রাজনৈতিক স্মৃতি-আলেখ্য: আমার দেখা এরশাদ:সাঈদ তারেক

গত ১৮ই জানুয়ারি যখন তাকে সিএমএইচে দেখতে যাই তার কয়েকদিন আগে থেকেই গুজব চলছিল তার অবস্থা সঙ্গীন। সাক্ষাৎশেষে ফিরে এসে লিখেছিলাম ততটা গুরুতর নয়। তবে বয়সের ভারে ন্যুব্জ নানা অসুখ বিসুখে কাতর এরশাদ যে এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারবেন না সেটা বোঝা যাচ্ছিল বেশ। শেষ পর্যন্ত যমে ডাক্তারে টানাটানি সাঙ্গ হলো। এরশাদ সাহেব পাড়ি জমালেন অনন্তের পথে।
কয়েকদিন ধরে তাকে নিয়ে নানাজনের নানা মত পড়ছি ফেসবুকের পাতায়। ওপেন প্লাটফর্ম, যে কেউ যা কিছু লিখতেই পারেন। পাঠক তা পড়তে বাধ্য নয়। তবে আমি চেষ্টা করেছি প্রায়গুলো পড়তে। যেটা মনে হয়েছে- লিখিয়েদের একটা বড় অংশ এরশাদ সম্পর্কে জানেন না, যতটুকু জানা বাপ-মা’র কাছ থেকে শুনে। যাদের বয়স এরশাদকে জানার এবং এরশাদকাল দেখার, তারা কম লিখেছেন। একটি ক্ষুদ্র অংশ যারা এরশাদের শাষনকালে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ তারা ধুয়ে দিয়েছেন। এসব লেখা কমেন্ট মন্তব্যের ব্যপারে কিছু বলার ইচ্ছা বা অভিরুচী আমার নাই। ভদ্রলোকের সাথে কিছুকাল কাজ করার সুযোগ হয়েছিল, তাকে কাছে থেকে দেখেছি, সে সুবাদে কিছু তথ্য ঘটনা এবং ব্যাখ্যা আমার জানা। মনে হলো সেগুলো শেয়ার করা যায়।
সব বলতে গেলে বা বিস্তারিত বলতে গেলে একটা ঢাউশ পুস্তক হয়ে যাবে। এটা পড়ার ধৈর্য্য অনেকের থাকবে না। তবে যে দুইএকটি বিষয় না বললেই নয়- চেষ্টা করছি উল্লেখ করতে। আমার এ লেখা এরশাদ সাহেবকে ডিফেন্ড বা ডিফেইম করার জন্য নয়, তার মুল্যায়নের দায় অনাগত ইতিহাসের।
দুই দফা তার হয়ে কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। এক: ‘৮৩-‘৮৪ সালে মার্শাল ল’ ওঠানোর ক্ষেত্র তৈরীর লক্ষ্যে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের দায়িত্ব পালন করার সময়। দুই: ‘৯১-‘৯৬ এরশাদ সাহেব যখন জেলে। ‘মার্শাল ল’ ওঠানোর ক্ষেত্র তৈরীর লক্ষ্যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন’ কথাটা অদ্ভুত মনে হবে। হ্যাঁ, এই ইতিহাসটাই কেউ জানেন না। যে দুইএকজন জানতেন তারা কেউ বলেন নাই। ‘৮২এর মার্চে এরশাদ সাহেব যখন সাত্তার সরকার থেকে ক্ষমতা নিয়ে মার্শাল ল’ জারী করেন আমি তখন পুরোদস্তুর সাংবাদিক। একজন লড়াকু ইউনিয়ন নেতা। এই মার্শাল ল’ জারীর ব্যপারটা কয়েক মাস আগে থেকেই আলোচিত হচ্ছিল। সে সময় তৎকালীন সংসদের শেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল শেরে বাংলা নগরের বর্তমান সংসদ ভবনে। ওই ভবনের নির্মান কাজও তখন শেষ হয় নাই। তার মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে সেখানে অধিবেশন আহ্বান করা হয়। মনে আছে প্রথম দিনের অধিবেশনের এক বিরতিতে ক্যান্টিনে চা খাচ্ছিলাম আমরা কয়েকজন সাংবাদিক এবং বিরোধী দলের সদস্য। কে কে ছিলেন অতটা মনে নাই। আমাদের মাঝ থেকে কেউ প্রশ্ন করলেন, তাড়াহুড়ো করে এই অসমাপ্ত ভবনে কেন অধিবেশন ডাকা হলো। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী সেখানে ছিলেন। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেছিলেন, আলামত বুঝতেছেন না! এইটারে যেন মার্শাল ল’ হেড কোয়ার্টার বানাইতে না পারে তাই দখল নিয়া রাখলাম।
হ্যাঁ আলামত তখন সুবিধার ছিল না। পরিস্থিতি দ্রুত বদলে চলছিল। সাত্তার সরকার সামাল দিতে পারছিল না। দেশে অরাজকতা চরমে। মন্ত্রীর বাড়ী থেকে খুনের আসামী গ্রেপ্তার বেআইনী অস্ত্রসহ মন্ত্রী আটক- এ জাতীয় খবরগুলো বেশ প্রচার পাচ্ছিল। একই সাথে সেনাপ্রধান এরশাদের কিছু কথাবার্তা ইঙ্গিত দিচ্ছিল ক্ষমতার পালাবদল ঘটছে। এমনি একটা পরিস্থিতিতে দেশে মার্শাল ল’ জারী হয়। আমাদের কাছে মনে হলোনা যে বন্দুক ঠেকিয়ে সাত্তার সাহেবের কাছ থেকে জোর করে ক্ষমতা নিয়ে নেয়া হয়েছে। যেন তিনি রেডিই ছিলেন। পরদিন এই মার্শাল ল’কে নানাভাবে স্বাগত: জানানো হলো। সম্ভবত: বাংলার বাণী পত্রিকায় প্রথম পৃষ্ঠায় সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল- ‘এক ফোটা রক্ত ঝরেনি একটা গুলী ফোটেনি’ বা এই জাতীয় কোন শিরোনাম দিয়ে। নতুন শাষকরা তাদের শাষনক্ষমতাকে নাম দিলেন ‘জনগনের মার্শাল ল’। এই মার্শাল ল’ যেন বিরোধী দলগুলোকে কিছুটা স্বস্তি এনে দিল।
এর অনেক পরে, সম্ভবত ’৮৩এর শেষের দিকে ঘটনাচক্রে আমি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দপ্তরে ‘মাস কন্টাক্ট সেলে’র সাথে সম্পৃক্ত হই। এই সেলের প্রধান ছিলেন বিগ্রেডিয়ার নাজিরুল আজিজ চিশতি। সচিব- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চরমপত্রখ্যাত এম আর আখতার মুকুল, ছিলেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী কালাম মাহমুদ এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব তাজুল ইসলাম। এর সমন্বয়ক বা কোঅর্ডিনেটর ছিলেন লে: কর্ণেল মুনিরুল ইসলাম (মুন্না)। অল্প কিছুদিনের জন্য কাজ করতে এসেছিলেন সাংবাদিক শামসুদ্দিন আহমেদ (পেয়ারা ভাই)। এই সেলের কাজ ছিল মুলত: বিভিন্ন পত্রপত্রিকার নিউজ কাটিং তৈরী করা, তার ওপর প্রতিবেদন লেখা। মুল্যায়ন। কিছু কিছু সুপারিশ। দেড় বছরের ওপরে হয়ে গেছে, মিডিয়ায় সেন্সরশীপ চলছে। রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ। সরকারের কিছুকিছু সিদ্ধান্তে জনঅসন্তোষ, এ সবের প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দলগুলোও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছিল। সামরিক বিধি ভঙ্গ করে ছোটখাট সভা সমাবেশ শুরু হয়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে এভাবে কতদিন। নির্বাচন কবে হবে।
আমার কাছে মনে হলো নির্বাচন বা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে এদের কোন চিন্তাভাবনাই নাই। মাঝেমাঝে কর্ণেল মুন্নার সাথে এ নিয়ে কথা বলতাম। সে বলতো আরে এত তাড়াতাড়ির কি আছে। ওরা আসলে তো আবার আগের মত হয়ে যাবে। আমরা কিছু কাজে হাত দিয়েছি শেষ করে নেই। একদিন ব্রিগেডিয়ার চিশতির সাথে এ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলি। আমার যুক্তি ছিল- দীর্ঘদিন মার্শাল ল’ থাকলে মানুষ আর্মির ওপর বিরক্ত হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক দলগুলো আর অপেক্ষা করতে রাজী নয়। তারা দ্রুত নির্বাচন চাইছে। নইলে আন্দোলন শুরু করে দেবে। ব্রিগেডিয়ার চিশতি সেদিন উত্তরে যা বলেছিলেন তার সার কথা ছিল, নির্বাচনের পর মাশার্ল ল’ রেটিফিকেশনের দায়িত্ব কে নেবে। তাদের সকল কর্মকান্ড যদি সংসদে সংবিধানসিদ্ধ না করা হয় তাহলে সবাইকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। কে চাইবে ফাঁসির দড়ি গলায় নিতে! রাজনৈতিক দলগুলোকে তো কথা দিতে হবে যে সংবিধান সংশোধন করে তারা আমাদেরকে দায়মুক্তি দেবে। এর আগে মার্শাল ল’ ওঠে কিভাবে!
রেটিফিকেশন বা সংবিধান সংশোধন করে এক্সট্রাকন্সটিটিউশনাল বা সংবিধান বহির্ভুত শাষনকালকে দায়মুক্তি দেয়া আমাদের দেশে একটি প্রচলিত রীতি। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দিয়ে গেছেন। ’৯১এ আওয়ামী লীগ বিএনপি মিলে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের অবৈধ শাষনকালকে সাংবিধানিক বৈধতা দিয়েছেন। ২০০৮এ একইভাবে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকারের কর্মকান্ডকেও বৈধতা দেয়া হয়েছে।
সেদিন আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় নির্বাচন নিয়ে আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কথা বলবো। তবে প্রকাশ্যে নয়, ঘরোয়াভাবে। চিশতি সাহেব এই আলোচনাবৈঠক আয়োজনের দায়িত্ব আমাকে দিলেন। পরদিন থেকে শুরু হয়ে যায় আমার নতুন মিশন। (চলবে)

ওপরের ছবিটি গত ১৮ই জানুয়ারি সিএমএইচে তোলা।

সাংবাদিকতার সুবাদে অনেক রাজনৈতিক নেতার সাথে আমার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে সংসদ অধিবেশন কাভার করতাম বলে সংসদকেন্দ্রিক নেতাদের সাথেই যোগাযোগ ছিল বেশী। সে আমলে সংসদ ছিল আসলে বিরোধীদলের জন্য। সেখানে সরকারি দলের সদস্যদের চাইতে বিরোধীদের গুরুত্ব থাকতো বেশী। আমরাও বিরোধীদের বক্তৃতা বিবৃতিকেই প্রাধান্য দিয়ে রিপোর্ট করতাম। ফলে বিরোধী সদস্যরাও সাংবাদিকদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতেন। ’৭৯এর সংসদে জিয়াউর রহমান অধিক সংখ্যক রাজনৈতিক দলের নেতাদেরকে এমপি করে এনেছিলেন। সম্ভবত: এত বেশী দলের প্রতিনিধিত্ব এই সংসদেই ছিল। সংসদ ছিল যথেষ্ঠ প্রানবন্ত। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ (হা‌সিনা-‌মিজান উভয় গ্রুপ) জাসদ ছাড়াও মুসলিম লীগ কেএসপি একতা পার্টি মোজাফ্ফর ন্যাপ ওয়ার্কার্স পার্টি (বা ইউপিপি) এমনকি গুপ্ত সংগঠন (ততদিনে প্রকাশ্য হয়ে গেছে) সাম্যবাদী দলের মো: তোয়াহাও ছিলেন এ সংসদে। সিপিবি ভাসানী ন্যাপের কেউ ছিলেন কিনা মনে করতে পারছি না। যাহোক, এসব দলের প্রায় সকল এমপি’র সাথেই আমার ভাল সম্পর্ক ছিল। অধিবেশনের বিরতিতে আমরা আড্ডা মারতাম, কারও সাথে বাইরেও দেখা সাক্ষাৎ হতো। কাছের ছিলেন শাহাহান সিরাজ, রাশেদ খান মেনন, এ এস এম সোলায়মান, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আ স ম ফিরোজ, সুধাংশুশেখর হালদার। আওয়ামী লীগের কয়েকজন এমপি’কে কোনদিন ভুলবো না। অতিশয় সজ্জন নিখাদ ভদ্রলোক মাগুড়ার আসাদুজ্জামান, নওগার ইমাজউদ্দিন প্রামানিক এবং নোয়াখালির এবিএম তালেব আলীর সাথে পরিচয় ছিল ’৭৩এর সংসদ থেকেই। ’৭৯এর সংসদে তা গাঢ় হয়। এরা ছিলেন আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ এবং একনিষ্ঠ সেবক। সব চাইতে ভাল সম্পর্ক ছিল সুরঞ্জিত দা’র সাথে। তিনিও কেন যেন আমাকে ছোট ভাইয়ের মতই স্নেহ করতেন। বৌদি ভাল রান্না করতেন। মাঝেমাঝেই বন্ধু মতিউর রহমান চৌধুরী (বর্তমানে দৈনিক মানব জমিনের সম্পাদক) আর আমি প্রেসক্লাব থেকে রিকশায় চেপে এলিফেন্ট রোড উড়োজাহাজ মসজিদের উল্টোদিকে দাদার বাসায় চলে যেতাম। বৌদি সব সময় হাসিমুখে আপ্যায়ন করতেন। আমরা পেটপুরে খেয়ে সারা বিকাল আড্ডা মারতাম।
রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার জন্য নাখালপাড়া এমপি হোস্টেলের একটি কক্ষ ঠিক করা হয়। আমি আগেই বিভিন্ন দলের নেতার সাথে কথা বলতাম। তাদের কাছ থেকে সময় নিয়ে এসে ব্রিগেডিয়ার চিশতিকে জানাতাম। বৈঠকগুলো হতো সন্ধ্যার পর। নেতারা আর্মি অফিসারের সাথে মিটিংয়ে দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন। ফলে তারা চাইতেন না এসব বৈঠকের খবর কেউ জানুক। বৈঠকে চিশতি সাহেবের সাথে একমাত্র আমি উপস্থিত থাকতাম। কোন কোন বৈঠক আমাকে ছাড়া একান্তেও হতো। সুরঞ্জিত দা এলেন। মেনন ভাই নিজে না এসে হায়দার আকবর খান রনো ভাইকে পাঠান। বিএনপি তখন বিরোধী দলে। তাদের সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে নেয়ায় তারা তখন সেনাশাষনের ওপর মহাখাপ্পা। ওদেরকে বৈঠকে ডাকা নিরর্থক বিবেচনায় সে দলের কারও সাথে যোগাযোগ করা হয় নাই। এএসএম সোলায়মান, শাজাহান সিরাজসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতার সাথে বৈঠক হয়। প্রফেসর মোজাফ্ফর আহমেদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনি অসুস্থ থাকায় আসতে পারেন নাই। যা বলার আমাকে বলে দিযেছিলেন। এসব বৈঠকে নেতারা দাবী করেন- অবিলম্বে মার্শাল ল’ তুলে নতুন নির্বাচন দিতে হবে। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর থেকে সকল বিধিনিষেধ তুলে নিতে হবে। ব্রিগেডিয়ার চিশতি রেটিফিকেশনের নিশ্চয়তা চান। নেতাদের কেউ বলেন, সে দায় আমরা নেব কেন। কারও কথা, যেভাবে এসেছেন সেভাবেই যাবেন। কেউ বললেন আমরা রাজনীতি করি, আমরা সব সময় আর্মিরুলের বিরুদ্ধে। আমরা কি করে সেনা শাষনের বৈধতা দিতে পারি। ব্রিগেডিয়ার সাহেব বলেন, যেভাবেই হোক আমরা এসে গেছি, তবে চিরদিন থাকার জন্য নয়। নির্বাচন দেব। আপনারাই দেশ চালাবেন। কিন্তু আমাদের যাবার পথটা তো করে দিতে হবে। নেতাদের এক কথা- মার্শাল ল’ তুলে নির্বাচন দিন। কিন্তু এভাবে মার্শাল ল’ তুলে নেয়া যায় কিনা বা মার্শাল ল’ তুলে নিলে সরকার চালাবে কে, এ প্রশ্নের উত্তর সবাই এ‌ড়ি‌য়ে যান।
বেশ কয়েকদিনব্যাপী আলোচনার সার দাঁড়ালো- রাজনৈতিক দলগুলো রেটিফিকেশনের দায়িত্ব নিতে রাজী নয়। চিশতি সাহেব একদিন বললেন, দেখলা তো, আগেই বলছিলাম এদের সাথে কথা বইলা লাভ নাই। সেটা ঠিক আছে, কিন্তু আমি ভাবছিলাম তাহলে মার্শাল ল’ তোলার উপায়টা কি! মাসকন্টাক্ট সেলে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক আমার কর্ণেল মনির বা মুন্নার সাথে। মুন্না আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচমেট। ও পড়তো সোসিওলজিতে, শেখ কামালের সাথে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মুন্নার সাথে আমার পরিচয় ছিলনা, চেনাজানা হয় এখানে এসে। প্রচুর মেধাবী এবং একজন চৌকষ আর্মি অফিসার। বিস্তর লেখাপড়া। মার্কসবাদ, ডাস ক্যাপিটাল কমিউনিজম সোসিওলিজম পুজিবাদ বিশ্ব ইতিহাস রাস্ট্রবিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞান- হেন কোন বিষয় নাই যা সম্পর্কে মুন্না অনর্গল বলতে পারতো না। ওর জ্ঞানের পরিধি দেখে মাঝেমাঝে আমি অবাক হয়ে যেতাম। একদিন মুন্না বলেছিল, আপনারা তো মনে করেন আর্মি অফিসারদের বুদ্ধি হাটুতে, আমরা যতটুকু স্টাডি করি আপনাদের কলেজ ইউনিভার্সিটিতে তার চা্ইর আনাও হয় না। কথাটা আমি ফেলতে পারি নাই। সে সময় সিএমএলও সচিবালয়ে অনেক আর্মি অফিসারের সাথে আমার আলাপ পরিচয় হয়েছে। বিভিন্ন র‌্যাংকের অফিসারদের সাথে উঠবোস করেছি, তাদের সান্নিধ্যে এসেছি। মনে হয়েছে একএকটা জি‌নিয়াস। সত্যি বলতে কি সে সময় থেকে আমাদের আর্মি অফিসারদের সম্পর্কে আমার ধারনাই পাল্টে যায়।
মুন্না ছিল পুরোপুরি প্রফেশনাল। ব্রিলিয়ান্ট অফিসার বলে তাকে দিয়ে গনপ্রশাষন বা ‘জনগনের শাষন’ বিষয়ে আমলাদের ক্লাশ নেওয়ানো হতো। মুন্না গিয়ে ডিসি এসপিদেরকে বোঝাতেন কি করে প্রশাষনকে গনমুখী করা যায়। আমি সকল বিষয় মুন্নার সাথে শেয়ার করতাম। নেতাদের সাথে বৈঠকের ফলাফল নিয়ে একদিন দু’জন আলোচনায় বসি। আমি বলি, এখন তো দেখছি নিজেদের রেটিফিকেশন নিজেদেরই নিতে হবে। মুন্না গভীর দৃস্টিতে তাকিয়ে থেকে বলেন, কি করবেন? বিএনপি’র মত আর একটা সিএনপি বানাবেন? কি লাভ! সেই তো একই অবস্থা হবে। তাহলে আমরা গাধার মত এত খাটছি কেন? আমাদেরকে কাজ করতে দেন। ওসব পলিটিক্সফিক্স পড়ে দেখা যাবে। আমি বলি কিন্তু দলগুলো তো অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। মুন্নার সাফ জবাব- তাহলে সরকার আছে কি করতে! ইঙ্গিতটা পরিষ্কার।
সে সময় আমার যেটা মনে হচ্ছিল- সরকারি উদ্যোগে কোন রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যপারে এরা তখনও একমত নয়। এরশাদ সাহেব সেনাপ্রধান, সরকার প্রধান। রাজনৈতিক সুযোগ সন্ধানীদের পক্ষ থেকে তার ওপর একটা চাপ ছিল। সামরিক সরকারে একমাত্র সিভিলিয়ান মন্ত্রী বা উপদেষ্টা এ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ছিলেন এলজিআরডি’র দায়িত্বে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি সারা দেশে ১৮ দফা বাস্তবায়ন পরিষদ নামে একটি বেসরকারি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ১৮ দফা ছিল এরশাদ ঘোষিত কর্মসুচী। এই সংগঠনের মাধ্যমে মাহবুবুর রহমান ধারনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন এটিই এরশাদ সাহেবের ভবিষ্যত রাজনৈতিক দল। নানা ধরনের লোক এই সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়েছিল। ওদিকে এরশাদ সাহেব ক্ষমতা নেয়ার কিছুদিনের মধ্যে বিএনপি’র একটি ধান্ধাবাজ গ্রুপ দল ভেঙ্গে ‘হুদা-মতিন বিএনপি’ নামে একটি আলাদা সাইনবোর্ড খুলে বসেছিল। বিএনপি’র অনেক সাবেক এমপি এই দলে যুক্ত হয়েছিল। তাদেরকে ধারনা দেয়া হয়েছিল এটিই হবে এরশাদ সাহেবের নতুন রাজনৈতিক দল। পাশাপাশি ডিজি ডিএফআই ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান এটিএম রফিককে দিয়ে নতুন বাংলা যুব সংহতি নামে একটি যুব সংগঠন দাড় করিয়ে তার পৃষ্ঠপোষকতা করে চলছিলেন। এরাও ধারনা দেয়ার চেষ্টা করছিলেন, এরশাদ রাজনৈতিক দল গঠন করলে তারাই হবে তার মুল শক্তি।
কিন্তু সিএমএলএ সচিবালয়ে এসব নিয়ে কোন আলোচনা বা আগ্রহ ছিল না। মুন্না একদিন বলছিলেন, আমরা কোন দলফল গঠনের চিন্তা করছি না। দ্যাখেন না মাহবুবুর রহমান কি দৌড়ঝাপ করছেন! কোন লাভ নাই। যেসব লোক তিনি জড়ো করেছেন তাদেরকে দিযে যদি আমাদেরকে দল করতে হয় তাহলে বিএনপি কি দোষ করেছিল!

