অধরা ভোটার – মাহবুব সুয়েদ

১৮ই মার্চ ২০১৯ সাল আমার নিজ উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হয়ে গেল।এবারে দেশে ছিলাম নির্বাচনের এক মাস আগ পর্যন্ত।সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচন শেষে উপজেলা নির্বাচনের মাস খানেক আগে দেশে গিয়ে যা দেখলাম মনে হল সাধারন জনগন অনেকটা ইউরোপ-আমেরিকার পথে হাটছে।নির্বাচন নিয়ে খুব একটা আলোচনা-সমালোচনা নেই কোথাও।ভাবলাম, যাক নির্বাচনী উৎসবের পাগল আম জনতা তাইলে নির্বাচনী পাগলামি থেকে কিছুটা মুক্ত হচ্ছে।ভাবলাম যুগ পাল্টাচ্ছে, সময় বদলাচ্ছে।মানুষ হয়ত আগেকার মত চায়ের টেবিলে আসর না জমিয়ে নিরব ব্যালট বিপ্লবে বিশ্বাসি হয়ে ওঠছে। এরই মধ্যে তফসিল ঘোষিত হল।কয়েক ধাপে নির্বাচন হল সারাদেশে।প্রধান বিরুধী জোট নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষনা দিয়ে তাদের সব কর্তাদের নির্বাচনে না যাওয়ার নির্দেশও দিয়েছে।কেউ নিষেধ অমান্য করে নির্বাচনে গেলে দলের কেন্দ্র থেকে শুধু তাকে বহিস্কার করেনি বরং সেই প্রার্থীর সমর্থনে স্থানীয় বিএনপির কেউ কাজ করলে তাকেও বহিস্কার/ কারন দর্শাও নোটিশ দিতে দেখলাম।সরকার বিরুধী জোটের এমন সিদ্বান্ত বা কঠোরতা দেখে আপন মনে হাসতেছিলাম! কারন মাত্র কয়দিন আগের জাতীয় নির্বাচনে যারা সাকুল্যে মিলে ৬ টা আসন পেল এবং ভোটের পার্সেন্ট হিসেবে যাদের মাত্র ১% ভোটও নাই তাদের এমন সিদ্বান্ত আমাকে না হাসিয়ে পারেনা।কোথাও কোথাও তো তাদের প্রার্থী ৩ লাখ ভোট প্রাপ্ত প্রার্থীর বিপরীতে মাত্র ৩/৫ হাজার ভোটও পেয়েছে!আবার অনেক জায়গায় ভোটের দিন রাত ৮/৯ টা পর্যন্ত ধানের শীষ প্রার্থী নিজ কেন্দ্রে এক ভোট না পাওয়ার লজ্বাজনক ঘটনাও ঘটেছে!অকর্মণ্য এসব প্রার্থী এবং তাদের জোট কত অজনপ্রিয় হলে পরে নিজ কেন্দ্রে নিজে নিজেকে ভোট দেয়নি এমনকি তাদের বউরাও ভোট দেয়না!সেই জোটের নির্বাচন বর্জনের ঘোষনাকে আমি নিছক হম্বিতম্বিই মনে করেছি। যাইহোক ১৭ কোটি মানুষের দেশে ১/২% পার্সেন্ট ভোটের মালিক দল বা জোটের সিদ্বান্তের বাইরে গিয়ে দেশের মোট ভোটারের ৯৮% বা শতভাগ ভোটার ভোট দেবেন বলে আমি আশা করেছিলাম।কারন জাতীয় নির্বাচনে কোথাও কোথাও শতভাগ আবার কোথাও শত দশভাগ ভোটারও ভোট দিয়েছেন দেখেছি।সেই হিসেব থেকে স্থানীয় নির্বাচনে বিপুল ভোট প্রয়োগের খবর রাতে দেখব এমন আশাবাদি হওয়াটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখলাম তাতে হতাশ না হয়ে পারিনি।দেখা গেছে বেলা দুই বা তিন টা পর্যন্তও কোথাও কোথাও ৫/৭% ভোট কাস্ট হয়নি।অনেক দুষ্টজনেরা কেন্দ্রে কেন্দ্রে কুকুরের আয়েশী ছবি অথবা ডিউটিরত আনসারদের সেলফি তোলার ছবি দিয়ে আমায় হতাশ করেছেন।ভোটের মাঠ আছে, ব্যালট আছে, বাহিনী আছে , নিরাপত্তা আছে এবং আছে ভোটের বুথ।কিন্তু ভোটারের উপস্থিতি নেই তা হতাশ করে বৈ কিছু নয়। শুরুতে বলেছি, নির্বাচন নিয়ে মেতে না ওঠা দেখে আমি আশাবাদি হয়েছিলাম এই ভেবে যে, জাতি তাইলে ভোট নিয়ে অতি আবেগ বন্ধ করেছে।এটা শুভ লক্ষন, এটা সভ্য দেশগুলোতে চলে আসা সংস্কৃতির আলামত।কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখলাম ইউরোপকে পেছনে ফেলে আমরা আরো একধাপ এগিয়ে গিয়েছি।শুধু ভোট নিয়ে মাথা ঘামাইনি এমন নয়, বরং ভোট প্রদানে কেন্দ্রে যাওয়া থেকেও বিরত থেকেছি আমরা। এমন ইউটার্নের কারন কী? তার পর্যালোচনা করলে অদুর ভবিষ্যত নিয়ে হতাশ না হয়ে পারিনা। “ভোট” জাতি হিসেবে আমাদের সৃষ্টির সাথে এবং দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সাথে মিশে আছে।