ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা আন্দোলন :মোঃমোশারফ হোসেন

মহান আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি সমূহের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে মানুষ বাকশক্তি সম্পন্ন। যা মহান আল্লাহ তায়ালার একটি গুণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন “আল্লাহ মুসা (আ) এর সাথে অন্তরঙ্গ কথা বললেন” সুরা নিসা আয়াত-১৬৪। মানুষও মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে ভাষার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। যা জাতি,ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেকের মৌলিক মানবাধিকার। কিন্তু ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সরকার এ অধিকার নষ্ট করার হীন উদ্দেশ্যে উর্দুকে (যা কম সংখ্যক জনগণের ভাষা ছিল) রাষ্ট্র ভাষা ঘোষণা করে। এ অবৈধ ঘোষণা এ দেশের মানুষ মেনে না নিয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন করে ভাষা শহীদের ইতিহাস সৃষ্টি কর। ভাষা বিজ্ঞানীদের প্রদত্ত সংজ্ঞার মূল কথা হচ্ছে মানুষ মনের ভাব অপরের নিকট প্রকাশ করার জন্য বাকযন্ত্রের সাহায্যে কথা নামক শব্দ সৃষ্টি করে,হাত বা অঙ্গ ভঙ্গীর মাধ্যমে অথবা যে সংকেত ব্যবহার করে থাকে তাকে ভাষা বলে। ভাষা হচ্ছে মহান আল্লাহ তায়ালার নিদর্শন মূলক সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা বলেন- “আর আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি সমূহের মধ্যে আকাশ সমূহ ও জমিন এবং তোমাদের বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণ ;নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছ,সুরা রুম,আয়াত-২২। ভাষা রাষ্ট্র গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর অনুভূতি একই সরল রেখায় প্রবাহিত হয়। আমাদের বাংলা ভাষা তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এ দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত ঘটনা প্রবাহের একটি মজবুত ভীত হচ্ছে ভাষা আন্দোলন। আল্লাহ বলেন “(তিনি) দয়াময়,(যিনি) কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন;তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।তিনি মানুষকে বর্ণনা করা শিখিয়েছেন” সুরা আর্ রাহমান,আয়াত-১-৪। এখানে আল্লাহ তায়ালা মানুষ সৃষ্টির পাশাপাশি ভৌগোলিক ভিন্নতায় বৈচিত্র্যময় ভাষা সৃষ্টির কথাও স্পষ্ট করেছেন।যার মধ্যে হাজার হাজার ভাষা বিদ্যমান এবং এক ভাষার উপর অন্য ভাষার বাড়তি মর্যাদাও রহিত করা হয়েছে।আল্লাহ তায়ালা বলেন “মাতৃ ভাষা ছাড়া আমি কোন রাসুলই প্রেরন করিনি” সুরা ইব্রাহীম আয়াত-৪। এমনকি আসমানী গ্রন্থ সমূহও একটিমাত্র নির্দিষ্ট ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়নি।এ ক্ষেত্রেও ভাষার বৈচিত্র্যময়তাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে উদার বিবেচনায়।পবিত্র কুরআনের ভাষা ও রাসুল (স) এর মাতৃ ভাষা আরবি হওয়া সত্বেও তিনি হযরত যায়েদ বিন সাবিত (রা) কে ইহুদিদের সেমেটিক তথা হিব্রু ভাষা শিক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে বলেন “যায়েদ,তুমি ইহুদিদের সেমেটিক তথা হিব্রু ভাষা এবং সিরীয় ভাষা শিক্ষা কর।তারা কী লিখে ও বলে আমি তা নিশ্চিত হতে চাই।সাহাবী যায়েদ বলেন- তখন আমি ১৫-১৭ দিনের মধ্যে তাদের ভাষা শিক্ষা করি।