Image may contain: 4 people, people standing and indoorসংযুক্ত ছবিটি ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ আমার এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে তোলা। অনেকদিন পর দেখা হলে এরশাদ সাহেব শুধিয়েছিলেন, কত বছর পর দেখা হলো? হেসে বলেছিলাম, ২০ বছর।’

৮৪এর অগাস্ট সেপ্টেম্বর সময়কালটা সরকারের জন্য নিরুপদ্রুত ছিলনা। প্রায় আড়াই বছর হয়ে গেছে, সরকার নির্বাচন দেয়ার নাম মুখে আনছে না। রাজনীতি ঘরোয়া কর্মকান্ডের মধ্যে সীমিত। দলগুলো ইনডোর বৈঠক আলোচনা সভা শোকসভা মিলাদ মাহফিল বা কুলখানির মত অনুষ্ঠান করার সুযোগ পেতো। মাঠে ময়দানে মিটিং মিছিল নিষিদ্ধ। তারপরও বিচ্ছিন্নভাবে এসব নিষেধাজ্ঞা অমান্য হচ্ছিল। মাঝেমাঝে সরকারি বাহিনীগুলোর সাথে ছাত্রদের সংঘাত সংঘর্ষ হচ্ছিলো। এসব ঘটনায় প্রাণহানিও ঘটতো। সবকিছু মিলিয়ে দলগুলো দ্রুত নির্বাচনের দাবীতে সরব হয়ে চলছিল। রাস্তায় নেমে আসছিল। আমরা গনসংযোগ সেলে এই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করতাম। এম আর আখতার মুকুল ভাই ছিলেন আমাদের সিভিলিয়ান বস। দিলখোলা হা হা হাসির মানুষ। এক সিগারেটের আগুন দিয়ে আর একটা ধরাতেন। যাকে বলে কন্সট্যান্ট স্মোকার। পোল্ডফ্লেকে কড়া টান দিয়ে প্রায়ই বলতেন, এইভাবে তো চলবে না! পলিটিকাল পার্টিগুলা খেপে গেলে খবর আছে। আমরা সেলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন এবং সুপারিশ দাখিল করে চলি। কিন্তু ওপর মহলে তার কোন প্রতিক্রিয়া পাই না। এভাবেই চলছিল দিন। আমি মাঝেমাঝে এ নিয়ে ব্রিগেডিয়ার চিশতি এবং কর্ণেল মুন্নার সাথে আলাপ করতাম। দলগুলোর সাথে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় চিশতি সাহেব রাজনীতির বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখাতেন না। মুন্না ব্যস্ত ছিলেন সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিভিন্ন কর্মশালা এবং ট্রেনিং নিয়ে।
’৮২তে মার্শাল ল’ জারির পর থেকেই সামরিক সরকার বেশ কিছু জনকল্যানধর্মী কর্মসুচী হাতে নিয়ে চলছিল। বৃটিশ প্রবর্তিত শতাব্দীপ্রাচীন প্রশাষনিক কাঠামো- যা কিনা আজ পর্যন্ত ভারত বা পাকিস্তান পরিবর্তন করতে পারে নাই, আর্মি সরকার অধ্যাদেশ জারী করে তা বদলে যুগোপযোগী করে। থানাগুলোকে উন্নীত করে স্বায়ত্বশাষিত প্রশাসনিক সংস্থায় পরিনত করা হয়। পরে এর নামকরন করা হয় উপজেলা। এই উপজেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলে ভৌত অবকাঠামোর ব্যপক উন্নয়ন হয়। উপজেলা কানেক্টিং রোড, নতুন নতুন দালান কোঠা নির্মান গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারন- এসব কর্মকান্ড গ্রামীন জনজীবনে ব্যপক পরিবর্তন আনতে থাকে। স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে দেশীয় শিল্পোদ্যগকে উৎসাহিত করা হয়। দেশীয় শিল্প কারখানার প্রটেকশনে প্রাথমিকভাবে ১১৪টি পণ্যের আমদানী নিষিদ্ধ করা হয়। স্বাস্থ্যনীতির আওতায় অপ্রয়োজনীয় অনেক অষুধ ব্যান্ড করা হয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকেও যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। সম্ভবত: ছাত্রদের আন্দোলনের কারনে সে উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অবশ্য সামরিক সরকারের এসব কর্মকান্ডের কোনটাই প্রশংসিত হয় নাই। তারা স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে দেয়া এবং মার্শাল ল’ তুলে নিয়ে নির্বাচনের এক দফা দাবীতে একট্টা হচ্ছিলো। পলিটিক্যাল সেটেলমেন্টের কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না।
এ সময় আমার মাথায় একটা ছেলেমানুষি খেয়াল চাপে। সিরাজুল আলম খানের ভাবশিষ্য, একসময় সর্বহারা বিপ্লব বা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতাম। দাদা তো জিয়াউর রহমানকে দিয়ে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন, আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে আমরাও কি এদেরকে দিয়ে আরও কিছু কাজ করিয়ে নিতে পারিনা! এরা যে কাজগুলো করছে তা তো সংষ্কারধর্মী। সাধারন মানুষ সমর্থন করছে। তার অর্থ মানুষের জন্য ভাল কিছু করার ইচ্ছা এদের আছে। সামরিক সরকার বলে চিরদিন থাকবে না। এই জনকল্যানমুখী কাজগুলোকে অব্যাহত রেখে এর ধারাবাহিকতায় সমাজ পরিবর্তনে আরও কিছু কাজ এগিয়ে নেয়া যায় না! কয়েকদিন বিষয়টা নিয়ে একাএকাই ভাবি। কারও সাথে শেয়ার করা উচিত, কিন্তু কার সাথে! মুন্না। হ্যাঁ মুন্নার সাথেই এ নিয়ে কথা বলতে হবে।
পরের কয়েকদিন মুন্নার সাথে একান্তে কথা বলার সুযোগ খুঁজতে থাকি। অফিসারটি ছিল খানিকটা অস্তির টাইপের। কথা বলতো উচ্চস্বরে। ততদিনে বুঝে নিয়েছিলাম এর সাথে কথা বলতে মেজাজমর্জি বুঝে নেয়া উচিত। অফিসে নানা কাজে ব্যস্ত, গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে আলোচনার পরিবেশ নাই। ঠিক করি বাসায় গিয়ে কথাটা তুলবো। এ্যপয়েন্টমেন্ট করে এক বিকেলে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসায় যাই। কর্ণেল মুনির বিয়ে করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের বড় মেয়ে সিমিকে। সম্ভবত: প্রেমের বিয়ে। আমি যখন দেখেছি তখন পর্যন্ত উভয়ের বোঝাপড়া চমৎকার। ভাল সম্পর্ক। পরে এই সম্পর্ক টেকে নাই। বিচ্ছেদ হয়ে গেছিল। সেদিন বিকেলে ভাবী আমাকে চা নাশতা দিয়ে আপ্যায়ন করেন। চা খেতে খেতে দেখি মুন্না সাদা হাফপ্যান্ট সাদা গেঞ্জি পড়ে র‌্যাকেট হাতে রেডি। আমি অবাক হয়ে শুধাই কোথায় চললেন? বলে, চলেন একটু স্কোয়াশ কোর্টে যাই। অনেকদিন যাওয়া হয়না। আজ একটু পিটিয়ে আসি। অগত্যা আমি তার সঙ্গী হই। সম্ভবত: স্কোয়াশ ছিল মুন্নার প্রিয় খেলা। সেদিন পুরো বিকেল মুন্না র‌্যাকেট দিয়ে বল পিটিয়ে চলেন। আমি অদুরে বসে মাঝেমাঝে সৌজন্যতামুলক হাততালি দেই। ঘন্টাদুয়েক বল পিটিয়ে যখন থামেন তখন রীতিমত হাফাচ্ছেন। গেঞ্জি-প্যান্ট ঘামে চুপচুপে। ওর ওই অবস্থা দেখে আমার আলোচনা করার ইচ্ছা লোপ পায়। ফিরে আসি বাসায়। মুন্না বাথরুমে ঢোকার আগে আমাকে বসতে বলেন। ভেবে দেখি এই বসা হবে অর্থহীন। আজ আর কোন সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারেনা। বলি, আর বসবো না। কাজ আছে চলে যাই। মুন্না বলেন কি যেন বলবেন বলেছিলেন। বলি, অন্য কোন সময়। আপনি পরিশ্রান্ত রেস্ট নেন।
এভাবে আরও দুইএকদিন যায়। কথা বলার সুযোগই পাইনা। আমি যে ওর সাথে কিছু গুরুত্বপূর্ন বিষয় আলোচনা করতে চাই সেটা সে বেমাুলম ভুলে গেছে। এর মধ্যে কুমিল্লার কোটবাড়ী বার্ডে একটা কর্মশালায় ক্লাশ নেয়ার জন্য মুন্নার ডাক পড়ে। ঠিক করি আমি সাথে যাবো। লম্বা রাস্তা, গাড়ীতে কথা বলা যাবে। মুন্নাকে বললে সে রাজী হয়। সে আমলে ঢাকা-কুমিল্লা রাস্তা প্রায় ফাঁকা। তবে সড়ু এবং মাঝেমাঝে ভাঙ্গা এবড়োথেবড়ো। ঘন্টা দু’য়েকে চলে আসি বার্ডে। কিন্তু গাড়ীতে কথা তোলার ফুরসুত পাইনা। বার্ডে গিয়ে আরও ঘন্টা দুয়েক মুন্নার বক্তৃতা শুনি। বাঘা বাঘা সব সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারি। সারবেধে বসে আছেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুন্না ইংরেজী বাংলায় বক্তৃতা করে চলেছেন। উপস্থিত সবাই যেন অনুগত ছাত্রের মত গোগ্রাসে তাই গিলছেন। মুন্না ঝানু মাস্টারের মত মাঝেমাঝে ব্লাকবোর্ডে চক ডাস্টারও এস্তেমাল করছেন। এই দীর্ঘ ক্লাশ শেষে চা নাশতা খেয়ে আমরা ফিরতি পাড়ীতে উঠি। ফেরার পথে এডামেন্ট হই কথাটা তুলবোই।
প্রথমেই বক্তৃতা কেমন হলো। মুন্না সব সময়ই ভাল ক্লাশ নিতো। বক্তৃতায় প্রচুর রেফারেন্স কোটেশন থাকতো, আবেগ থাকতো এ্যাপীল থাকতো। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন। আমিও ছিলাম তার বক্তৃতার একজন গুনমুগ্ধ শ্রোতা। ভাল বক্তৃতা করায় সেদিন মুন্নার মনমেজাজ ছিল ফুরফুরে। আমি সড়াসড়িই কথাটা তুলি। শুরুতে দেশের পরিস্থিতি, এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থা ও অবস্থান, পরিশেষে আমাদের কি করনীয়। মুন্না আমার কাছেই জানতে চান কি করা যেতে পারে। আমি ততদিনে এদের পাল্স কিছুটা ধরে ফেলেছি। আমার মত করে নানা ব্যাখ্যা দিয়ে বলি, মার্শাল ল’ চিরদিন থাকবে না। কিন্তু যে সংষ্কার কাজগুলো আপনারা করছেন তা জনকল্যানধর্মী। কোন রাজনৈতিক দল করলে তা হতো সামাজিক বিপ্লব। এমন বিপ্লবই আমাদের দরকার। কেননয় এই বিপ্লব আমরা ধরে রাখি!
মুন্না ইঙ্গিতটা বোঝেন। শুধান কাকে দিয়ে ধরে রাখবেন। মানুষ কই? সৎ আদর্শবান দুর্নীতিমুক্ত ত্যাগী নেতা কর্মী লাগবে। টাউট বাটপারদের দিয়ে আপনি বিপ্লব করবেন? আমরা পার্টি করার উদ্যোগ নিলেই দুনিয়ার যত বাজে মাল জুটে যাবে! আমি বলি, সারা দেশে এখনও ভাল মানুষ আছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন স্বপ্নপুরন না হওয়ায় হতাশ হয়ে বসে আছেন। আমরা এদেরকে খুজে বের করবো। নতুন নেতা কর্মী তৈরী করবো। এসব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা। এক পর্যায়ে মুন্নাকে বেশ সিরিয়াসই মনে হয়। ইতিমধ্যে আমরা দাউদকান্দি ফেরিঘাটের কাছাকাছি এসে যাই। তখনও মেঘনায় সেতু হয় নাই। দুই দফা ফেরিতে গাড়ী পার করতে হতো। ঘাটে পৌছার আগেই গাড়ীর একটা চাকা পাংচার হয়ে যায়। ড্রাইভার সেটা ঠিক করাতে নিয়ে গেলে আমরা গাড়ী থেকে নেমে দাঁড়াই। পাশের টংঘর থেকে চা নিয়ে খেতে খেতে আমাদের কথা চলে। চা পান শেষে দু’জন সিগারেট ধরাই। মুন্না সিগারেট খেতেন না, তবে টেনশনে থাকলে মাঝেমাঝে দুইএক টান দিতেন। শেষ পর্যন্ত এসে মুন্না আমার সাথে একমত হন। আমরা একটি দল গঠন করবো। টাউট বাটপারমুক্ত ত্যাগী সৎ আদর্শবান নেতা কর্মীদেরকে নিয়ে একটি সত্যিকার জাতীয়তাবাদী দল। দু’জন হাত মেলাই। আমার জন্য মুহুর্তটা তখন খুবই রোমাঞ্চকর! কারন মুন্না রাজী হওয়া মানে কাজ অর্দ্ধেক হয়ে যাওয়া। সে উদ্যোগ নিলে হাই কমান্ড রাজী হতে পারে। মনে হলো দাউদকান্দি ফেরিঘাটে নয় যেন ইতিহাসের একটা টার্নিং পয়েন্টে আমরা দাঁড়িয়ে। হাতঘড়িটা টংঘরের আলোর দিকে বাড়িয়ে দেখি সময় সন্ধ্যা সাড়ে আটটা। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেই এই মুহুর্তটা কোনদিন ভুলবো না। জীবদ্দশায় কখনও তা লিখবো।