ভোট প্রদান এবং তা রক্ষার আন্দোলন থেকেই মাত্র কয় মাসে শক্তিশালি রাষ্ট্র পাকিস্তান ও সামরিক জান্তাকে বৃদ্বাঙ্গুলি দেখিয়ে আলাদা বিশ্ব মানচিত্রে নতুন স্বাধীন দেশের জন্মদানের বিরল ইতিহাস বোধহয় পৃথিবীতে শুধু আমাদেরই আছে।১৯৭১ সালে পাক জান্তারা ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা না দেয়ায় ক্ষুদ্ব বাঙ্গালিদের রক্তের গঙ্গা বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ এসেছিল। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ৭৩’র নির্বাচনে কোথাও কোথাও তৎকালিন সরকারের প্রভাবশালিদের বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসা এবং কোথাও কোথাও ভোটেরর বাক্স হেলিকপ্টারে করে ঢাকা নিয়ে আসায় বাঙ্গালি বিক্ষুব্দ হয়েছিল।আইন করে সব দল নিষিদ্ব করে একদলীয় ব্যাবস্থা কায়েমে বিক্ষুব্দ বাঙ্গালি তাদের স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুর স্বপরিবারে নির্মম হত্যার পরে প্রতিবাদে একটা মিছিলও করেনি।অনেক জায়গায় তারা শুকরিয়া মিছিলের মত বেদনাদায়ক কর্মসুচি নিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর পর এরশাদের আমলে বাঙ্গালি পাতানো নির্বাচন দেখে ভোট দিতে কেন্দ্রে যায়নি।৫/৭% ভোট নিয়ে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতায় ঠিকেছিলেন সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ।কিন্তু আন্দোলনের পর যখনি বাঙ্গালি ৯১ সালে সুষ্ট নির্বাচনের সুযোগ পেল তখনি সামরিক সদ্য সরকারকে ভোটের মাঠ থেকে বিদায় দিয়ে পছন্দের দলকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল। নানা চড়াই উতরাইয়ের পর ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনা।২০১৪ সালে বিনা ভোটে এবং ২০১৮ সালে কৌশলে ক্ষমতায় থেকে যাওয়া শেখ হাসিনার আমলে সাধারন জনগন ভোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।এই মুখ ফিরিয়ে নেয়ার কারন কী? খোদ মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কয়দিন আগে দেয়া বক্তব্য থেকে কিছুটা আচ করা যায় ভোটারদের বিমুখ হওয়ার বিষয়ে।আসন্ন উপজেলা নিয়ে তিনি বলেছেন “এবার আর রাতে ভোট দেয়া যাবেনা”!! সত্যবাদীতার অনন্য নজির এটি।ভোট বিমুখ হওয়ার আঙ্গুল দেখানো উত্তর এটি।কষ্ট করে অমানুষিক খেটে ভোট দিয়ে লাভ নেই।রাতের বেলা বাক্স ভর্তি হয় অথবা দিনের বেলা প্রকাশ্যে ডাকাতি হয়।ভোট এখন আর চুরি হয়না।এইসব দেখেই জনগন ভোট থেকে বিরত থাকছে। ৩০ ডিসেম্বরের পরে দেশে গেলে আজীবন নৌকাভক্ত এক চাচা বললেন “যদি জানতাম এভাবে পাশ করব তাইলে এই বুড়া বয়সে এত কষ্ট করতামনা”।সত্যিকারার্থে বর্তমানে জনগন ভয় পায় ভোটদানে যেতে।ভয় পায় কথা বলতে।ভোট কেন্দ্র গুলোতে ভোটার পাওয়া এখন সোনার হরিণ।ভোটার এখন অধরা হয়ে উঠেছে। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বলে আসছে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠবে।আমি বিশ্বাস করি উঠেছেও।দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।আমরা এখন বিশ্ব রাজনীতি বা অর্থনীতিতে অনেক গুরুত্বপুর্ন অবস্থানে আছি।সেই অবস্থাকে আরো বেগবান করতে বর্তমান সংসদে আইন করে বাকশাল আদলে নির্দিষ্ট টার্মের জন্যে জাতীয় সরকার ব্যাবস্থা চালু হোক।অনাগ্রহী ভোটারদের আগ্রহ সৃষ্টি না

করে দেশের স্বার্থে সব ধরনের নির্বাচন আপাতত স্থগিত করে দেশ এগিয়ে নেয়া হোক।অযথা রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা অপচয় না করে এইসব অবকাটামোগত উন্নয়নে ব্যায় হোক সেই প্রত্যাশা করছি!!

লেখক- প্রবাসী কলাম লেখক।

ইমেইল- mksuyed@gmail.com

মন্তব্য করুন

অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার মন্তব্য লিখুন!
অনুগ্রহ করিয়া এখানে আপনার নাম লিখুন!