এরপর রাসুল (স) ইহুদিদেরকে কিছু লিখতে চাইলে আমি তা লিখে দিতাম এবং ইহুদি-খ্রিস্টানগণ কিছু লিখলে আমি তাঁকে পড়ে শুনাতাম”।বুখারী ৬/২৬৩১ ,ইবনু হাজার,ফাতহুল বারী ১৩/১৮৬-১৮৭।১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর (ভারত-পাকিস্তান) ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান সরকার ভুলেই বসেছিল ভাষা ইসলামে স্বীকৃত মানুষের মৌলিক মানবাধিকার।ইচ্ছে করে ভুলে গিয়েছিল গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র উভয়।মাতৃভাষা সে এক অখন্ড জাতীয় জাগ্রত অনুভূতি।সে অনুভূতির বিরুদ্ধে ১৪৪ ধারা ও অধিকার আদায়ের মিছিলে গুলি এবং প্রায় ৪০ জন উদীয়মান তরুন টগবগে প্রদীপ রক্তের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিল।পৃথিবীর ইতিহাসে ‘একুশের ট্রাজেডি’ নামের এক বিরল করুণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল।যার ফলে পরবর্তীতে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছিল। ইসলামে অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে জোরালোভাবে সমর্থন দেয়া হয়েছে।রাসুল (স) বলেন “যে ব্যক্তি নিজের অধিকার আদায় করতে গিয়ে মারা যায় সে শহীদ” নাসায়ি, আস সুনান ৭/১১৭-১১৭।এ পর্যন্ত ভাষা শহীদদের যাঁদের নাম পাওয়া গেছে তাঁরা সবাই ছিল মুসলমান।ইসলামে শহীদদের প্রতি অনেক করণীয় কর্তব্য আরোপ করেছে।যেমন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, তাঁদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া,তাঁদের জন্য দোয়া করা,এমন কাজ থেকে বিরত থাকা যা তাঁদের মর্যাদা ক্ষুন্ন করে ও আত্মা কষ্ট পায় এবং তাঁদের ওয়ারিশদের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুবিধা দেয়া সম্মান জানানোসহ ইসলাম ধর্মে অনুমোদন করে এমন কাজ সদকায়ে জারিয়া স্বরূপ চালু রাখার ব্যবস্থা করা।অথচ সরকারীভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি ছুটি ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে পালন করা হলেও দু:খজনক বাস্তবতা হচ্ছে ইসলামীভাব ধারার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ দিবসের কোন গুরুত্বই দেয়না।অথচ হাদিসে এসেছে “যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয় সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ” তিরমিযি,৪/৩৩৯। অন্যত্র এসেছে “যদি কেউ তোমদের কোন উপকার করে তবে তাকে প্রতিদান দিবে;আর প্রতিদান দিতে না পারলে তার জন্য দোয়া করবে যেন তোমরা অনুভব কর যে,তোমরা তার প্রতিদান দিয়েছো” আবু দাউদ,আস সুনান ২/১২৮।ইসলামে দুই ঈদ ছাড়া অন্য কোন দিবস পালন করা বৈধ না হলেও শহীদদের জন্য দোয়া করা তো অনুমোদিত। রাষ্ট্রীয়ভাবেও আরো অনেক দায়িত্ব রয়েছে। সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো যে ভাষার জন্য সালাম,বরকত,রফিক,শফিক,জব্বার জীবন দিয়ে গেছেন সে ভাষা বিকৃতের হাত থেকে রক্ষা করা,ভাষাকে সমৃদ্ধ দান করা, বাংলা ভাষার গৌরবময় ইতিহাস জাতির কাছে তুলে ধরা,বিদেশী ভাষার আগ্রাসন থেকে ভাষাকে হেফাযত করা।অথচ এদেশের নাগরিক হয়ে বিদেশী ভাষার প্রতি যে মাত্রাতিরিক্ত ভালবাসা,সিনেমা,নাটকে,প্রচারণায় ভাষার যে বিকৃতি তা সত্যিই হতাশার।দেশের নাগরিক ও ঈমানদার হিসেবে প্রত্যেকের উচিত ভাষা শহীদদের প্রতি নিজ নিজ কর্তব্য পালনের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা জানানো।
মোঃ মোশারফ হোসেন
এম.ফিল গবেষক
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!