পরদিন অফিসে এসে কাজ শুরু করে দেই। কাজ শুরু মানে প্রথমেই মুকুল ভাইয়ের সাথে মত বিনিময়। তিনি এ উদ্যোগকে খুব একটা সুদৃস্টিতে দেখলেন বলে মনে হলো না। সম্ভবত: তার সুপ্ত ইচ্ছা ছিল আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতায় এসে নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের কাছে ক্ষমতা দিয়ে দেয়া। অবশ্য তিনি এটা কখনও প্রকাশ করেননি। ভাবে ভঙ্গিতে বুঝিয়েছেন। বিষয়টা নিয়ে ব্রিগেডিয়ার চিশতির সাথে খোলামেলা আলোচনা করি। তিনি সোজাসাপ্টা বলে দেন দেখ আমি রাজনীতি বুঝিনা, এ ব্যপারে আমার কিছুই বলার নাই। কর্ণেল মুনিরের প্রটোকল সমস্যা ছিল। আমাদের মত হুটহাট সিনিয়রদের রুমে ঢুকে কাজের বাইরে কথা বলতে পারতো না। ফলে কয়েকদিন ব্যপারটা ওই পর্যন্তই ঝুলে রইলো।
’৮৪এর অক্টোবর মাসের ৩০ কি ৩১ তারিখে রাজনৈতিক দলগুলো সারা দেশে হরতাল ডাকে। মার্শাল ল’র মধ্যে সম্ভবত: প্রথম এবং সর্বাত্মক সফল হরতাল। এই হরতালে নানা জায়গায় পুলিশের সাথে পিকেটারদের সংঘর্ষ হয়। ঢাকার জিরো পয়েন্টসংলগ্ন সচিবালয়ের দেয়ালের কিছু অংশ তারা ভেঙ্গে ফেলে। এই ঘটনা সরকারে বেশ রিপারকেশন সৃস্টি করে। সচিবালয়ের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলা- ঘটনাটাকে ছোট করে দেখার অবকাশ ছিল না। আমি নিজেও ভীষন ক্ষুব্ধ হই। ক্ষোভ থেকে ফোন করি কাছের মানুষ সুরঞ্জিত দা’কে। শুধাই, দাদা এগুলা কি শুরু করছেন? তিনি আমার চেয়ে দ্বিগুন ক্ষুব্ধকন্ঠে বলেন, তোমরা কি শুরু করছো? আমাদের বিরুদ্ধে আর্মি পুলিশ লেলাইয়া দিয়া দেশে কি একটা গৃহযুদ্ধ বাধাইতে চাও? আমি বলি, আপনারা যদি ভায়োলেন্সের পথ বেছে নেন সে ক্ষেত্রে ওরা কি করবে! দাদা বলেন, কি করবে এইটাও বইলা দিতে হবে! রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়া মোকাবিলা করতে হয়। আমি বলি, তাহলে তো আমাদেরকে একটা পার্টি বানাতে হবে। তো বানাও না ক্যান? আমি বলি, তাহলে কিন্তু দাদা আমরা পার্টি বানায় ফেললাম। সুরঞ্জিত দা’ বলেন, দল নিয়া মাঠে নামো তারপর দেখা যাইবো কাদের শক্তি বেশী! দাদার সাথে এই কথোপকথন আমি চিশতি সাহেবকে জানাই।
এই হরতালের সময় এরশাদ সাহেব দেশে ছিলেন না। চার কি পাঁচদিনের জন্য শ্রীলংকা সফরে ছিলেন। ২ কি ৩ তারিখ তিনি ফেরেন। পরদিন আমি অফিসে গেছি, দেখি সারা অফিসে সুনসান নীরবতা। রুমে রুমে অফিসাররা বিমর্ষবদনে মৃয়মান। অন্যান্ন দিনের তুলনায় গেস্ট বা ভিজিটর কম। কর্ণেল মুনিরের রুমে গিয়ে জানতে পাই সকালে চীফ অফিসে এসে সবাইকে ঝেড়েছেন। মার্শাল ল’র মধ্যে এত বড় হরতাল হলো কি করে! তিনি খুব ক্ষিপ্ত। সবাই ঝাড়ি খেয়ে যার যার রুমে বসে আছেন। কেউ চীফের সামনে পড়তে চাইছেন না। এ সময় আমার কি হলো- চিশতি সাহেবের রুমে গিয়ে সড়াসড়ি বলি, স্যার আমি চীফের সাথে দেখা করতে চাই। এরশাদ সাহেব তখন সেনাবাহিনী প্রধান মানে আর্মি চীফ। অফিসাররা তাকে চীফ বলতেন। আমরাও তাকে চীফ বলেই ডাকতাম। আমার কথা শুনে চিশতি সাহেব কিছুটা অবাক হন। বলেন, দেখা কইরা কি বলবা? বলি, পুরো সিচুয়েশনটা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবো। কেন আজ এই পরিস্থিতির সৃস্টি এবং কিভাবে তা মোকাবিলা করা যায় এসব বিষয়ে আমার অপিনিয়ন তুলে ধরবো। চিশতি সাহেব কিছু ভাবেন, তারপর ইন্টারকম তুলে চীফের পিএস কর্ণেল শরীফকে ফোন করেন। বলেন, শরীফ চীফ কি করেন? শরীফ জানান তিনি রুমেই আছেন। চিশতি সাহেব বলেন, আমাদের তারেক চীফের সাথে দেখা করতে চায়, কি নাকি বলবে, দেখ তো ব্যবস্থা করা যায় কিনা। শরীফ দেখছি বলে ফোন রাখেন। একটু পর কলব্যাক করে বলেন, স্যার ২টার সময় যেতে বলেছেন। লাঞ্চে বাসায় যাবেন। তার আগে মিনিট দশেক আমি কথা বলতে পারবো। এ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়ে গেল। চিশতি সাহেব বলেন, দেখ বুঝাইয়া ঠান্ডা করতে পার কিনা।
সরকারপ্রধান সেনাপ্রধানের সাথে একান্ত মিটিং, তাও জীবনে প্রথমবারের মত, মনে হলোনা আমি খুব একটা উত্তেজিত আছি। মুকুল ভাই এবং মুন্নার সাথে বসে আলোচনার পয়েন্টগুলো ঠিক করে নেই। একবার ভাবি মুন্নাকেও সঙ্গে নিয়ে নেব কিনা। না সেটা ঠিক হবে না। তাছাড়া মুন্নার প্রটোকল সমস্যা আছে। না ডাকলে সুপিরিয়রের কাছে এরা যেতে পারেনা। চীফ সময় দিয়েছেন আমাকে, মুন্নাকে নয়। বেলা ঠিক দুইটায় পিএস কর্ণেল শরীফের রুমে গিয়ে হাজির হই। একটু বসতে বলে তিনি চীফের রুমে যান। ফিরে এসে আমাকে নিয়ে যান সেখানে। এই রুমে আমি আগেও বেশ কয়েকবার এসেছি। তবে তখন ভবনটা মার্শাল ল’ হেড কোয়ার্টার ছিল না, ছিল সংসদ ভবন। এখানে বসতেন বিএনপি আমলের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান। সিএমএলএ’র অফিসকক্ষ হওয়ায় রুমটির বেশ সংষ্কার করা হয়েছিল। বেশ সাজানো গোছানো। রুমে ঢুকেই ব্যবহারকারির রুচীর পরিচয় পাওয়া যায়। কর্ণেল শরীফ আমাকে রুমে দিয়ে চলে যান। এরশাদ সাহেব তখন দাঁড়িয়ে গেছেন। বেরুবেন। ব্যস্ততার সাথে বলেন, হ্যাঁ বলো কি বলতে চাও। আমাকে এখুনি বাসায় যেতে হবে। আমি একটু থমকে যাই। বলি, স্যার দাড়িয়ে দাঁড়িয়েই বলবো! ভদ্রলোক মানুষ। বলেন, ও হ্যাঁ বসো। বলে নিজেও বসেন। বলেন, খুব তাড়াতাড়ি বলো। আমি ধীরে ধীরে শুরু করি। দেশের পরিস্থিতি, নেতাদের সাথে আমাদের আলোচনার ফলাফল, রাজনৈতিক দলগুলোর দাবী- আন্দোলন। পয়েন্ট বাই পয়েন্ট। এরশাদ সাহেব শান্ত হতে থাকেন। এক পর্যায়ে বেশ মনোযোগ সহকারে শুনতে থাকেন আমার কথা। মাঝেমাঝে প্রশ্ন করেন। আমি উত্তর দেই। সময় গড়িয়ে চলে। তার ওঠার লক্ষণ নাই। এর মাঝে বাসা থেকে ফোন আসে। তিনি বলে দেন, ইম্পর্ট্যান্ট মিটিংয়ে আছি। শেষ করে আসছি। আধা ঘন্টার ওপরে আমি একনাগড়ে বলি। সব শুনে তিনি বলেন, এখন বলো তো এ পরিস্থিতিতে আমাদের কি করা উচিত। আমি সড়াসড়ি বলি, পলিটিক্যাল পার্টি গঠন। নেতাদের সাথে কথা বলে বোঝা গেছে তারা কেউ মার্শাল ল’ রেটিফিকেশনের দায়িত্ব নেবে না। আর রেটিফিকেশন ছাড়া মার্শাল ল’ তোলাও যাবে না। এ অবস্থায় মার্শাল ল’ তোলা এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলার জন্য দল গঠনই একমাত্র পথ। সামান্যক্ষণ চুপ থেকে তিনি বলেন, ঠিক বলেছো। যত দ্রুত সম্ভব আমাদেরকে একটা পার্টি গঠন করতে হবে। তারপর তাদেরকে মাঠে নামাতে হবে।
এত সহজে যে তিনি রাজী হয়ে যাবেন ভাবতে পারি নাই। আমার ঘোর না কাটতেই বলে চলেন, এক কাজ কর- হুদা মতিনরা তো আমার দল করবে বলে দশ মাস ধরে বসে আছে। মাসে বিশ হাজার করে ওদের অফিস খরচাটাও আমার কাছ থেকে নিচ্ছে। ওদেরকে নিয়ে কালই পার্টি ডিক্লেয়ার করে দাও! আমি খানিকটা দম নেই। বলি, শুধু ওদেরকে নিয়ে পার্টি করলে তো স্যার ওটা পলিটিক্যাল পার্টি হবে না। ওরা বসে আছে হালুয়া রুটীর আশায়। এটা একটা হালুয়া রুটীর পার্টি হয়ে যাবে। আমাদেরকে একটা ডিফরেন্ট টাইপের পলিটিক্যাল পার্টি গঠন করতে হবে। আদর্শভিত্তিক। সৎ এবং পোড়খাওয়া ত্যাগী নেতাকর্মীদেরকে নিয়ে। যারা আপনার রিফর্মসগুলোকে ধরে রাখবে, এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাই যদি না করি তাহলে বিএনপি’র সাথে আমাদের পার্থক্য থাকবে কি! এরশাদ সাহেব বলেন, সেটাও তো ঠিক। আমরা তো টাউট বাটপারদেরকে নিয়ে হালুয়া রুটীর পার্টি বানাতে পারি না। কিন্তু সেইরকম ত্যাগী সৎ আদর্শবান নেতা কর্মী পাবে কোথায়? বলি, আমাদেরকে সময় দেন, সারা দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এমন হাজার হাজার আদর্শবান ত্যাগী নেতা কর্মী ছড়িয়ে আছে, অনেকে হতাশায় ভুগছে। এদেরকে খুজে বের করে সামনে আনতে হবে। নেতৃত্বে বসাতে হবে। তাছাড়া শুধু কর্মী সমর্থক আনলেই হবে না, জাতীয় নেতার ইমেজ আছে রাজনীতিতে অবদান আছে এমন কিছু নেতাও লাগবে, দলের ভাবমুর্তি বাড়ানোর জন্য। হুদা মতিনরা তো সেই মাপের জাতীয় নেতা নন। শুধু এদেরকে নিয়ে দল বানালে তো লোকে এটাকে আর একটা বিএনপি বলবে। এরশাদ সাহেব এই পয়েন্টেও একমত হন। তারপর জানতে চান দলে তার কি পজিশন হবে। বলি, এটা তো পলিটিক্যাল পার্টি, এখানে আপনার পজিশন থাকবে কি করে! তিনি অবাক হয়ে বলেন, বলো কি! আমার দল তাতে আমিই থাকবো না? আমি বুঝিয়ে বলি, আপনি তো এখন আর্মি চীফ। আর্মি চীফ কি কোন পলিটিক্যাল পার্টির নেতা হতে পারেন! তা হতে হলে আপনাকে চীফের পদ থেকে রিজাইন করতে হবে। আপনি কি এখন তা করতে পারবেন! তিনি প্রবলবেগে মাথা নেড়ে বলেন না না কক্ষনই না। আমি যোগ করি, তাছাড়া আগে আপনাকে পলিটিক্স বুঝতে হবে। পার্টি চালানো জানতে হবে। এ কথায় তিনি আমার দিকে হা হয়ে তাকান। বলেন, বলো কি তুমি! আমি একটা সরকার চালাচ্ছি দেশ চালাচ্ছি আর্মি চালাচ্ছি আর পলিটিক্স বুঝি না! আমি বলি সামরিক সরকার চালানো আর পলিটিক্যাল পার্টি চালানো এক কথা নয় স্যার। কোন পলিটিক্যাল নেতাকে আর্মি চালাতে দিলে সে যেমন পারবেনা তেমনি কোন জেনারেলকেও পার্টি চালাতে দিলে পারবেনা- যতক্ষণ না সে পলিটিক্স এবং পার্টি বোঝে।এরশাদ সাহেব কিছু বলেন না। শুধান, তাহলে এখন পার্টির চেয়ারম্যান কে হবে? আমি বলি, আমরা যে পার্টি গঠন করতে চাই তার নেতৃত্ব তৃণমুল থেকে গড়ে উঠবে। সারা দেশে কাউন্সিলের মাধ্যমে স্থানীয় কমিটিগুলো গঠন করা হবে। এরাই ন্যাশনাল কাউন্সিল করে কেন্দ্রিয় নেতৃত্ব বা চেয়ারম্যান সেক্রেটারি নির্বাচিত করবে। এখন একটা কনভেনিং কমিটি থাকবে। চীফ আমার এ আইডিয়াটাও পছন্দ করেন। বলেন, ঠিক বলেছো, এটাকে একটা গনমুখী দল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে কনভেনর কে হবে? সে উত্তরও মাথায় ছিল। বলি, প্রেসিডেন্ট সাহেব। জিয়াউর রহমান সাহেব যেমন তার উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে দিয়ে দল গঠন করিয়েছিলেন আমরাও আমাদের প্রেসিডেন্টকে কনভেনর করে দল ঘোষণা করবো। দল গোছানো হয়ে গেলে, এর মধ্যে আপনি আর্মি থেকে রিজাইন দিলে, এসে পার্টির চেয়ারম্যান হবেন।
এরশাদ সাহেব লাল টেলিফোন তুলে কাউকে বলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেবকে দাও। একটু পর ওপাশ থেকে কন্ঠ ভেসে এলে বলেন, আমি এরশাদ বলছি। প্রেসিডেন্ট সাহেব, আমরা একটা পলিটিক্যাল পার্টি গঠন করতে যাচ্ছি। আপনি হবেন এর কনভেনর। আমাদের মাস কন্টাক্ট সেলের তারেক এটা অর্গানাইজ করছে। ও আপনার সাথে দেখা করে সব বুঝিয়ে বলবে। দেশের প্রেসিডেন্ট তখন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আহসান উদ্দিন চৌধুরী। একটু বেশীই বয়স। আলাভোলা টাইপের। বঙ্গভবনে ডাক্তাররা তাকে পাউরুটি খেতে দিতো না বলে নাকি তিনি কাঁদতেন। যাহোক, আমাদের দলের কনভেনর হয়ে গেল। এর মধ্যে এরশাদ সাহেবের বাসা থেকে আরও একদফা ফোন আসে। বলে দেন, মিটিং শেষ হয় নাই। আমাকে বলেন, তাহলে কাজ শুরু করে দাও। আমি বলি, স্যার আপনাদের উদ্যোগে দলটা গঠিত হচ্ছে, তাছাড়া এতবড় একটা দায়িত্ব, এটা একজন সিনিয়র আর্মি অফিসারের নামে হোক। আসলে আমি চাইছিলাম এই প্রক্রিয়ায় ব্রিগেডিয়ার চিশতিকে সম্পৃক্ত করতে। এরশাদ সাহেব বলেন, আর্মি অফিসার এখানে কি করবে? আমি বলি, ধরেন অনেক বড় মাপের বা জাতীয় নেতাকে অফার করতে হবে। আমি বললে তারা অতটা গুরুত্ব নাও দিতে পারে। কিন্তু একজন জেনারেল বা ব্রিগেডিয়ার যদি প্রস্তাব দেয় তাহলে ফেলতে পারবে না। তাছাড়া এই মেসেজ তো দিতে হবে এটা আপনাদের পৃষ্ঠপোষকতায় হচ্ছে। আমি দল বানাচ্ছি- এর কি কোন গুরুত্ব থাকবে! কিছুটা ভেবে তিনি বলেন, বেশ, কাকে তুমি চাও? বলি, স্যার ব্রিগেডিয়ার চিশতি হলে ভাল হয়। এতদিন তার সাথে কাজ করছি। আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভাল। কাজ করতে সুবিধা হবে। তাছাড়া কর্ণেল মুনির আছে এমআর আকতার মুকুল ভাই আছেন, পুরো মাসকন্ট্যাক্ট সেল আছে, সবাই মিলেই কাজটা তুলে আনবো।
এরশাদ সাহেব ইন্টারকম তুলে চিশতি সাহেবকে আসতে বলেন। কয়েক মিনিটেই স্যার এসে হাজির হন। চীফ বলেন, শোন চিশতি, এই ছেলে তো আমার চোখ খুলে দিয়েছে। এতদিন তোমরা আমাকে বলো নাই কেন! অনেক দেরী হয়ে গেছে, আমাদেরকে ইম্মেডিয়েটলি পার্টি ফর্ম করতে হবে। চিশতি সাহেব মুষ্ঠিবদ্ধ হাত এ্যাটেনশন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে স্যার স্যার বলতে থাকেন। তারেককে দায়িত্ব দিয়েছি, তুমি এই মিশনের লীড দেবে। চিশতি স্যার কাতর কন্ঠে বলেন, আবার আমাকে স্যার কেন এর মধ্যে ঢোকাতে চান। আমি পলিটিক্সের কি বুঝি! আমি বলি স্যার আপনাকে কিছু করতে হবেনা। যা করার আমরাই করবো, আপনি শুধু কিছু মিটিং কনফারেন্সে এ্যাটেন্ড করবেন। পুরো কর্মকান্ডের খোজখবর রাখবেন। সবাই জানবে আপনিই এটা অর্গানাইজ করছেন। তারপরও চিশতি সাহেব ইযে ইয়ে করতে থাকেন। চীফের অর্ডার জারী হওয়ায় অগত্যা মেনে নিতে বাধ্য হন।
এরশাদ সাহেব বলেন, তোমাদের কি কি লাগবে আমাকে বলবে। আমাকে না পেলে- এতটুকু বলে ফোন তোলেন। ওপাশ থেকে কথা এলে বলেন, শোন মাহমুদ, আমরা ইম্মেডিয়েটলি একটা পলিটিক্যাল পার্টি ফর্ম করতে যাচ্ছি। তারেককে দায়িত্ব দিয়েছি। ওর যখন যা দরকার হবে প্রভাইড করবে। ফোন রেখে আবার অন্য নম্বরে ডায়াল করেন। একই কথা তিনি আর একজনকে বলেন। তারপর আমাকে বলেন, ডিজিডিএফআই ডিজি এনএসআইকে বলে দিলাম। তোমার যখন যা হেল্প লাগবে এদেরকে বলবে। এরপর তিনি শুধান সময় কতদিন লাগবে। আমি বলি, জাতীয়ভিত্তিক একটা পার্টি, অনেক বড় আয়োজন। অনেক লোকের সাথে কথা বলতে হবে। ম্যানেজ করতে হবে। অন্তত: মাসতিনেক তো লাগবেই স্যার। তিন মাস? নাা না ইটস্ টু লং টাইম! অত সময় দেয়া যাবে না। বড়জোর একমাস সময় তোমরা পেতে পার। এর মধ্যে পার্টি ডিক্লেয়ার করতে হবে। এক মাস! আমি আর ব্রিগেডিয়ার চিশতি মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। এরশাদ সাহেব বলেন, হ্যাঁ এমনিই অনেক দেরী হয়ে গেছে। কাজটা অনেক আগেই করা উচিত ছিল। যাও এখন থেকেই লেগে পড়। আমরা দু’জন সালাম জানিয়ে চলে আসি। চীফও ওঠেন। সময় তখন বিকাল চারটার মত।

