাহমুদ আলী, কেএসপির আব্দুল জব্বার খদ্দর, নেজামে ইসলাম পার্টির মাওলানা সিদ্দীক আহমদ, মুসলিম লীগের ইউসুফ আলী চৌধুরী, ব্যারিস্টার আফসারুদ্দিন, আতাউল হক খান, লেবার পার্টির আব্দুল মতিন প্রমুখ। পরবর্তীকালে মে মাসের ২য় সপ্তাহে শান্তি কমিটি গঠনের সকল দায়িত্ব তৎকালীন সরকার গ্রহণ করেন এবং মহকুমা প্রশাসকরা সকল থানা ও ইউনিয়ন কাউন্সিলে শান্তি কমিটি গঠনের জন্য সার্কেল অফিসারদের নির্দেশ প্রদান করেন। এ ব্যাপারে মহকুমা প্রশাসকদের তরফ থেকে পরিপত্র জারি করা হয়। সেখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় ছিল যে, কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির সাথে বিভাগ, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠিত শান্তি কমিটিসমূহের গঠনতান্ত্রিক বা সাংগঠনিক কোন সম্পর্ক ছিল না, এটি Hierarchical কোন প্রতিষ্ঠানও ছিল না এবং এই প্রেক্ষিতে অধঃস্তন কমিটির উপর কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আবার কেন্দ্রীয় কমিটি জেলা, থানা বা ইউনিয়নে গঠিত কমিটিগুলোকে নির্দেশ দেয়ার কোন ক্ষমতাও সংরক্ষণ করতেন না।
ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদেরকে আহ্বায়ক করে ইউনিয়ন পর্যায়ে শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছে। ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মধ্যে ঐ সময়ে জামায়াতে ইসলামী সমর্থকের সংখ্যা খুবই কম ছিল। আমার যতদূর মনে পড়ে ইউনিয়ন কাউন্সিলের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৬৫ সালে এবং ঐ সময়ে যারা চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন তাদের ৬০ ভাগ মুসলিম লীগ প্রায় ৩০ ভাগ আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং অবশিষ্টরা অন্যান্য দলের সমর্থক ছিলেন। কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটিতে অধ্যাপক গোলাম আযমের দাপ্তরিক কোন পদবি ছিল না। কোন প্রকার আদেশ নির্দেশ দেয়ারও কোন ক্ষমতা ছিল না। কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটিতে কোন বৈঠকে তাকে এ ধরনের কোন দায়িত্ব বা ক্ষমতা দেয়ার সিদ্ধান্তও তৎকালীন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে বলে আমার জানা নাই।

 

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!