Image may contain: 1 person

 

লবিতে চিশতি স্যারের সাথে কোন কথা হয়না। রুমে এসে প্রথমেই একটা ঝাড়ি! দিলা তো মিয়া আমারে ফাসাইয়া! আমি পলিটিক্সের কি বুঝি! না কোন নেতা নেত্রীরে চিনি! আমি তাকে শান্ত করতে থাকি। তিনি বলেন যা করার কর, দেইখো আমি যেন কোন বিপদে না পড়ি। মুন্না আসে। ধীরে ধীরে খবর হয়ে চলে আমরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি।
জুলফিকর আলী ভুট্টো। সাবেক ছাত্রনেতা। মিজান আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ছিলেন। ডাকসুতে একবার ভিপি পদে নির্বাচনও করেছিলেন। এই ভুট্টোর সাথে আমার আগে থেকেই কিছুটা পরিচয় ছিল। সিএমএলএ সচিবালয়ে এসে দেখতে পাই মাঝেমাঝেই সে এখানে আসে। সঙ্গে থাকে ঢাকার দোহারের খন্দকার শহীদ। এরওর রুমে যায়। কথা বলতো বরিশালের আঞ্চলিক টানে। ছিল কিছুটা রসিক প্রকৃতির। খোচা মেরে কথা বলার অভ্যাস। হাসতে হাসতে শক্ত কথা বলে ফেলতো। অনেকদিন আগে থেকেই সে রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য চীৎকার চেচামেচি করে আসছিল। প্রায়ই কর্ণেল মুন্না ব্রিগেডিয়ার চিশতির রুমে গিয়ে উচ্চস্বরে বলতো, মোর কতা তো হোনবেন না, যেকালে হেইয়ারা রাস্তায় নামবেআনে হেইকালে বোঝবেন! সেই বিকেলে ভুট্টোকেও পাই অফিসে। কখন এসেছে জানিনা তবে এসে খবর পেয়েছে আমি আর চিশতি সাহেব দীর্ঘক্ষণ চীফের সাথে মিটিং করছি। রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা করছিল মুকুল ভাইয়ের রুমে। মুকুল ভাইও ছিলেন। সবার সাথে কথা বলি। প্লানিংয়ে বসে যাই। সময় অল্প কাজ অনেক। মুকুল ভাই দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন। আওয়ামী ঘরানার লোক। সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের সম্পর্কে তার ধারনা ছিল। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় বিভিন্ন এলাকার কমপক্ষে এক শ’ নেতা কর্মীর একটা তালিকা করতে যারা সৎ, দল এবং আদর্শের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন, মুল্যায়িত না হয়ে বা কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে আছেন। আওয়ামী লীগে ঠাঁই হয় নাই অথচ দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা এখনও বুকে লালন করেন। মুকুল ভাই বলেন কোন সমস্যা নাই আমি সবাইরে জানি। কাইলের মইধ্যেই লিস্টি কইরা ফালাইতেছি।
এরপর প্রশ্ন আসে নেতা কাদেরকে আনা যায়। একটা ব্যপার বুঝতে পারছিলাম হুদা-মতিনদেরকে এড়ানো যাবে না। ওরা এসে পড়বেই। যদিও এদের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ের কোন নেতা নাই তারপরও ইম্মেডিয়েট পাস্ট গভর্ণমেন্ট পার্টিও একটা অংশ, প্রায় ৪৫জন সাবেক এমপি ছিল এদের সাথে। এরা এসে গেলে দলে এবং নির্বাচনে এদেরই অগ্রাধিকার থাকবে। ভুট্টোকে বলি আপনার নেতার খবর কি? ভুট্টোর নেতা মানে সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা অভিজ্ঞ পার্লিয়ামেন্টারিয়ান মিজানুর রহমান চৌধুরী। ’৭৯এর নির্বাচনের আগে তিনি নীতি আদর্শের প্রশ্নে দ্বিমত করে পৃথক আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন। সে নির্বাচনে তিনি এবং তার দলের এ বি সিদ্দিক জিতে এমপি হয়েছিলেন। মার্শাল ল’ হওয়ার পর থেকে প্রায় চুপচাপই ছিলেন। ভুট্টোকে বলি দেখেন তো উনার সাথে কথা বলে আমাদের সাথে আসতে রাজী হন কিনা। অন্যরাও বলেন মিজান চৌধুরীকে পেলে দলের ভাবমূর্তি অনেক বেড়ে যাবে। ভুট্টো বলে তার সাথে কথা বলবে। আর একজন বাগ্মী নেতা ছিলেন শাহ মোয়াজ্জম হোসেন। দক্ষ সংগঠক। কিন্তু সমস্যা ছিল তিনি খোন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছিলেন এবং মোশতাকের দল ডিএল বা ডেমোক্রেটিক লীগ নিয়ে বসে ছিলেন। আমরা কোন বিতর্কিত লোককে দলে নিতে চাইছিলাম না। তারপরও বিশেষ বিবেচনায় তার সাথেও কথা বলার সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিক আলোচনার জন্য ভুট্টোকে সে দায়িত্বও দেওয়া হয়।
পরদিন সকাল ৮টা হবে, বাসার টেলিফোনে রিং। সেকালে মোবাইল ছিলনা ল্যান্ডফোনই ভরষা। এত সকালে কার ফোন চিন্তা করতে করতে উঠে ধরি। ওপাশ থেকে কন্ঠ ভেসে আসে, আমি এরশাদ বলছি। শোন, কাল বলেছিলাম এক মাসের মধ্যে পার্টি বানাবে। অত সময় দেয়া যাবেনা, পনের দিনের মধ্যে পার্টি ডিক্লেয়ার করতে হবে। আমি জ্বী স্যার জ্বী স্যার, এসে সাক্ষাতে কথা বলছি স্যার’ বলে ফোন রাখি। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে! পনের দিন মানে দুই সপ্তাহ। এত অল্প সময়ে কিভাবে সম্ভব! দ্রুত রেডি হয়ে পড়িমড়ি এসে হাজির হই অফিসে। ব্রিগেডিয়ার চিশতি রুমেই ছিলেন। আমি প্রবেশ করতেই বলেন, এখন ঠ্যালা সামলাও। তার মানে এরশাদ সাহেব তাকেও বলেছেন। আমি বলি, তাড়াহুড়া করলে তো স্যার কোন ভাল পার্টি বানানো যাবে না। তিনি বলেন কি আর করবা। পারলে চীফেরে বোঝাও। ওই বোঝাতে যাওয়ার সাহস আমার ছিল না। সকালে টেলিফোনে যে ভাব বুঝেছি তাতে বোঝাতে গেলে ফল উল্টো হয়ে যেতে পারে। তারপরও তিনি অফিসে এলে সাহস সঞ্চয় করে কর্ণেল শরীফকে বলে একবার যাই রুমে। সকালের কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন আর সময় নস্ট করবে না, কাজ শুরু করে দাও। আমি বলি কাজ আমরা শুরু করে দিয়েছি স্যার। কয়েকজন জাতীয় নেতার কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, সারা দেশে বিভিন্ন দলের ভাল ভাল নেতা-কর্মীদের তালিকা করা হচ্ছে। সবার সাথে কথা বলে দ্রুতই পার্টি ঘোষনা করে দেয়া সম্ভব হবে। জাতীয় নেতার কথা শুনে জানতে চান কার কার সাথে কথা হয়েছে। বলি মিজানুর রহমান চৌধুরী, শাহ মোয়াজ্জেম- আপাতত: এদের কাছে লোক পাঠিয়েছি। মিজানুর রহমান চৌধুরীর কথা শুনে এরশাদ সাহেব অবাক হন। বিষ্ময়কন্ঠে বলেন মিজান চৌধুরী আমাদের দলে আসবেন! তিনি এলে তো খুবই ভাল হয়। আমি আশ্বস্ত করি- আমরা চেষ্টা করবো। আরও কিছু নেতার সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে, কারও সাথে কথা ফাইনাল হলেই জানাবো। আলাপের শেষ পর্যায়ে ইঙ্গিত দিয়ে আসি গোছগাছ চুড়ান্ত করার প্রয়োজনে সময় দুই একদিন বাড়তে পারে। তবে চেষ্টা করবো সপ্তাহদু’য়েকের মধ্যেই ফাইনাল করতে।Résultat de recherche d'images pour "শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন"
মেজর জলিল জাসদের সভাপতি ছিলেন। শুধু সভাপতি নন তিনি ছিলেন এই দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার। যুদ্ধের পরপর বিদেশী লুটপাটের প্রতিবাদ করার দায়ে দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। শাস্তিস্বরূপ তাকে কোন রাস্ট্রীয় খেতাব দেওয়া হয় নাই। একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রতিবাদী কন্ঠ হিসেবে তার ভাল ইমেজ ছিল। এক সময় আমার সাথে ভাল সম্পর্ক ছিল। অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। সে সময় তিনি জাসদ ছেড়ে কি একটা ইসলামিক দল করতেন। ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাকে ফোন দেই। চায়ের দাওয়াত দেই। জলিল ভাই আসেন আমাদের অফিসে। কর্ণেল মুন্নার রুমে বসে কথা হয়। দল গঠনের কথা জানাই এবং তাকে আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করি। জলিল ভাই কথা বলতেন আস্তে আস্তে, অনেকটা নীচুস্বরে। সব শুনে জানতে চান এই দলের সভাপতি কে হবেন। বলি আপাতত: আমরা একটা কনভেনিং কমিটি দিয়ে শুরু করবো। পরে কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতা নির্বাচিত হবেন। চালাক মানুষ। বলেন, সেসব বুঝলাম কিন্তু পার্টির চীফ হবে কে? বলি একসময় তো এরশাদ সাহেবই দলের হাল ধরবেন। তিনি বলেন, হবে না। আমাকে যদি সভাপতি বানাও তাহলে চিস্তা করে দেখতে পারি। জলিল ভাইয়ের সাথে কথা আর এগোয় না। জানাবো বলে চা খাইয়ে বিদায় করি।Résultat de recherche d'images pour "মেজর এম এ জলিল"

সরকারি উদ্যোগে দল গঠিত হচ্ছে- একদিনেই রাস্ট্র হয়ে গেল। পেপার পত্রিকায় আলোচনা। রাজনৈতিক মহলে ভ্রুকুটি, সাধারন্যে ঔৎসুক্য। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার নানা ধরনের লোক যোগাযোগ করতে লাগলেন। রাজনৈতিক দলগুলো থেকেও নেতা কর্মীরা আমাদের সাথে যোগ দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে চললেন। যতদুর সম্ভব কথা হচ্ছে। ফোনে, সাক্ষাতে। দুই দিনেই সিএমএলএ সচিবালয় লোকের ভীড়ে গমগম করতে লাগলো। এ সময় একটা কৌশলগত সিদ্ভান্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আমাদের কাছে মনে হচ্ছিল যেসব দল বা দলের অংশবিশেষ যোগ দেবেন তাদের নেতা কর্মীরা তো স্ব স্ব দলীয় প্রধানের প্রতিই অনুগত থাকবেন। আমরা তখন কার খালু হয়ে যাবো! ব্যালেন্স রাখতে দলে আমাদের কিছু নিজস্ব নেতা-কর্মী থাকা দরকার, যারা শুধু আমাদেরই থাকবেন। ব্রিগেডিয়ার চিশতির সাথে আলোচনা করি। তিনি বলেন, কিন্তু আমরা আমাদের লোক পাবো কোথায়। নেতা-কর্মী কি রাতারাতি তৈরী করা যায়। আমার মাথায় একটা প্লান আসে। বলি, স্যার আমরা সড়াসড়ি কিছু রিক্রুট করতে পারি। বিভিন্ন দল থেকে কিছু ক্লিন ইমেজের দক্ষ সংগঠক। কোন পেশার বিশিষ্টজন, এদেরকে নিয়ে নিজস্ব গ্রুপ তৈরী করা যায়। যাতে বাইরে থেকে আসা নেতারা কখনও বিট্রে করলেও দল এগিয়ে নিতে আমাদের অসুবিধা না হয়। চিশতি সাহেব সায় দেন। বলেন তাহলে এমন লোকজন খুজতে শুরু করে দাও।Résultat de recherche d'images pour "জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু"

বিভিন্ন দলের সাথে কথা বলার পাশাপাশি আমি মাঠ পর্যায়ের কিছু দক্ষ সংগঠক এবং বিশিষ্ট জনের সাথে যোগাযোগ করি। জিয়াউর রহমান সাহেব জাসদের কোমড় ভেঙ্গে দিলেও এই দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী সংগঠকরা দল কামড়ে পড়েছিল। এই দলের প্রায় সকলকেই চিনতাম। এদের কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করি। সে সময় সিএমএলএ সচিবালয়ে কাজ করলেও আমার একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থা ছিল। এখানে একটা কথা বলে রাখি, গসসংযোগ সেলে কর্মরত সিভিলিয়ানরা কেউ মার্শাল ল’ হেড কোয়ার্টার থেকে বেতন ভাতা পেতেন না। এমআর আকতার মুকুল ভাই ছিলেন সরকারের সচিব বা সচিব পদমর্যাদার অফিসার। সিএমএলএ সচিবালয়ে ছিলেন তিনি ডেপুটেশনে। তাজুল ইসলাম ভাই সম্ভবত: তখন বিমানের জনসংযোগ কর্মকর্তা। কালাম মাহমুদ ভাই দৈনিক বাংলার প্রধান চিত্রশিল্পী। এরা বেতন ভাতা পেতেন যার যার অফিস থেকে। আমিও ছিলাম স্বেচ্ছাশ্রমী। তবে আমার কিছু সম্মানীর ব্যবস্থা করা হচ্ছিল। এর মধ্যে দল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সেটা আর হয় নাই। তখন আমার আয়ের প্রধান উৎস ছিল ওই বিজ্ঞাপনী সংস্থার ব্যবসা। বন্ধু আতিক এবং শওকত ওসমান বাবু মিলে এই পার্টনারশীপ ব্যবসাটা খুলেছিলাম। আতিকের নিজস্ব ব্যবসা ছিল। সে ব্যস্ত থাকতো সেটা নিয়ে। বাবু তখন শিল্পকলা একাডেমির জনসংযোগ কর্মকর্তা। মুলত: আমিই চালাতাম। আয় যা হতো অফিসের খরচা মিটিয়ে আমারই লেগে যেতো। অবশ্য এ নিয়ে পার্টনারদের কোন অনুযোগ ছিল না। বাবু শিল্পকলা একাডেমির বিজ্ঞাপন আমার সংস্থার মাধ্যমে রিলিজ করতো। ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির পিআরও ছিলেন বন্ধু আজমল হোসেন খাদেম। সে আমাকে ওখানকার বিজ্ঞাপন দিয়ে সাহায্য করতো। এই ব্যবসার সুবাদে প্রায়ই আমাকে লক্ষীবাজারে মিউনিসিপ্যালিটি অফিসে যেতে হতো। একদিন খাদেম সাহেবের রুমে বসে আছি, দেখি সামনে দিয়ে শামসুজ্জামান মিন্টু যাচ্ছেন। নগর জাসদের সহসভাপতি। নিরলস পরিশ্রমী। আমার বিবেচনায় সৎ এবং একজন দক্ষ সংগঠক। চাকরি করতেন পৌরসভায়। নাম কা ওয়াস্তে। মিন্টু সাহেবের সাথে আমার ভাল সম্পর্ক ছিল। ডাকি। বলি, আমাদের সাথে দল করবেন? প্রথমটায় তিনি গুরুত্ব দেন না। বলেন আর্মির সাথে দল! আচ্ছা ভেবে দেখি।

দুইএক দিন পর মিন্টু আমার সাথে যোগাযোগ করেন। বলেন, তিনি একা নন, আমরা চাইলে আরও কয়েকজনকে নিয়ে আমাদের সাথে জয়েন করতে পারেন। আমরা সাদরে সম্মতি দেই। আসলে জাসদ থেকে একটি গ্রুপ আমাদের দরকার ছিল। কারন এরা ছিল আদর্শবাদী এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। আমি মনে করেছিলাম যেহেতু এদের সাথে আমার পুর্ব পরিচয় এবং তাদের সম্পর্কে জানি, এদেরকে পেলে দলের ভিতটা মজবুত হবে। একদিন মিন্টু আসেন তার সাথীদেরকে নিয়ে। এদের মধ্যে ছিলেন আব্দুস সালাম, খালেকুজ্জামান চৌধুরী এবং আরও কয়েকজন। সবার নাম মনে করতে পারছি না। সে সময় এরশাদ সাহেব প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক ঘন্টা আমার জন্য সময় বরাদ্দ রেখেছিলেন। দলে যারা যোগ দিতে আসছে তাদেরকে নিয়ে যেতাম এরশাদ সাহেবের বাসা- সেনাভবনে। এরা এরশাদ সাহেবের সাথে সড়াসড়ি কথা বলতেন। নিজেরা বুঝে নিতেন, এরশাদ সাহেবও জানতেন কারা তার দলে আসছে। মিন্টু এবং তার সাথীদেরকেও নিয়ে যাই এরশাদ সাহেবের বাসায়। ওদের সাথে কথা বলে তিনি খুব খুশী হন।
রাজনীতিপাগল আমার এক দুরসম্পর্কের ভাই ছিলেন, নাম আব্দুল মতিন চৌধুরী। বাড়ী মানিকগঞ্জ আমার গ্রামে। ডাকনাম কাঞ্চন। দলের কাজ শুনলে ছুটে চলতেন। স্বাধীনতার আগে করতেন মোজাফ্ফর ন্যাপ। পরে সম্ভবত: কিছুদিন আওয়ামী লীগ। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের দ্বিতীয় সভাপতি। সর্বশেষ ছিলেন বিএনপি’র একজন নির্বাহি সদস্য হয়ে, নাম কা ওয়াস্তে। কাঞ্চন ভাইকে প্রস্তাব দিলে লুফে নেন। বলেন, আমি তো কামলা। কাজ দিবি করে দেব। কাঞ্চন ভাইয়ের মাধ্যমে আসেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদ হাসান, বিশিস্ট মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ আব্দুল আহাদ চৌধুরী (পরে তিনি দীর্ঘদিন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান ছিলেন), কেএসপি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুল হাই, জনতা পার্টির দফতর সম্পাদক খন্দকার মঞ্জুরে মাওলা, বিএনপির নির্বাহি সদস্য খন্দকার গোলাম মর্ত্তুজা, খন্দকার সিরাজুল ইসলাম, আইনজীবি এ্যাডভোকেট ফায়জুল কবির। আরও কয়েকজন বিশিস্ট ব্যক্তি এসেছিলেন, এদেরও সবার নাম আজ মনে নাই। কার মাধ্যমে যেন এলেন নান্দাইল ময়মনসিংহের খান চৌধুরী পরিবারের আনোয়ার হোসেন খান চৌধুরী। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট মেম্বার। এদের সবাইকে এরশাদ সাহেবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। এতজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সংসদের নেতাদেরকে দেখে তিনি সে সন্ধ্যায় অভিভুত হয়ে পড়েছিলেন।Résultat de recherche d'images pour "নুরে আলম সিদ্দিকী"নুরে আলম সিদ্দিকী
আরও একটা কথা বলছি, সে আমলে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আজকের মত ইন-জেনারেল দূর্নীতিগ্রস্থ ছিলেন না। এদের প্রায় সকলেরই ছিল ক্লিন ইমেজ। অনেকে সারা জীবন শুধু রাজনীতিই করে গেছেন, কিছু পাওয়ার আশায় না। নি:স্ব হয়ে মারা গেছেন কিন্তু কখনও কারও কাছে কিছু নিয়ে নালিশ করতেন না। রাজনীতি ছিল অনেকের কাছে একটা ব্রত। ওপরের দিকে নেতাশ্রেণীর কেউ কেউ চাঁদাবাজী বা ছোটখাট দুর্নীতির সাথে যুক্ত থাকলেও সাধারন কর্মীরা ছিলেন প্রায় শতভাগ নিষ্কলুষ। বিশেষ করে বিরোধী দল বা আদর্শভিত্তিক দলগুলোয় থাকতেন পোড়খাওয়া নেতা-কর্মীরা।
এর মধ্যে কে একজন খবর দিল ডাকসুর ভিপি জিয়াউদ্দিন আহমদ বাবলু ছাত্রলীগের সাথে সম্পর্ক ছেদ করে নিজেই একটা ফোরাম গঠন করে দিনাতিপাত করছে। বাবলু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার কয়েক বছরের জুনিয়র। আমার সাথে ভাল জানাশোনা ছিল। সবচেয়ে বড় কথা ছেলেটি অমায়িক এবং ভদ্র। আমাকে সব সময় সমীহ করেই কথা বলতো। বাবলুকে খবর দেই। সে আসে তার কয়েক সাথীকে নিয়ে। এদের মধ্যে ছিলেন আজম খান, দেলোয়ার হোসেন রাজা। সবাই নতুন দলে যোগ দিতে রাজী হয়। সন্ধ্যায় নিয়ে যাই এরশাদ সাহেবের কাছে। বাবলুর সাথে কথা বলে এরশাদ সাহেব চমৎকৃত হন। আমাকে একান্তে ডেকে বলেন এইরকম ছেলেই তো আমার চাই। দরকার হলে একে আমি মন্ত্রী বানাবো! তারেক, ইউ আর ডুয়িং এ গ্রেট জব ফর মি। উই স্যুড হ্যাভ মেট আরলিয়ার! ফেরার পথে বাবলুকে জানাই তার সম্পর্কে চীফের মনোভাব। বাবলু অনুপ্রাণীত হয়।
ভুট্টো এসে খবর দেয় তার মিশন সফল হয় নাই। মিজানুর রহমান চৌধুরী লাঠি দিয়ে তাড়া করা বাকি রেখেছেন। শাহ মোয়াজ্জম হোসেন নিমরাজি, তবে আমাদের সাথে কথা বলে বনলে সিদ্ধান্ত নেবেন। মিজান চৌধুরীর কাছে প্রস্তাব দেয়ার সাথে সাথে নাকি তিনি চোখ পাকিয়ে বলেছেন- তোমার সাহস তো কম না! সারা জীবন করলাম গনতন্ত্রের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম আর এখন তুমি আসছো মেলিটারির দালালীর প্রস্তাব নিয়া! বাইর হও আমার বাসা থিকা! ভুট্টো পড়িমড়ি পালিয়ে এসেছে। আমাকে বলে, একবার আপনে যান। দেখেন বু্ড়ারে রাজী করাইতে পারেন কিনা। আমার সাথে তো কথাই বললো না। আপনেরে অন্তত: বাসা থিকা বাইর কইরা দিবে না! বলি ঠিক আছে যাবো তার কাছে, আপনি এ্যাপেয়ন্টমেন্ট করেন। মিজানুর রহমান চৌধুরীকে আমাদের দরকার ছিল। তিনি একজন সিনিয়র রাজনীতিক এবং অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। সংসদে তার মত লোক প্রয়োজন। তাছাড়া তিনি আমাদের সাথে যোগ দিতে পারেন এ কথা আগেই এরশাদ সাহেবকে জানিয়ে রেখেছি, এখন যদি না আনতে পারি এটা হবে আমাদের ডিসক্রেডিট। এ্যপয়েন্টমেন্ট করে এক বিকেলে যাই তার বাসায়।Résultat de recherche d'images pour "মিজানুর রহমান চৌধুরী।"

মিজানুর রহমান চৌধুরী , এক আপাদমস্তুক রাজনীতিক। বলা যায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন রাজনীতির এক মহীরূহ। শুরু চাঁদপুর পৌরসভায় ভাইস চেয়ারম্যান দিয়ে। স্বতন্ত দাঁড়িয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয়দফাকে সমর্থন করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন। ছয়দফার সমর্থনে জনসভা করতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছুটে গিয়েছেন। ’৬৬-এর আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের প্রায় সকল শীর্ষ নেতা যখন জেলে, একাই হাল ধরেছিলেন। জেল খেটেছেন, হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন আদায়ের জন্য দিল্লীতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক করেছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাকে তথ্যমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পর বাদ দেয়া হলে সেইযে নীরব হয়ে যান আর তাকে আওয়ামী লীগে সরব পাওয়া যায় নাই। ’৭৫এ বঙ্গবন্ধুর বাকশালকে সমর্থন করেন নাই। কিন্তু নেতার প্রতি অনুগত থেকেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগের অনেক নেতা গিয়ে মোশতাক সরকারের মন্ত্রী হলেও মিজান চৌধুরী যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যরা যখন বঙ্গভবনে শপথ নিতে ব্যস্ত, ১৫ই আগস্টের সে সন্ধ্যায় অত্যন্ত সংগোপনে বাসায় স্ত্রী পুত্র কন্যাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় মিলাদ বা দোয়া দরুদ পড়েছেন। ছিলেন অনেকটা স্বাধীনচেতা এবং একজন নিখাদ গনতন্ত্রী। জিয়াউর রহমানের পিপিআরের আওতায় সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হলে তিনি তাদের সাথে ছিলেন। কিন্তু নীতির প্রশ্নে বনিবনা না হওয়ায় ’৭৯এর নির্বাচনের আগদিয়ে পৃথক আওয়ামী লীগ গঠন করেন। এমপি হন।
মিজান ভাইকে আমি দেখেছি ’৭৩এর পার্লামেন্ট থেকে। মন্ত্রীত্ব চলে যাওয়ার পর থেকে সে সময় প্রায় চুপচাপই থাকতেন। তখন তার সাথে আমার আলাপ পরিচয় ছিল না। ’৭৯এর পার্লামেন্ট থেকে কিছুটা জানাশোনা হয়। সংবাদ সংগ্রহ সাক্ষাৎকার নেয়া- মুলত: পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই এই পরিচয়। সিএমএলএ সচিবালয় থেকে লোক আসছে- বুঝলাম বাসার লোকজন ব্যপারটাকে বেশ গুরুত্বের সাথেই নিয়েছে। আমি গিয়ে পৌছামাত্র ভালভাবে রিসিভ করা হয়। কিন্তু নিয়ে যাওয়া হলো তার বেডরুমে। শুয়ে ছিলেন, আমাকে দেখে উঠে বসেন। এটাই ছিল মিজানুর রহমান চৌধুরী। বহু নামীদামী লোকের সাথে মিটিং তিনি এই খাটে বসেই করেছেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও এই আধশোয়া হয়েই নিয়েছেন। আমি সামনে বসি একটা প্লাস্টিকের বোনা হাতলওয়ালা লোহার চেয়ারে।
প্রথমেই কুশল বিনিময়। তারপর পরিচয়। আমি কিছু ঘটনার উল্লেখ করে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি তার সাথে আমার আগেই পরিচয় হয়েছে। তিনি হুঁ হুঁ করলেন বটে কিন্তু মনে হলোনা মনে করতে পারলেন। এরপর আসল কথা। প্রায় ঘন্টাখানেক ছিলাম তার ওখানে সে বিকেলে। তার কথা একটাই- আর্মি ব্যাকড কোন দলে তিনি যোগ দিতে পারেন না। আমি বোঝাই, মার্শাল ল’ তুলতে হলে একটা দল গঠন ছাড়া আমাদের বিকষ্প নাই। বিভিন্ন দলের নেতাদের সাথে কথা বলেছি। অনুরোধ করেছি নির্বাচনের পর রেটিফিকেশনের নিশ্চয়তা দিতে। কেউ রাজী হন নাই। এ অবস্থায় আমরা যতদিন না দল গঠন করবো, সেই দল টু থার্ড মেজরিটি আসনে জয়লাভের পর্যায়ে আসবে, ততদিন দেশে নির্বাচন হবে না। মার্শাল ল’ও উঠবে না। আপনি কি চান মার্শাল ল’ দীর্ঘায়িত হোক? অথবা বলেন আপনার দল টু থার্ড মেজরিটি পাবে আমরা আপনার সাথে ডিলে যাই। তিনি বলেন, ভাইরে কথা সেটা না, কথা হচ্ছে সারা জীবন করলাম গনতন্ত্রের জন্য আন্দোলন, এখন মেলিটারির সাথে দল করতে গেলে লোকে কি বলবে! আমি বলি, লোকে কি বললো সেটা বড় কথা না দেশ থেকে মার্শাল ল’ তোলা বড় কথা! আপনি যদি নাও আসেন তবুও দল হবে। কিন্তু আমরা চাই আপনার মত রাজনীতিকরা এই দলের নেতৃত্ব দিক। আপনারা না এলে এই দল টাউট বাটপারদের হাতে চলে যাবে। একটি আদর্শবাদী ক্লিন পার্টি গঠন করতে চাই বলেই আপনার মত নেতা আমাদের দরকার। আপনি আরও ভাবুন বলে সেদিনের মত ফিরে আসি। রুম থেকে বেড়িয়ে দেখি বাইরে পরিবারের সদস্যরা প্রায় সবাই এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে। মেজছেলে রাজু ছিল বেশ ইন্টেলিজেন্ট। বয়স তেমন না তবে রাজনীতির অনেক কিছুই বুঝতো। আমার দিকে এগিয়ে এসে বললো কাকা কি বুঝলেন। উপস্থিত সবার চোখমুখের ভাব দেখে মনে হলো তারাও চায় উনি আমাদের সাথে যোগ দিন। আমি বলি, তোমরা তো সবই শুনেছো। উনাকে একটু বোঝাও। সুযোগ সব সময় আসেনা। রাজু কথা দেয় তারা সবাই মিলেই চেষ্টা করবে। ভুট্টো ছিল সাথে, ফেরার পথে তাকেই দায়িত্ব দেই মেকানিজম করতে।
পরদিন মিজান ভাইয়ের দলের সাধারন সম্পাদক গাজীপুরের শামসুল হক সাহেব ফোন করলেন। বললেন দলে আমরা সবাই রাজী কিন্তু উনি তো রাজী হচ্ছেন না। আপনারা কিন্তু এখনই আমাদেরকে বাদ দিয়েন না। আমরা চেষ্টা করছি তাকে বোঝাতে। আমি বলি, অসুবিধা নাই। তাকে বাদ রাখার চিন্তা আমরা করছি না। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যবৃন্দ, দলের অন্যান্ন নেতা বিশেষ করে শামসুল হক সাহেবের চেষ্টা সফল হয়। মিজান ভাই আমাদের সাথে দল করতে রাজী হন। তবে নুরে আলম সিদ্দিকী এই প্রক্রিয়ায় দল গঠনে রাজী না হওয়ায় মিজান ভাইদের সঙ্গ ত্যাগ করেন। পরে শুনেছিলাম তিনি নাকি মন্ত্রীত্বের নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন। পরদিন দুইএকজন নেতাসহ মিজানুর রহমান চৌধুরী সিএমএলএ সচিবালয়ে আসেন। ব্রিগেডিয়ার চিশতির সাথে দেখা করেন। এ সময় এরশাদ সাহেব অফিসে ছিলেন। আমি গিযে খবর দেই। এরশাদ সাহেব উচ্ছসিতকন্ঠে বলেন, তাই নাকি! কোথায় তিনি? আমার এখানে নিয়ে এসো। আমি মিজান ভাইকে নিয়ে যাই তার কাছে। এরশাদ সাহেব তাকে উষ্ণ অভ্যার্থনা জানান। দু’জন কোলাকুলি করেন। বলেন, আপনাকে পেয়ে আমরা ধন্য। এ সময় ইঙ্গিত দেন নির্বাচনের পর তাকে সংসদ নেতা বা প্রধানমন্ত্রী করা হতে পারে। কারন আমাদের সাথে তার চেয়ে সিনিয়র নেতা আর কেউ নাই।
মিজান ভাই এসে গেলেন। এরপর খবর নেই শাহ মোয়াজ্জেমের। ভুট্টোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল তার সাথে যোগাযোগের। ভুট্টো কথা বলে এসে জানিয়েছিল তিনি আমাদের সাথে সড়াসড়ি আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবেন। এক সন্ধ্যায় যাই তার বাসায়। মোয়াজ্জম ভাই তখন থাকেন গুলশান শুটিং ক্লাবের পাশের একটি রোডে নিজ বাসায়। বিল্ডিংটা সম্ভবত: তখন পর্যন্ত একতলা। লাগোয়া একটা গাড়ীর গ্যারেজের মত প্রশস্ত ঘর, ওখানেই তিনি পার্টির মিটিংগুলো করতেন বোধহয়। কক্ষে একটা চল্লিশ অথবা ষাট পাওয়ারের বাল্ব। আলো অনেকটা হ্যারিকেনের আলোর মত। ছাদ নীচু বলে সিলিংফ্যান নাই। অদুরে একটা স্ট্যান্ড ফ্যান থেকে বাতাস আসতো। তবে ফ্যান খানিকটা আওয়াজও করতো। আমরা গিয়ে দেখি মোয়াজ্জেম ভাই তার দলের নেতাদের নিয়ে বসে আছেন। নেতাদের মধ্যে ছিলেন ওয়ার্সী বুক ডিপোর মালিক আব্দুল বারী ওয়ার্সী, খুলনার মিয়া মুসা হোসেন, টাঙ্গাইলের শামিম আল মামুন, মিসেস আমেনা বারী, ফরিদ আহমদ, আনোয়ার হোসেন। আরও দুইএকজন বোধহয় ছিলেন, এ মুহুর্তে নাম মনে করতে পারছি না। মোয়াজ্জম ভাই যথাসসম্ভব গাম্ভীর্য বজায় রেখে আমাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য জানতে চান। আমি ব্যাখ্যা করি। সব শুনে তিনি বলেন, তোমার সাথে কথা বইলাই তো আর এতবড় সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, তোমাদের চীফের সাথে কথা বলতে চাই। আমি বলি কোন অসুবিধা নাই। আপনি কালই চইলা আসেন।
পরদিন সকালে মোয়াজ্জেম ভাই আসেন কয়েকজনকে সাথে নিয়ে। তাদেরকে নিয়ে যাই এরশাদ সাহেবের কাছে। মোয়াজ্জেম ভাই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কিছু উপদেশ পরামর্শ দেন। এরশাদ সাহেব বলেন, আপনারা পলিটিকাল লীডার আপনারা যেভাবে চইবেন সেভাবেই দল হবে। সবাই মিলে দলটাকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলন। মোয়াজ্জেম ভাই বলেন, সেটা তো করবো কিন্তু খায়দায় চান মিয়া মোটা হয় জব্বর- তা তো হবে না! এরশাদ সাহেব কিছু বুঝতে না পেরে তাকান তার দিকে। মোয়াজ্জেম ভাই ব্যাখ্যা করেন, আমরা রাস্তায় খাইটা মরবো আর ফ্লাগ উড়াইবো (মন্ত্রীত্ব) লাল ভাই! আসলে লাল ভাই হচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল এ বিএম আমিনুল ইসলাম। তিনি তখন সামরিক সরকারের একজন উপদেষ্টা (মন্ত্রী)। বাড়ী মুন্সিগঞ্জ মোয়াজ্জেম ভাইয়ের এলাকায়। এলাকায় প্রাধান্য নিয়ে বোধহয় দু’জনে পাল্লাপাল্লি ছিল। এরশাদ সাহেব হেসে দিয়ে বলেন, কাজ করেন আপনারাও ফ্লাগ পাবেন।Résultat de recherche d'images pour "চরমপত্র- এম আর আক্তার মুকুল pdf"

এম আর আকতার মুকুল ভাই এর মধ্যে শতাধিক নেতাকর্মীর তালিকা তৈরী করে ফেলেছিলেন। কর্ণেল মুন্না স্টাফ অফিসারদেরকে বলে দেন দেশের সমস্ত ডিসিকে ফোন করতে, যেন অতি সত্বর তারা ওইসব নেতা-কর্মীদের সাথে যোগাযোগ করে ঢাকায় আমাদের কাছে পাঠান। মুকুল ভাই দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন। এই সুবাদে রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তার ভাল জানাশোনা ছিল। সব দলের খোজখবরই রাখতেন। তবে আওয়ামী ঘরানার লোক ছিলেন বলে আওয়ামী লীগের খবরই তার কাছে ছিল বেশী। ওই তালিকায় প্রধানত: আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের পোড়খাওয়া, সৎ ত্যাগী এবং নিবেদিতপ্রান নেতা-কর্মীদের নাম ছিল। যতদুর মনে পড়ে এতে সাবেক মন্ত্রী সোহরাব হোসেন, দিনাজপুরের অধ্যাপক ইউসুফ আলী, নোয়াখালির নুরুল হক, কক্সবাজারের আফসার সামাল চৌধুরী- এ ধরনের সিনিয়র নেতাদের নামও ছিল। নুরুল হক সাহেব জানিয়ে দেন তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে কোথাও যাবেন না। সোহরাব হোসেন নতুন দলে যোগদানে অপারগতা জানান। আফসার কামাল সাহেব এসেছিলেন। তাকে দলে নেয়া হয়েছিল। রংপুরের মতিউর রহমানের (সাবেক মন্ত্রী এবং ড: ওয়াজেদ মিয়া ও শেখ হাসিনার বিয়ের আয়োজক) সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন ব্যবসায় ব্যস্ত বলে সময় দিতে পারবেন না। সম্ভবত: চট্টগ্রামের সাবেক আওয়ামী লীগ মন্ত্রী এমআর সিদ্দিকীর নামও ছিল ওই তালিকায়। তিনি জানিয়েছিলেন আর রাজনীতি করবেন না। রাজশাহির একরামুল হকের নাম ছিল। কিন্তু ডিসি ভুল করে অন্য এক একরামুল হককে পাঠায়। যাহোক তিনিও একজন ভাল লোক ছিলেন এবং দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। এভাবে মুকুল ভাইয়ের তৈরী তালিকার অনেকেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং দল করতে রাজী হন। তবে বেশীরভাগই আসেন নাই।
ডিজি এনএসআই জেনারেল আনোয়ার এলেন একদিন অফিসে। বললেন, কই আর তো কিছু জানালেন না। বলেন কি হেল্প লাগবে। আমি বলি, যেহেতু আমরা দলটিকে একটি ব্রডবেজ দল বানাতে চাই, দুইটি বংশ থেকে আমাদের দুইজন লোক লাগবে যাদের একজনের নামে আগেপিছে শেখ এবং অন্যজনের নামের সাথে ভাসানী আছে। জেনারেল সাহেব বলেন আমাকে দুইদিন সময় দেন। দুইদিন পর ফোন করে বলেন মাওলানা ভাসানীর ছেলে নাসের খান ভাসানী আর শেখ পরিবার থেকে শেখ শহিদুল ইসলাম চলবে? নাসের খান ভাসানী মাওলানা ভাসানীর বড় ছেলে। কিন্তু রাজনীতিতে জাতীয় নেতা হিসেবে তখনও তেমন প্রতিষ্ঠিত নন। তারপরও মাওলানা ভাসানীর ছেলে, চলবে। শেখ শহিদ বঙ্গবন্ধু পরিবারের সন্তান। তখনও ছাত্রনেতার গন্ধ যায় নাই। সম্ভবত: বাকশাল ছাত্র সংগঠনের প্রধান বানানো হয়েছিল তাকে। জাতীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে তখনও নাম হয় নাই। একটু জুনিয়র হয়ে যায় তারপরও বঙ্গবন্ধু পরিবারের লোক, জেনারেল সাহেবকে জানাই ওদের সাথে কথা বলে আমাদের এখানে পাঠাতে। নাসের খান ভাসানী বাবু ভাই আসেন একদিন। খুবই শান্ত স্বভাবের, কিন্তু রাগ উঠে গেলে হুশ থাকতো না। কথা বলার সময় মিটিমিটি হাসতেন। আস্তআস্ত কাচাসুপারি দিয়ে পান খেতেন ফলে সব সময় প্রেশার থাকতো হাই। বাবু ভাই তখন ভাসানী ন্যাপের সভাপতি। কথা হয় তিনি সদলবলেই যোগ দেবেন। অনুরোধ করেন, সম্মানটা যেন থাকে। মনে আছে দলবলসহই তিনি আমাদের সাথে এসেছিলেন। তার দলের একজনের কথা না উল্লেখ করলে অন্যায় করা হবে। আজাদ সুলতান। ভাসানী ন্যাপের দপ্তর সম্পাদক। অত্যন্ত নীরিহ, সাদাসিধে অমায়িক। রাজনীতিতে এইরকম কর্মঠ অথচ প্রচারবিমুখ নীরব কর্মী আমি খুব কমই দেখেছি।Résultat de recherche d'images pour "শেখ শহীদুল ইসলাম"

শেখ শহীদ

শেখ শহীদ ভাই আসেন। তার সাথে পরিচয় আমার স্বাধীনতার আগে থেকেই। ’৭১এর এপ্রিলে গোপালগঞ্জে মুক্তিবাহিনী সংগঠনে কিছুদিন একসাথে কাজ করেছি। স্বাধীনতার পর খুব একটা যোগাযোগ ছিল না। শহীদ ভাইয়ের সাথে আসেন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা পলাশ আনোয়ার মতি, খালেদ খুররম, মহিউদ্দিন হায়দার খোকা।ব্রিগেডিয়ার চিশতির সাথে শহীদ ভাইয়ের বৈঠক করিয়ে দেই। তিনি একটি অনুরোধ জানান। এটা ঠিক শর্ত ছিলনা তারপরও চিশতি সাহেব বলেন আপনি জয়েন করেন, আমরা ব্যপারটা দেখবো। শহীদ ভাই তার সাথীদের সহ আমাদের সাথে যোগ দিতে সম্মত হন।
মুক্তিযোদ্ধানেতা আব্দুল মতিন চৌধুরী (কাঞ্চন ভাই) একদিন জানান আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফের সাথে তার কথা হয়েছে। রাজনীতি পাগল এই কাঞ্চন ভাই তখন নাওয়া খাওয়া ভুলে গেছেন। দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা ছুটছেন এর ওর কাছে। দলে ভাল লোক আনতে হবে, দক্ষ সংগঠক আনতে হবে। নেশাগ্রস্থর মত হয়ে পড়েন যেন। এক পর্যায়ে তিনি প্রায় আমার সার্বক্ষণিক সাথীই হয়ে যান। এই কাঞ্চন ভাই মোহাম্মদ হানিফকেও খুজে বের করেছেন। হানিফ ভাই তখন আওয়ামী লীগের মহানগর পর্যায়ের নেতা ছিলেন। পুরনো ঢাকার ডাকসাইটে মাজেদ সরদারের জামাই। এই মাজেদ সরদারের অপর দুই জামাতা ছিলেন ঢাকার প্রথম মেয়র ব্যরিস্টার আবুল হাসনাত এবং জেনারেল মীর শওকত। হানিফ ভাই সে সময় মহানগর আওয়ামী লীগে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন না। কমিটি গঠন নিয়ে অসুন্তুস্টির রেশ ধরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে দুরে ছিলেন। এক রাতে কাঞ্চন ভাই আমাকে নিয়ে যান হানিফ ভাইয়ের বংশালের বাসায়। সাংবাদিকতার সুবাদে তার সাথে আমার আগে থেকেই কিছুটা পরিচয় ছিল, তবে অতটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। হানিফ ভাইয়ের সাথে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। পরিশেষে বলেন তার দু’টি শর্ত পুরনের নিশ্চয়তা পেলে ভেবে দেখতে পারেন। এক. বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা ঘোষনা দিতে হবে। আর দ্বিতীয়টি ছিল কিছুটা ব্যক্তিগত। আমি বলি, দলে যোগ দিয়ে আপনারা নিজেরাই তো কাজগুলো করতে পারেন। তারপরও আমি চীফের সাথে কথা বলবো। হানিফ ভাই অবশ্য তার কিছুদিন পর জানিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ ছেড়ে তার পক্ষে অন্য দল করা সম্ভব না।
মরহুম জিয়াউর রহমানের প্রথম দল জাগদল চালাতেন আমার বন্ধু সাংবাদিক আহমেদ মীর্জা খবির। একদিন তিনি এসে হাজির হন সাবেক ডিআইজি আব্দুল হককে নিয়ে। দলে বোধহয় তখন নেতৃত্ব নিয়ে গন্ডগোল চলছিল। সভাপতি ছিলেন পীরজাদা শাহ দীন মোহাম্মদ। পীরজাদাকে বাদ দিয়ে মীর্জা ডিআইজিকে রাতারাতি সভাপতি বানিয়েছিলেন। এসে বলেন তার দল আমাদের সাথে মার্জ করবে। আমরা ওয়েলকাম জানাই। খবর পেয়ে পরদিন পীরজাদা এসে হাজির। তিনি বলেন আমি জাগদলের বৈধ সভাপতি আমাকেও নিতে হবে। আমরা তাকেও নিয়ে নেই।
একদিন অফিসে গেছি, ব্রিগেডিয়ার চিশতি বলেন শীগগির বঙ্গভবনে দৌড়াও! কি ব্যপার! প্রেসিডেন্ট সাহেব অস্থির হয়ে গেছেন। সেই কবে চীফ ফোন করে বলেছিলেন তাকে দলের আহ্বায়ক বানানো হবে তারপর থেকে আমরা কেউ আর যোগাযোগ করি নাই। তিনি হট্টগোল বাধিয়ে দিয়েছেন- এটা কি তামাশা! বঙ্গভবন থেকে এমএসপি ফোন করে বলেছেন যেন দ্রুত কেউ দেখা করে তাকে শান্ত করে। আমি ছুটি। প্রেসিডেন্ট আহসানউদ্দিন চৌধুরী তার রুমে বেশ ভাব নিয়ে বসেন। আমি কিছু ফাইলপত্র নিয়ে গেছিলাম। সেগুলো দেখাই, এ পর্যন্ত কাকে কাকে দলে পাওয়া গেছে জানাই। তিনি জানতে চান দলের আদর্শ উদ্দেশ্য কি। ব্যাখ্যা করি। শুধান তাকে করতে হবে কি। আমি বলি আপনাকে স্যার কিছুই করতে হবে না, যা করার আমরাই করছি। তিনি কিছুটা রেগে গিয়ে বলেন, আমি কনভেনর আমার কিছু করার নাই মানে! দেখি উল্টো বুঝেছেন। মেজাজ ঠান্ডা করতে বলি, স্যার আপনিই তো সবকিছু করবেন। দলের ঘোষনা তো আপনাকেই দিতে হবে। আমরা দৌড়াদৌড়ি করে সবকিছু গোছগাছ করছি। এ কথায় তিনি বেশ খুশী হন। বলেন, আমাকে সব সময় জানাবা। কোন সমস্যা হলে বলবা। দায়িত্বশীল নেতার মতই কথা। আমি জ্বী স্যার জ্বী স্যার বলে বিদায় নেই।

এ সময় যোগ দিতে আসা বিভিন্ন দলের নেতা কর্মীরা এরশাদ সাহেবের সাথে দেখা করতে চাইতেন। জনে জনে দেখা করানো সম্ভব ছিলনা। সিএমএলএ সচিবালয়ের দোতালায় একটি কনফারেন্স রুমে আমরা চীফের সাথে গ্রপ বাই গ্রুপ সৌজন্য সাক্ষাতের আয়োজন করতাম। প্রায় প্রতিদিনই এ রকম মিটিং থাকতো। ২০/২৫ ৩০/৪০জনের একএকটা গ্রুপ আসতো। এরশাদ তাদের সাথে দেখা করতেন। বক্তৃতা করতেন। কর্ণেল মুনির এই দল গঠনে আমাদের লক্ষ্য ও আদর্শ ব্যাখ্যা করতেন। কিভাবে এটিকে একটি জনকল্যানমুলক গনমুখি দল হিসেবে গড়ে তোলা যায় তার দিক নির্দেশনা দিতেন। একদিন হয়েছে কি, নির্দ্ধারিত গ্রুপটি আসে নাই। ওদিকে এরশাদ সাহেব রেডি। ভদ্রলোক তার দল করতে আসা এতএত লোক দেখে অভিভুত হয়ে পড়েছিলেন। নির্দিস্ট সময়ে তিনি জানতে চান আমরা রেডি কিনা। রেডি কিনা মানে লোকজন এসেছে কিনা। এদিকে যাদের আসার কথা তাদের কোন খবর নাই। ব্রিগেডিয়ার চিশতি আর আমি চিন্তায় পড়ে যাই। এখন কি করি! চীফকে বলা যাবে না যে লোক আসে নাই। তাতে তিনি অন্যরকম বুঝতে পারেন। তাকে তখন আমাদের সব সময় গুড হিউমারে রাখতে হচ্ছে। এ সময় কে একজন এসে জানায় মাদ্রাসা শিক্ষক-ছাত্রদের ১৪/১৫জনের একটি দল লবিতে ঘোরাফেরা করছে। তারা অন্য কি এক কাজে এসেছিল। বসার জায়গা নাই লবিতে অপেক্ষা করছে। দি আইডিয়া! আমি দৌড়ে যাই। তাদেরকে বলি এরশাদ সাহেব যদি আপনাদের সাথে দেখা করতে চান আপনাদের অসুবিধা আছে। ওরা তো হতবাক! এরশাদ সাহেব তাদের সাথে দেখা করবেন! ওস্তাদজীগোছের একজন জানতে চায় তাদেরকে কি বলতে হবে। আমি বলি, আপনাদেরকে কিছুই বলতে হবে না। যা বলার আমরাই বলবো। আপনারা শুধু শুনবেন আর হু হাঁ করবেন।
আমি তাদেরকে নিয়ে কনফারেন্স রুমে বসাই। চিশতি সাহেব চীফকে নিয়ে আসেন। মঞ্চে মাঝচেয়ারে এরশাদ সাহেব, তার দুই পাশে আমি আর ব্রিগেডিয়ার চিশতি। সামনে দাড়িটুপীধারী দর্শক-শ্রোতাবৃন্দ। কথা শুরু হয়, কে একজন মঞ্চে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছিলেন। এরশাদ সাহেব অডিয়েন্স দেখে কিছুটা ভ্রু কুচকান। আমার কানে কানে বলেন, এই, সব টুপীওয়ালা লোক কেন? বলি, স্যার এরা একটি ইসলামি গ্রুপ থেকে এসেছে। তিনি বলেন, ইসলামি গ্রুপ মানে? রাজাকার টাজাকার না তো! আমি সজোরে মাথা নাড়ি। এক পর্যায়ে এদের নামের তালিকা দেখতে চান। এই গ্রুপের কোন তালিকা করা হয় নাই। আমার কাছে অন্য এক গ্রুপের একটা তালিকা ছিল। সেটা দেই। তিনি পড়ে নীচে লেখেন, কোন স্বাধীনতাবিরোধীকে যেন দলে না নেয়া হয়। (এই কাগজটা আমি অনেকদিন ব্যক্তিগত সংগ্রহে রেখেছিলাম। পরে হারিয়ে যায়)।
মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সম্পর্কে এরশাদ সাহেবের মনোভাব জানতে পারলাম। এর মধ্যে একদিন মুসলিম লীগের কেন্দ্রিয় নেতা কাজী কাদের সাহেব আসেন। ভদ্রলোক মানুষ। তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছেন বলে অভিযোগ ছিল। আমাদের দলে যোগ দিতে চান। পুরনো আমলের একজন জাতীয় পর্যায়ের নেতা। নেয়া যায়। কিন্তু এরশাদ সাহেব যেহেতু বলে দিয়েছেন স্বাধীনতাবিরোধী কাউকে নেয়া যাবে না, ভদ্রলোককে কয়েকদিন ঘোরাই। তাকে সড়াসড়ি না করতে পারছিলাম না। তিনি মাঝেমাঝে ফোন করে খবর নিতেন। দল ঘোষিত হয়ে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ করেন নাই। অনেকদিন পর এক অনুষ্ঠানে তার সাথে দেখা হয়েছিল। বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। কিছু বলেন নাই, কিন্তু আমি লজ্জিত হচ্ছিলাম। কারন ততদিনে জমিয়তুল মোদাররিছিনের মাওলানা মান্নান এরশাদ সরকারের একজন মন্ত্রী!
পুরনো ঢাকার পুস্তক বাধাই সমিতির নেতা ছিলেন বরিশালের মাওলানা আব্দুল মতিন। স্বাধীনতার পর কিছুদিন জাসদ করতেন। বোধহয় মহানগর পর্যায়ে ছিলেন। সম্ভবত: তাকে কোন পদপদবী দেওয়া হয় নাই। কে একজন নাকি তাকে একদিন বলেছিল, আপনে তো জাসদের কেউ না। মাওলানা মতিন নাকি ‌শ্লেসক‌ন্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন, ছেরাজুল আলম খানও তো জাসদের কেউ না! মাওলানার এই কথা নিয়ে সে সময় আমরা বেশ হাসাহাসি করতাম। ’৭৫এর পর রাজনীতি শুরু হলে মাওলানা মতিন লেবার পার্টি নামে একটা দল গঠন করেছিলেন। আমার সাথে মাওলানার আলাপ পরিচয় ছিল। সে সুত্র ধরে তিনি যোগাযোগ করেন। আমাদের সাথে জয়েন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তার সম্পর্কেও প্রচারণা ছিল তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছেন। ফলে তাকেও এভয়েড করি।
একদিন দেখি সুশ্রী এক তরুনী এ ঘর ও ঘর ঢু মারছেন। জিজ্ঞেস করে জানতে পারি তার নাম হাসিনা বানু শিরিণ। বাড়ী খুলনা। লেখাপড়া করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্র লীগের এক তুখোর নেত্রী ছিলেন। জ্বালাময়ী ভাষনে পারদর্শী ছিলেন বলে ‘উত্তরবঙ্গের অগ্নিকন্যা’ খ্যাতি পেয়েছিলেন। বিয়ে করেছিলেন বরিশালের আর এক ছাত্র লীগ নেতা নজরুল ইসলামকে। শিরিণ বেশ কিছুদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। দলে মুল্যায়ন পান নাই। নতুন দল হচ্ছে জেনে জুলফিকর আলী ভুট্টোর মাধ্যমে এ পর্যন্ত এসেছেন। ভুট্টো আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। পরিচয়ের পর থেকে শিরিণ প্রতিদিনই আসতে থাকেন। ব্রিগেডিয়ার চিশতির সাথেও পরিচিত হন। এম আর আকতার মুকুল ভাই তাকে চিনতেন, তার রুমে বসেই সময় কাটাতো। এই শিরিন এক সময় আমাদের সার্বক্ষণিক সহকর্মী হয়ে যায়। খুলনা পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতার ইচ্ছা প্রকাশ করে। পারবে কি পারবে না সন্দেহ ছিল তারপরও চিশতি সাহেব অনুমতি দেন। নির্বাচনে নেমে শিরিণের অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। হিসাব করে দেখা যায় চার লাখের মত। আজকের প্রেক্ষিতে হাস্যষ্কর মনে হবে। চার লাখ টাকায় খুলনা মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান নির্বাচন! হ্যাঁ সে আমলে নির্বাচনী ব্যয় এমনই ছিল। মনোনয়ন কেনা মাস্তান পোষা পুলিশ ম্যানেজ প্রশাসন কেনা- এসব ব্যপারগুলো নির্বাচনে বাধ্যতামুলক ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায় শিরিণের নির্বাচনে এত টাকা কে যোগান দেবে! একদিন রুহুল আমিন হাওলাদারকে নিয়ে আসে শিরিণ। জানায় হাওলাদার বরিশালের লোক। তার এবং তার স্বামীর খুব কাছের। আমরা বলে দিলে সে নির্বাচনে টাকা দেবে।
রুহুল আমিন হাওলাদার একসময় ছাত্র লীগ করতেন। তেজগাঁয় শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন ভুইয়ার সাথে মিলে শ্রমিক আন্দোলন করেছেন। জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপিতে যোগ দিয়ে বরিশাল থেকে এমপি হয়েছিলেন। সাত্তার সরকারের লাস্ট কেবিনেট রিশাফলিংয়ে একজন উপমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু খুবই অল্প দিনের জন্য। মার্শাল ল’ জারির দুইএক দিন আগে গোয়ালন্দ ফেরিঘাটে কি একটা ঝামেলা হয়। এরপর থেকে তিনি পলাতক হয়ে যান। মাশার্লা ল’ সরকার তার নামে মামলা এবং হুলিয়া জারী করে রেখেছিল।
সেই রুহুল আমিন হাওলাদার সামরিক সরকারের হেড কোয়ার্টারে এসেছেন। আমি কথা বলি। তিনি পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বলেন, এই অর্ডারটা করিয়ে দিতে পারলে সে শিরিনকে চার লাখ টাকা দিতে পারবে। সরকারি বন থেকে দশ হাজার সিএফটি কাঠ কাটার অনুমোদন। আমি বলি, এসব কাজ তো আমরা করি না তারপরও ব্রিগেডিয়ার সাহেবের সাথে কথা বলে দেখি। শুনে চিশতি সাহেব জানতে চান এইটা কোন রুহুল আমিন। বলি। তিনি সবিষ্ময়ে বলেন ও এইখানে ঢুকলো কেমনে! ওরে তো পুলিশ খুজতেছে! বাচতে চাইলে তাড়াতাড়ি চইলা যাইতে বলো। শিরিণ চিশতি সাহেবকে ম্যানেজ করেন। বলেন অনেক কষ্ট করে তাকে রাজী করানো হয়েছে, তাড়িয়ে দিলে তার নির্বাচন হবেনা। কাঠ লাগবেনা, তাকে ধরা হবে না- এটা বলে দিলেও তার কাছ থেকে টাকা নেয়া যাবে। অগত্যা চিশতি সাহেব রাজী হন। তবে কোন পারমিট টারমিট না, তার মামলাগুলো দেখা হবে যদি সে শিরিণের নির্বাচনে সাহায্য করে। আমি হাওলাদার সাহেবকে জানাই ব্রিগেডিয়ার সাহেবের কথা। যাহোক, তিনি রাজী হন এবং সম্ভবত: লাখদু’য়েক টাকা দিয়েছিলেন শিরিণকে। সেই রুহুল আমিন হাওলাদারকেও দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
একদিন চীফের সাথে দেখা করবো, কি অবস্থায় আছেন জানতে পিএস কর্ণেল শরীফের রুমে ঢু মারি। দেখি সেখানে ব্যরিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বসে। কর্ণেল শরীফ আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন। আনিস সাহেব আমার পরিচয় পেয়েই তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন যেন। ক্রুদ্ধস্বরে বলেন আপনিই সেই লোক! আপনারা লোকটাকে এইভাবে ডোবাচ্ছেন কেন বলেন তো! ব্যারিস্টার আনিস তখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি’র একজন প্রভাবশালী নেতা। আর এই বিএনপি’র সাথে সামরিক সরকারের দা-কুড়োল সম্পর্ক।
(চলবে)
ছবিতে এরশাদ সাহেবের বাঁ পাশে সিনিয়র সাংবাদিক সংবাদের চীফ রিপোর্টার তোজাম্মল আলী (প্রয়াত), ডান পাশে রাস্ট্রপতির সামরিক সচিব ক‌র্ণেল ই‌লিয়াস, সর্ববামে প্রয়াত সাংবাদিক ফাজলে রশীদ। ছ‌বি‌টি তোলা সি‌নিয়র ফ‌টো সাংবা‌দিক এ কে এম মোহ‌সিনের।

Image may contain: 2 people, people smiling

 

ব্যরিস্টার আনিসের সাথে আমার পুর্ব পরিচয় ছিলনা। তিনি সম্ভবত: ’৭৯এর নির্বাচনে বিএনপি’র টিকেটে এমপি হয়েছিলেন। খালেদাপন্থী বিএনপি’র একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। আর এই বিএনপি তখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে আদাজল খেয়ে নেমেছে। মার্শাল ল’ হেড কোয়ার্টারে সেই গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে দেখে আমি কিছুটা অবাক হই। তিনি এসেছিলেন এরশাদ সাহেবের সাথে দেখা করতে। হয়তো নতুন দল করা থেকে যেন তিনি বিরত থাকেন সেই অনুরোধ জানাতে। তার তীব্র প্রশ্নবাণের জবাবে আমি বলি আপনারা এভাবে সরকারের বিরুদ্ধে না নামলে তো আমাদের এই কাজের দরকার পড়তো না। তিনি একইরকম উত্তেজিত কন্ঠে বলেন, কাদেরকে নিয়ে আপনারা দল করছেন! এইসব অচল মাল দিয়ে দল বানালে তা দাঁড়াবে! আমি বলি তাহলে আপনি আসুন আমাদের সাথে। তিনি বলেন, কি বলেন আপনি! আমি একটা দলের সাথে আছি। তবে হ্যাঁ আমার কিছু ভবিষ্যত পরিকল্পনা আছে। সময়মত দেখবেন। হ্যাঁ, সময়মতই দেখেছিলাম। আমরা যখন দল করে এগিয়ে যাচ্ছি, এক পর্যায়ে বেগম জিয়াকে ত্যাগ করে তিনি সহ আরও কয়েকজন বড় মাপের নেতা এরশাদ সাহেবের সাথে যোগ দিয়েছিলেন।
চীফের পিএস কর্ণেল শরীফের রুমে একদিন লে: কর্ণেল (অব:) জাফর ইমাম বীরবিক্রমকেও দেখেছিলাম। সে সময় জাফর ইমামও বিএনপি’তে ছিলেন। পরে তিনিও আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন।
কাজী জাফর আহমদ ছিলেন একজন বামপন্থী রাজনীতিক। চার্মিং পার্সনালিটি। নেতাসুলভ ভাবভঙ্গি। তীর্যক কথাবার্তা, সবচেয়ে বড় কথা অল্প সময়ে কর্মীদেরকে আপন করে নেয়ার এক জাদুকরি গুনের অধিকারি। টঙ্গিতে শ্রমিক আন্দোলন করে উঠে এসেছিলেন। ভাসানী ন্যাপের সাথে ছিলেন। স্বাধীনতার পর রাশেদ খান মেননদেরকে নিয়ে ইউপিপি বা ইউনাইটেড পিপলস পার্টি নামে পৃথক দল গঠন করেছিলেন। তাদের নির্বাচনী মার্কা ছিল গরুর গাড়ী। ১৯৭৬ সালের ১লা মে মহান মে দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক শ্রমিক সমাবেশ আয়োজন করে সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। সেখানে জিয়াউর রহমান বক্তৃতা করেন। এবং সেটাই ছিল জিয়াউর রহমানের প্রথম কোন পাবলিক মিটিংএ এ্যাপিয়ার হওয়া। টঙ্গি থেকে শ্রমিক এনে কাজী জাফর বেশ বড় শো ডাউন করেছিলেন। অভিভুত হয়ে জিয়াউর রহমান সেই জনসভায় ঘোষনা দিয়েছিলেন, ‘আমিও শ্রমিক’। জিয়াউর রহমান পরে তাকে মার্শাল ল’ সরকারে একজন উপদেষ্টা বা মন্ত্রী বানিয়েছিলেন। জাফর ভাইয়ের সাথে আমার ভাল সম্পর্ক ছিল। তাকেও দলে আনার উদ্যোগ নেই। কিন্তু কথা বলার জন্য ধরতে পারছিলাম না। কুষ্টিয়া অঞ্চলের বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নেতা আবু সাঈদ আমাদের প্রক্রিয়ার সাথে আগেই যুক্ত হয়েছিলেন। তার সাথে ‘ফাঁদ পেতে’ একদিন জাফর ভাইকে পাকড়াও করি। তিনি এসেছিলেন মৌচাক মার্কেটসংলগ্ন আবু সাঈদের মালিকানাধীন একটি সেলুনে চুল কাটাতে। আমি তাকে প্রস্তাব দেই। শুনে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলেন, এরশাদ? ও তো একটা ডুবন্ত সূর্য্য। শুধুমাত্র একটা টোকা- একটা টোকা দিলেই পড়ে যাবে! আমি অনুরোধ করে বলি, আপনি তো জিয়াউর রহমান সাহেবের সাথেও গিয়েছিলেন। দেশ থেকে মার্শাল ল’র দ্রুত অবসানে এবার নাহয় এরশাদ সাহেবের সাথে এলেন! তিনি চোখ পাকিয়ে বলেছিলেন, কোশ্চেন ডাজ নট এ্যারাইজ! সেই সন্ধ্যায় আমি এরশাদ সাহেবকে জানিয়েছিলাম কাজী জাফরের সাথে আমার আলোচনার ফলাফল। শুনে তিনি বলেন, ও তো আজ দুপুরেও ফোন করেছিল! গফুর (বাসার এ্যাটেনডেন্ট) বলছিল কয়েকদিন যাবতই নাকি করছে। আমি ধরতে পারছি না। সে তোমাকে এই কথা বলেছে! আচ্ছা ঠিক আছে- বলে তিনি গফুরকে ডাকেন এবং বলে দেন কাজী জাফর ফোন করলে আর কখনও যেন তাকে না দেয়া হয়।
একদিন বেশ সকালে আমার বাসায় দু’টি ছেলে আসে। ছেলে নয় যুবকই বলা যায়। আগে কখনও দেখেছি মনে হলোনা। পরিচয় দেয়- একজন আব্দুর রউফ সিকদার অন্যজন মোহাম্মদ হারুন। এক সময় ছাত্র লীগ করেছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিশ্বাষী। বঙ্গবন্ধুর অন্ধভক্ত। কিন্তু কোন কারনে দলের প্রতি হতাশ। আমাদের দলে যোগ দিতে চায়।
এমনিভাবে ব্যক্তিগত, গ্রুপ বা দলগতভাবে অনেকেই আমাদের সাথে দল করতে আগ্রহী হন। দেখা করেন, কথা বলেন। সিএমএলএ সচিবালয়ে আমাদের অফিসটা যেন রাজনৈতিক দলের অফিসে রূপ নেয়। সারাক্ষণ লোকজনের ভীড়। এম আর মুকুল ভাইকে দায়িত্ব দেয়া হয় দলের নীতি আদর্শ ঘোষনাপত্র মুসাবিদা করতে। মুকুল ভাই মুসাবিদার কাজে পটু ছিলেন। কয়েক দিনেই রেডি করে ফেলেন। সপ্তাহ তিনেকের মধ্যেই আমরা মোটামুটি গুছিয়ে নেই। তখন পর্যন্ত আমাদের সাথে পাই শামসুল হুদা চৌধুরী ডা: আব্দুল মতিন রিয়াজুদ্দিন ভোলা মিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি’র একটি অংশ, মিজানুর রহমান চৌধুরীর আওয়ামী লীগ, শাহ মোয়াজ্জম হোসেনের ডেমোক্র্যাটিক লীগ, নাসের খান ভাসানীর ন্যাপ, আব্দুল হকের জাগদল, আওয়ামী লীগ জাসদ থেকে মাঠ পর্যায়ের অগনিত নেতা-সংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা নেতা এবং কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি। এ ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে অনেকে আসেন। এত লোকের সাথে যোগাযোগ করা হলেও ১৮ দফার মাহবুবুর রহমানের সাথে কোন কথা বলা হয় নাই। তিনি সামরিক সরকারে একমাত্র সিভিলিয়ান উপদেষ্টা। এলজিআরডি মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে। এরশাদ ঘোষিত ১৮ দফা কর্মসুচী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘১৮-দফা বাস্তবায়ন পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন খুলে দীর্ঘদিন লালন করে আসছিলেন। এর নেতাকর্মীদের ধারনা ছিল ওই সংগঠনই হবে এরশাদ সাহেবের রাজনৈতিক প্লাটফর্ম। নানাজনের সাথে যখন কথাবার্তা চলছে একদিন এরশাদ সাহেবের কাছে জানতে চেয়েছিলাম মাহবুবুর রহমান সাহেবের ব্যপারটা কি হবে। তিনি বলেছিলেন ওটা আমি দেখছি। ফলে তার সাথে আর আমরা আর কথা বলি নাই। তবে এটা বুঝতে পারছিলাম মহবুবুর রহমান একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবেন। কারন তিনি ছিলেন অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির এবং বুদ্ধিমান। কথার মারপ্যাচে মানুষকে পটিয়ে ফেলতে পারদর্শী। তারপরও আমরা যখন গুছিয়ে আনছিলাম তার নেতা-লোকজন হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। অনেকে পৃথকভাবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করে নতুন দলে থাকতে আগ্রহ জানিয়ে যান। মজার ব্যপার হচ্ছে মাহবুবুর রহমান নিজেও কিন্তু কখনও এসব ব্যপারে আমাদের সাথে কথা বলতে চান নাই বা বলেনও নাই। এরশাদ সাহেবের সাথে তার কি কথা হয়েছিল বা হয়েছিল কি না আমরা জানতাম না। শুনেছি তার লোকদেরকে বলতেন, ধৈর্য্য ধর অপেক্ষা কর।
একই রকম অবস্থা ছিল শ্রমিকনেতা আরশাদ আলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শ্রমিক সংগঠন, এটিএম রফিকের নতুন বাংলা যুব সংহতি এবং রফিকুল হক হাফিজের নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ নিয়ে। কারন এই সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন ডিজি ডিএফআই ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান। মার্শাল ল’ জারির পরপরই এই অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। সম্ভবত: সরকারি দল হলে তাদেরকে দিয়েই তা করা হবে এমন কোন চিস্তাভাবনা ছিল। অন্তত: ওদের সাথে কথা বললে তেমনটাই মনে হতো। এ সময় আরশাদ আলী এটিএম রফিকের সাথে আমার দেখা সাক্ষাৎ হতো। কিন্তু মনে হতোনা আমাদের এই দল গঠনের উদ্যোগকে তারা খুব গুরুত্বের সাথে দেখছে। এরশাদ সাহেব মাহমুদুল হাসানকে বলে দিয়েছিলেন নতুন দল গঠনে আমাদেরকে সাহায্য সহযোগীতা করতে। কিন্তু তার কাছ থেকে তেমন কোন সহযোগীতা পাওয়া যায় নাই।
আমাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল। ঘনঘন মিটিং সিটিং হচ্ছে, যোগদানকারি দলগুলো সারা দেশে তাদের নেতা কর্মীদের নামের তালিকা দিচ্ছেন। সড়াসড়ি যারা এলেন আমরা তাদের তালিকা চূড়ান্ত করছি। দেখা গেল সবচেয়ে বড় তালিকা হুদা-মতিন বিএনপির। পয়তাল্লিশজনের ওপর সাবেক এমপির নামই ছিল। এখন দরকার হলো দলের নামকরনের। কি নাম হবে এই দলের। সিএমএলএ সচিবালয়ের দোতালায় কনফারেন্স রুমে একদিন যোগদানকারি সব দলের নেতা এবং বিশিস্টজনদের মিটিং ডাকা হলো। যথা সময়ে এলেন সবাই। সামনের সাড়িতে বসে সিনিয়র নেতারা, মঞ্চে এরশাদ সাহেব এবং আমরা। আলোচনা শুরু হলো। দলের নাম হিসেবে নানা প্রস্তাব আসতে লাগলো। শাহ মোয়াজ্জম ভাই প্রস্তাব করলেন, যেহেতু আমাদের দলটি হবে জনগনকে নিয়ে এবং জনগনের জন্য- দলের নাম হোক জনদল। ছোট নাম। অর্থবহ। খুব একটা বিরোধীতা হলো না। এরশাদ সাহেবও পছন্দ করলেন। সকলের সম্মতিতে নতুন দলের নামকরন করা হলো ‘জনদল’।
আমরা গোছগাছ ফাইনাল করে ফেলেছি এর মধ্যে খবর এলো সরকার কিছুদিনের জন্য রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। এবং খুব সম্ভব সেটা ২৮শে নভেম্বর থেকে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারনত: গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে নেয়া হয়। দেশে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে তেমন একটা চাপ ছিল না। তারপরও কেন এই সিদ্ধান্ত বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটা বিলক্ষণ বুঝতে পারছিলাম রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়ে গেলে আমাদের দল ঘোষনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। কবে নিষেধাজ্ঞা উঠবে ঠিক নাই। ততদিনে দেশের পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে থাকবে কেউ জানেনা। যারা এসেছেন দল করতে তাদেরও বা ক’জন থাকবেন সাথে তারও নিশ্চয়তা নাই। আমরা মিটিংয়ে বসি। হাতে সময় মাত্র দুই কি তিনদিন। মিটিংশেষে এরশাদ সাহেবকে জানাই আমরা ২৭শে নভেম্বরই দল ঘোষনা করবো।

Image may contain: 1 person, standing, crowd and stadium

সিদ্ধান্ত হয় একটি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে দল ঘোষনা করা হবে। আহ্বায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্ট আহসান উদ্দিন চৌধুরী এই ঘোষনা দেবেন। ভেন্যুটা একটু বড় দরকার, কারন সেখানে নেতারা থাকবেন। তাদের সংখ্যাটাও কম না। কিছু কর্মীও আনতে হবে, একটা শো ডাউনের ব্যপার আছে। সাংবাদিক মহলে আমাদের এই দল গঠনের ব্যপারটা ভালভাবে দেখা হয় নাই। তাদেরকে একটু বুঝিয়ে দেয়া যে এটা কোন যেনতেন দল হচ্ছে না। জায়গা ঠিক করা হয় ইঞ্জিনীয়ার্স ইন্সটিটিউশনের মুল মিলনায়তন।
আমি সাংবাদিক সম্মেলনে আহ্বায়কের বক্তব্য লিখে ফেলি। পর দিন বঙ্গভবনে গিয়ে তা দেখাই প্রেসিডেন্টকে। বক্তব্যটা একটু বড় হয়ে গেছিল। বলেন, এতবড় লেখা আমাকে পড়তে হবে! আমি বোঝাই, স্যার আমরা একটা ভিন্নধর্মী দল গঠন করতে যাচ্ছি। এখানে নানা মত পথের লোক সমবেত হয়েছে। কেন এই সম্মিলন এটা জাস্টিফাই করতে তো কিছু ব্যাখ্যা দরকার। এই ব্যাখ্যা দিতে গিয়েই বক্তব্যটা একটু বড় হয়ে গেছে। তিনি একটা কপি রেখে দেন। জানতে চান কারা কারা থাকবে। সব কিছু বুঝিয়ে বলি। অতপর নির্দিস্ট দিন কখন কোথায় যেতে হবে ভাল করে বুঝিয়ে চলে আসি।
এই সাংবাদিক সম্মেলন নিয়ে যোগদানকারি দল এবং ইনডিভিজুয়ালদের মধ্যে সাজ সাজ রব পড়ে যায়। বসার ব্যবস্থাটা করা হয় এমন- সিনিয়র নেতারা মঞ্চে বসবেন। মাঝখানের চেয়ারটায় দলের আহ্বায়ক প্রেসিডেন্ট আহসান উদ্দিন চৌধুরী। দর্শক সাড়িতে সামনের কয়েক রো সাংবাদিকদের জন্য । এর পেছনে মাঝ সাড়ির নেতারা। কর্মী সমর্থকরা বাইরে অবস্থান করবেন।
২৭শে নভেম্বর ১৯৮৪। বিকাল ৩টা সাংবাদিক সম্মেলনের জন্য সময় নির্দ্ধারিত ছিল। তার আগেই সম্মেলনস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। নেতারা সব এসে গেছেন। আমি তখনও সিএমএলএ সচিবালয়ে। ফাইলপত্র গোছগাছ করে শেষ মুহুর্তের ব্রিফিং নিয়ে বের হতে হতে দেরী হয়ে যায়। আহ্বায়কের বক্তব্যের কপিগুলো আমার কাছে। আমি না যাওয়া পর্যন্ত অনুষ্ঠান শুরু হবেনা। ওদিকে বঙ্গভবন থেকে ফোন আসছে প্রেসিডেন্ট সাহেব কখন রওনা দেবেন। বলি দশ মিনিট পর। কারন সিএমএলএ সচিবালয় থেকে ইঞ্জিনীয়ার্স যেতে আমার দশ পনের মিনিট লাগবে। অফিস থেকে বের হয়েছি, গাড়ী খুজছি, পেছন থেকে ১৮-দফা বাস্তবায়ন পরিষদের নেতা এলজিআরডি উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান সাহেব শুধান, কোথায় যাবা। বলি। তিনি বলেন আমি তো বাসায়ই যাবো, চলো তোমাকে সেখানে নামিয়ে দিয়ে যাই। আপত্তি করার কোন কারন নাই। তবে ব্যপারটা আমার কাছে একটু রহস্যজনক ঠেকলো। উনি নিজে চেয়েছিলেন দল তার নেতুত্বে হবে। সারা প্রক্রিয়ায় আমাদের সাথে একবার কথাও বলেন নাই। আর আজ দল ঘোষনার দিন হঠাৎ করে এই সময় অফিসে! বোঝালেন এরশাদ সাহেবের সাথে দেখা করে বের হলেন। পথে গাড়ীতে খুব বেশী কিছু বলেন না। নতুন দল কেমন হবে, টুকটাক জানতে চান। আমিও বাহুল্য কথা এড়িয়ে যাই। ফ্লাগওয়ালা গাড়ী, সাঁ করে চলে আসে ইঞ্জিনীয়ার্সে। গেটের সামনে মতিন চৌধুরী শামসুজ্জামান মিন্টু মাওলা ভাইরা দলবল নিয়ে আমার অপেক্ষায় ছিলেন। মাহবুবুর রহমান ঠিক তাদের সামনেই গাড়ী দাড় করাতে বলেন। ওই গাড়ী থেকে আমাকে নামতে দেখে উপস্থিত সবাই হতবাক। উনি গাড়ীর গ্লাশ উচিয়ে চলে গেলেন। বুঝলাম শেষ মুহুর্তে একটা পলিটিক্স খাটিয়ে গেলেন। আমার লোকদেরকে বোঝালেন যা কিছু হচ্ছে তাকে ছাড়া নয়।
যাই হোক, সবাইকে নিয়ে ভেতরে চলে আসি। দেখি এক মহ্ াহুলুস্থুল ব্যপার। সাংবাদিক সম্মেলন- কোথায় সাংবাদিক! পুরা অডিটোরিয়াম বিভিন্ন দল থেকে আসা নেতা-কর্মীতে ঠাসা। নেতারা এখানে ওখানে। মঞ্চে মাঝচেয়ার- যেটায় প্রেসিডেন্ট সাহেব বসবেন, দখল করে বসে আছেন যুবসংহতি নেতা এটিএম রফিক। চারিদিকে বিশৃংখল অবস্থা। হলের ভেতর কোন সাংবাদিক খুজে পাই না। এমনিতেই সাংবাদিকরা আমাদের ওপর রুষ্ট, তার ওপর এই অবস্থা! সবাই চলে গেল কিনা! হলের বাইরে উত্তরপাশের গাছতলায় কয়েকজনকে পাই। যতদুর মনে পড়ে আমার বন্ধু ইত্তেফাকের শফিকুর রহমানও ছিলেন এ্যাসাইনমেন্টে। সবাইকে অনুরোধ করি ভেতরে গিয়ে বসতে। কিন্তু ভেতরে বসবে কোথায়! কোন আসন ফাঁকা নাই। সাংবাদিকদের জন্য নির্দ্ধারিত চেয়ারগুলোও সব নেতা-কর্মীদের দখলে। মঞ্চে গিয়ে মাইকে বারবার বলতে থাকি সংরক্ষিত চেয়ারগুলো ছেড়ে দিতে। কে শোনে কার কথা! আমি যত অনুরোধ করি হল থেকে তত শ্লোগান ওঠে। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট সাহেব চলে আসেন। এদিকে আর এক বিপত্তি মঞ্চে নেতাদের বসা নিয়ে। সবচেয়ে বড় সমস্যা প্রেসিডেন্টর চেয়ারে বসে আছেন এটিএম রফিক। চোখে কাল গগলস্। একদম ঠায় বসে। সে যে ওখানে আসবে আমাদের জানা ছিল না। কাউকে বলেও নাই। ডিজিএফআইয়ের লোক, কেউ কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না। তারপরও অনুরোধ করা হয় প্রেসিডেন্টের চেয়ারটা ছেড়ে অন্য চেয়ারে বসতে। কিন্তু রফিক গোঁ ধরে থাকেন, তিনি নড়বেন না।
প্রেসিডেন্ট সাহেব কোথায় বসবেন বুঝতে পারছিলেন না। এমএসপি আমাকে শুধান স্যার কোথায় বসবেন। বলি, তার চেয়ারে তো রফিক বসে আছে। এমএসপি গিয়ে রফিককে বোঝান। রফিক তাতেও নড়েন না। অগত্যা পাশের চেয়ারটায় প্রেসিডেন্ট সাহেবকে বসাই। ওদিকে নেতাদের বসা নিয়ে আর এক সমস্যা হয়। প্রেসিডেন্টের পাশে কে বসবেন, কার পাশে কে- প্রটোকল ঠিক করা হয় নাই। তাদের মধ্যে আবার সিনিয়রিটি জুনিয়রিটির ব্যপার ছিল। এটা আমাদের মাথায় ছিলনা। এখন নেতারা তো কেউ বসছেন না। তারপরও সবাইকে অনুরোধ করে বসাই। এ নিয়ে কাউকে কাউকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।
হলে তখন যুদ্ধংদেহি অবস্থা। এ কোন ও কোনা থেকে দলবদ্ধ শ্লোগান। কেউ বলছে মিজান মিজান, একদল হুদা-মতিন রবে মুখর। কেউ দিচ্ছে শাহ মোয়াজ্জম ভাইয়ের নামে শ্লোগান। যুব সংহতিনেতা এটিএম রফিকের নামেও শ্লোগান হচ্ছে। এমন অবস্থা, সন্দেহ হচ্ছিল মাইর না লেগে যায়! মঞ্চেও তখন বিশৃংখলা চরমে। প্রচন্ড ভীড়। কেউ কারও কথা শুনছে না। অনুরোধ করার পরও মঞ্চ থেকে নেমে যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট সাহেবও অনেকটা ঘেরাওয়ের মত। অবস্থা দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে পড়েন। আমি দ্রুত গিয়ে তার সামনে বক্তব্যের কপি মেলে ধরি। বলি স্যার আপনি শুরু করেন। তিনি বলেন এটা কি হচ্ছে! বলি, সাংবাদিক সম্মেলন। তিনি রেগে বলেন, এটা সাংবাদিক সম্মেলন না যুদ্ধ সম্মেলন। কোথায় সাংবাদিক? এ তো সব দেখছি সোলজার! চীৎকার হট্টগোল, কারও কথাই বোঝা যাচ্ছিল না। মাইকে বারবার শান্ত হতে বলা হচ্ছিল। এই বিশৃংখলার মধ্যে প্রেসিডেন্ট সাহেব বেঁকে বসেন, আমি নাই এসবের মধ্যে, চললাম। বলে দাঁড়িয়ে পড়েন। আমি তার পাশেই দাঁড়িয়ে। মাথায় ঘুরছে কাল থেকে পলিটিক্যাল এ্যাকটিভিস বন্ধ। আজ ঘোষনা না করা গেলে সব পন্ডশ্রম হয়ে যাবে। প্রেসিডেন্ট সাহেবকে অনুরাধ করতে থাকি বক্তব্যটা পড়ে যাবার জন্য। তিনিও গোঁ ধরে থাকেন। অপর পাশে দাঁড়িয়ে এমএসপি। তিনিও বুঝতে পারছিলেন না কি করবেন। প্রেসিডেন্ট বলতে থাকেন, এই আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। আমার স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি তখন লোপ পায় যেন। খুবই দৃস্টিকটুভাবে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে ধরে জোর করে বসিয়ে দেই।। কাগজটা সামনে ধরে বলি, এটা স্যার আজকে আপনাকে পড়ে যেতে হবে। তিনি হতবিহ্বল দৃস্টিতে একবার ঘাড় বাকিয়ে আমার দিকে তাকান। তারপর পড়তে শুরু করেন।
চীৎকার চেচামেচিতে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না কি পড়ছেন। শুধু দেখা যাচ্ছিল তিনি কিছু একটা পড়ছেন। এর মধ্যে হলের এ কোন ও কোনায় গনতান্ত্রিক উত্তেজনার বহি:প্রকাশ শুরু হয়ে যায়। গালাগালি হাতাহাতি চেয়ার ভাংচুর। ওই দেখে প্রেসিডেন্ট সাহেব বলেন আমি আর পড়বো না! বক্তব্য তখন আধা পৃষ্ঠাও পড়া হয় নাই। আমি দ্রুত পৃষ্ঠা উল্টে শেষ লাইনটা চোখের সামনে তুলে ধরি। বলি স্যার আর কিছু পড়তে হবে না। শুধু শেষের এই লাইনটা পড়–ন- উপলিল্লিখিত অবস্থার প্রেক্ষিতে আমি আহ্বায়ক হিসাবে এই নতুন দল গঠনের ঘোষনা দিলাম। প্রেসিন্টে সাহেব কাঁপা কাঁপা গলায় উচ্চারন করে গেলেন।
(চলবে)

Image may contain: 1 person, sunglasses

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!